১৫ নভেম্বর ২০১৯

গাঁজা আসক্তিতে বিষণœতা রোগ

-

গাঁজার ব্যবহার আমাদের দেশে অনেক পুরনো। তরুণদের প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ গাঁজায় আসক্ত হয়ে পড়ে কোনো না কোনোভাবে। গ্রামগঞ্জে আরো ব্যাপকভাবে গাঁজার ব্যবহার দেখা যায়। আমাদের দেশে গাঁজার ব্যবহার বিশেষ করে তরুণ বা যুবকদের মধ্যে এত বেড়ে গেছে যে, অনেকে গাঁজার নেশাকে একেবারেই সাধারণ মাত্রার নেশা বলে মনে করে। প্রায় ৪০ শতাংশ লোক গাঁজার নেশাকে সাধারণ নেশা বলে মনে করে। গাঁজা সেবন ব্যক্তিকে আনন্দ ও সুখ দান করে।
অনেকের মতে, গাঁজা সেবনের ফলে মানুষের ইচ্ছাশক্তি কমে যায়। মানুষ আশাশূন্য হয়ে যায়। গাঁজা সেবনে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয় মস্তিষ্ক, ফুসফুস ও শুক্রকীটে। গাঁজার নেশা ব্যক্তিকে, ব্যক্তির মন-মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। যারা দীর্ঘদিন যাবৎ গাঁজার নেশায় আসক্ত, তাদের মধ্যে বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে বিষণœতার কথা উল্লেখযোগ্য। বিষণœতা এক প্রকার সাইকোলজিক্যাল মুড ডিজঅর্ডার। এই ডিজঅর্ডার ব্যক্তির মন-মস্তিষ্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে। সাধারণত দুই ভাগে বিষণœতাকে ভাগ করা যায়Ñ রিঅ্যাকটিভ বিষণœতা ও অ্যান্ডোজেনাম বিষণœতা।
বিষণœতায় আক্রান্ত তরুণ-তরুণীদের গাঁজার প্রতি নির্ভরতা ও আসক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। কারণ এ সময় গাঁজার নেশায় আসক্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে অসহায় হয়ে পড়ে। তার মধ্যে এক কষ্টকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এ সময় গাঁজার নেশা এবং বিষণœতা রোগীকে আরো জোরালভাবে পেয়ে বসে। ফলে রোগীর মধ্যে দেখা যায়Ñছটফটানি, অস্থিরতা, উদ্বিগ্নতা, উত্তেজনা, বিরক্তি ভাব, উদাসীনতা, দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, মনের মধ্যে সব কিছু ফাঁকা হয়ে গেছে এমন লাগা, কোনো কাজে উৎসাহ অনুভব না করা, কাজকর্মে ধীরগতি বা অলস হয়ে যাওয়া, স্মরণশক্তি হ্রাস পাওয়া, মনোসংযোগের অভাব বা কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা, অশান্তি বোধ, নেতিবাচক ভাব বা চিন্তাভাবনা, ক্লান্তি বা অবসন্নতা, শরীরের ওজন হ্রাস পেতে থাকা, যৌনতা বা যৌনশক্তি হ্রাস পাওয়া, যৌনতাকে মনভরে উপভোগ করতে না পারা, দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। সবকিছু হারানোর ভয় বা সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দেয়া, নিদ্রাহীনতা বা নিদ্রা আসতে কষ্ট হওয়া বা অতিনিদ্রা, পরিষ্কার চিন্তা-ভাবনা ঘোলাটে হওয়া, অনেক সময় অপরাধবোধ সৃষ্টি হওয়া, একাকিত্বতা দারুণভাবে ভোগাতে থাকে। এ ছাড়া তরুণ-তরুণী গাঁজাসেবীর লেখাপড়ায় ব্যাপক অবনতি সৃষ্টি হয়। দেখা যায়, স্কুল বা কলেজের টিফিনের টাকা দিয়ে সে গাঁজা সেবন করে। কলেজপড়–য়া প্রায় ১১ শতাংশ ছাত্রছাত্রী গাঁজার নেশায় কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে পড়ে। এতে করে তাদের লেখাপড়ায় অনেক বিরূপ প্রভাব পড়ে। এ সময় তাদের মধ্যে দেখা দেয়Ñ
ঝগড়াটে মনোভাব, মাত্রাতিরিক্ত ফ্যাশনবাদী মনোভাব, মন্দ বন্ধুদের সাথে সখ্য বেড়ে যাওয়া এবং তাদের সাথে বেশি বেশি আড্ডা দেয়া, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার হার কমে যায়, পড়ালেখাকে বোঝা বলে মনে হয় ইত্যাদি।
অনেক তরুণ-তরুণী নানা কারণে বিষণœতায় আক্রান্ত হয়ে গাঁজার নেশায় আরো বেশি করে আসক্ত হয়ে যায়। এর কারণ হলোÑ মনের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য একটা ফুরফুরে ভাব সৃষ্টি হওয়া, কল্পনাবিলাসিতা সৃষ্টি হওয়া, এ সময় কল্পনার জগতে বিচরণ করে ব্যক্তি সাময়িকভাবে আনন্দ লাভ করে।
যেসব তরুণ-তরুণী দীর্ঘদিন যাবৎ গাঁজা সেবনের ফলে বিষণœতায় আক্রান্ত হয়, তাদের পরিণাম মন্দ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই পরিবারের অভিভাবকদের উচিত, সন্তানকে বকাঝকা না করে তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নির্ণয় করবেন গাঁজায় আসক্ত তরুণ বা তরুণী কোন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে বা বিষণœতা হয়ে থাকলে তা কী পর্যায়ে আছে। তার কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন তার সিদ্ধান্ত নেবেন এবং পূর্ণ মাত্রায় চিকিৎসা শুরু করবেন। এ সময় অ্যান্টি ডিপ্রেশান্টস ওষুধ, সাইকোথেরাপি এবং গাঁজার নেশা ছাড়ানোর জন্যও উপযুক্ত চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

 


আরো সংবাদ