১৮ অক্টোবর ২০১৯

আরো ভয়াবহ অবস্থার অপেক্ষা : ডেঙ্গুর শেষ সেরুটাইপটি রয়েই গেছে

ডেঙ্গুর শেষ সেরুটাইপটি রয়েই গেছে। আরো একটি ভয়াবহ অবস্থা অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরুটাইপ। এগুলো ডেন১, ডেন২, ডেন৩ ও ডেন৪ নামে পরিচিত। চার সেরুটাইপের তিনটিই ২০০০ সাল থেকে প্রকাশ পেয়েছে। চলতি মওসুমে ডেঙ্গুর তিন নম্বর টাইপটি বেশি পাওয়া যাচ্ছে ল্যাবরেটরি টেস্টে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ডেন২ বেশি আক্রান্ত করেছে। একই সাথে ওই সময়ে ডেন১ও ছিল। ২০১৭ সালেও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে ডেঙ্গুর ডেন২ সেরুটাইপ। সে বছর নতুন করে ডেন৩ সেরুটাইপ পাওয়া যায়। ২০১৮ সালেও ডেন২ বেশি আক্রান্ত করেছে। একই সাথে ডেন৩ ও ডেন১ সেরুটাইপও ছিল। চলতি বছর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করেছে ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন৩ সেরুটাইপ। একই সাথে ডেন১ ও ডেন২ পাওয়া যাচ্ছে।

অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোনো একটি সেরুটাইপ কাউকে আক্রান্ত করলে তা পরবর্তী সময়ে ওই মানুষের দেহে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। একই সেরুটাইপের ডেঙ্গু আবার একই মানুষের দেহে প্রবেশ করলে তার আর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। যেমন চলতি বছর বেশির ভাগ ডেঙ্গু রোগী ডেন৩ সেরুটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। ডেন৩ সেরুটাইপ বহন করছে এমন মশা ভবিষ্যতে একই মানুষকে কামড়ালে তার আর ডেঙ্গুজ্বর হবে না যদি না অন্য কোনো সেরুটাইপ তার দেহে প্রবেশ করে। ডেঙ্গুর সেরুটাইপ ডেন৪ এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়নি। মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার না করলে সেরুটাইপ ডেন৪ সামনের দিনগুলোতে বিপজ্জনক হয়ে আসতে পারে। তবে আশার কথা হলোÑ চলতি বছর ব্যাপক ভিত্তিতে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ফলে মশা কমে গেছে রাজধানীতে। সামনের বছর মশা যেমন খুব বেশি থাকবে না, তেমনি ডেঙ্গুর প্রকোপও কম হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের ১২৮ দেশের ৩৯০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে বিশ্বে প্রতি বছর ৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্তদের শুরুতে শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসা সহজ হয়। কারণ এই রোগটি প্রতিরোধযোগ্য। নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকলেও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা যায়।
আইইডিসিআর জানিয়েছে, ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে এবং তাপমাত্রা কমপক্ষে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে এডিস মশার ডিম ফোটে বংশ বিস্তার বেশি হয়। ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অথবা এর নিচের তাপমাত্রায় এডিস মশার ডিম ফোটে না। এ কারণে বাংলাদেশে শীতকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকে এবং গ্রীষ্ম বা বর্ষা এমনকি শরৎকালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। তবে অধ্যাপক সেব্রিনা বলছেন, এখন থেকে সারা বছরই ডেঙ্গুর বিস্তার থাকবে। অতএব সবাইকেই মশা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। বাড়ির আশপাশে অথবা বাসাবাড়িতে মশা জন্মাতে পারে এমন পানি রাখা যাবে না। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করে রাখতে হবে।

গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৬৭২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এটা গত বৃহস্পতিবারের চেয়ে ৭৮ জন কম। গত বৃহস্পতিবার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৫০। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ দিনে সারা দেশে আট হাজার ৯৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন ডেঙ্গুতে। সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা জুলাইয়ের ১৩ দিনের চেয়ে বেশি। আগস্টের ৩১ দিনে সারা দেশে আক্রান্ত হয়েছেন ৫২ হাজার ৬৩৬, জুলাইয়ের ৩১ দিনে ১৬ হাজার ২৫৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
গতকাল কেবল রাজধানীতে আক্রান্ত হয়েছেন ২২৯ জন এবং দেশের অবশিষ্ট অঞ্চলে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৪৪ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতর এ পর্যন্ত ১০১টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ৬০টি মৃত্যু ডেঙ্গুর কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে।

৩ দিনে এক প্রতিষ্ঠানের ১০ কর্মচারী আক্রান্ত
চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা জানান, যশোরের চৌগাছায় তিন দিনে একটি প্রতিষ্ঠানের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। ডিভাইন গ্রুপের চৌগাছা এরিয়া ম্যানেজার এ এস এম হাদিউজ্জামান সাগর জানান, তিন দিনের ব্যবধানে ডিভাইন গ্রুপের ১০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তরা হলেন ডিভাইন গ্রুপ চৌগাছা শাখার হিসাবরক্ষক আব্দুল হামিদ (৩৭), নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওহিদুল ইসলাম (৫০), ডিভাইন গ্রুপের এমডির ব্যক্তিগত গাড়িচালক সাইদুল ইসলাম (৩৯), ডাক্তার আনিছুজ্জামান নাহার কল্যাণ সংস্থার হিসাবরক্ষক আমিনুর রহমান (৫৭), অফিস প্রধান রওশনারা বেগম (৪৫), সুপারভাইজার শাহ-নিয়ামত উল্লাহ (৩৫), মাঠকর্মী জেসমিন খাতুন (২৮), মনিরা বেগম (৩৮) আব্দুল্লাহ (২৭) ও টিটো রহমান (৩৮)। আক্রান্তরা চৌগাছা সরকারি মডেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পৌরশহরসহ উপজেলার জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে উপজেলার সরকারি মডেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সাত সিটের একটি ইউনিট খোলা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগী বেশি হওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে চৌগাছা সরকারি মডেল হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মাসুদ রানা জানান, রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগী কমতে শুরু করেছে কিন্তু চৌগাছায় ডেঙ্গু রোগী ক্রমেই বাড়ছে।


আরো সংবাদ