১৫ নভেম্বর ২০১৯

স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমে তরুণ সমাজ

-

আজ প্রায় ১৪-১৫ বছর আগে তখন আমি বোধহয় ক্লাস ফাইভ কী সিক্সে পড়ছি, তখন বিটিভিতে একটি নাটক প্রায় প্রচারিত হতো। সেখানে দেখানো হতোÑ একজন সার্জন অপারেশন করছেন। হঠাৎ তিনি বললেন, রক্ত লাগবে। তাকে বলা হলো রক্ত নেই। তিনি হন্তদন্ত হয়ে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরোলেন। বাইরে অপেক্ষমাণ দু’টি শিশু। তিনি বেরোতেই তারা তাকে জিজ্ঞেস করল স্যার আমাগো মায় বাঁচবো তো, সার্জন সাহেব তাদের মাথায় সস্নেহে হাত রাখলেন। বিষণœ স্বরে বললেন, তোমাদের মা বাঁচবে কিন্তু তার জন্য রক্তের প্রয়োজন। প্রচুর রক্ত। এ মুহূর্তে ওনার গ্রুপের রক্ত আমাদের কাছে নেই। তখন অসহায় শিশু দুটো কাতর স্বরে বললÑ আমাগোরে রক্ত কে দিবো?
তখন স্বেচ্ছা রক্ত দানের ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিটিভি এ নাটিকাটি প্রচার করত, যা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। এটাই পরে মেডিক্যালে পড়ার সময় আমাকে স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় রক্তের শতকরা ৬০ শতাংশ রক্ত আসে পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের কাছ থেকে। যারা রক্ত বিক্রি করেন তারা কোন শ্রেণীর মানুষ তা আপনারা খুব ভালোভাবেই জানেন। এদের বেশির ভাগই সিফিলিস হেপাটাইটিস-বি কিংবা এইচআইভি বা এইডস রোগে আক্রান্ত। ফলে এ দূষিত রক্ত শরীরে নেয়ার পর রক্ত গ্রহীতাও প্রায়ই আক্রান্ত হয় এসব রোগে।
আমাদের দেশে ১৮-৪০ বছরের বয়সী লোকের সংখ্যা অন্তত চার কোটি। দেশে প্রতি বছর রক্তের প্রয়োজন হয় সাড়ে চার লাখ ব্যাগ। যা কি না ওই বয়সী জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। আজকে আমাদের দেশে তরুণেরা যদি এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে সব সময় সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সবাই যদি প্রতি বছর অন্তত একবার করেও রক্ত দেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয় তাহলে আমাদের রক্তের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে মিটে যায়। কারণ রক্তের বিকল্প কেবল রক্তই, আজ পর্যন্ত কেউ তার বিকল্প হিসেবে অন্য কিছু উদ্ভাবন করতে পারেনি। যদিও এক সময় বেশ জোরেসোরেই কৃত্রিম রক্ত আবিষ্কারের কথা শোনা গিয়েছিল কিন্তু তা এখন পর্যন্ত গবেষণার পর্যায়েই আছে। আমি রক্তদানের ব্যাপারে তরুণসমাজ অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮-৪০ তার মধ্যে তাদের বেশি উদ্বুদ্ধ করছি। এখন আমাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) মতে ১৮-৫৫ বছরের মধ্যে সুস্থ ব্যক্তিরা চার মাস অন্তর অন্তর রক্ত দিতে পারেন তাহলে আমি তরুণদের রক্ত দেয়ার ব্যাপারে এতটা বেশি জোর দিচ্ছি কেন? আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছিÑ আমাদের দেশে চল্লিশের বেশি বয়সের ব্যক্তিদের বেশির ভাগ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, কিডনির সমস্যা ইত্যাদিতে আক্রান্ত থাকেন। যার ফলে বিভিন্ন ক্যাম্পে চল্লিশ বছরের বেশি বয়সী যারা এসেছেন স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে তাদের বেশির ভাগকে দেখা যায় এসব রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন। এর ফলে তাদের স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করেই আমরা তাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হই। কারণ স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সুস্থ রক্তদাতা বাছাই করে তাদের শারীরিক কোনো রকম ক্ষতি না করে তাদের কাছ থেকে এক ব্যাগ নিরাপদ রক্ত নিয়ে মুমূর্ষু গ্রহীতাকে পরিসঞ্চালন করা যাতে তিনি আরোগ্য লাভ করেন। এজন্যই আমি তরুণদের রক্ত দিতে বেশি উদ্বুদ্ধ করি। কারণ তাদের বেশির ভাগ ওই রোগগুলো থেকে মুক্ত থাকে।
স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখলাম, তরুণদের মধ্যে অনেকেরই রক্তদানের ব্যাপারে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। তারা মনে করে রক্ত দিলে বুঝি তাদের শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি আমাদের শরীরে রক্তের পরিমাণ সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লিটার। তার মধ্যে থেকে এক লিটার রক্ত যদি শরীর থেকে কোনো কারণে বেরিয়ে যায় তবে শরীর নিজেই সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমে একজন গ্রহীতার কাছ থেকে রক্ত নেয়া হয় চার শ’ থেকে সাড়ে চার শ’ মিলিলিটার কারণ পাঁচ শ’ মিলিলিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন রক্তের ব্যাগে পঞ্চাশ মিলিলিটার এল্টি কোয়াগুলেন্ট দেয়া থাকে যাতে রক্ত জমাট না বাঁধে। অর্থাৎ একজন রক্তদাতা রক্ত দিচ্ছেন আধা লিটারেরও কম। এতে তার শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার পর দুই গ্লাস পানি পান করলেই শরীরে রক্তের তরল অংশের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। আর রক্তের উপাদানগুলো চার মাসের মধ্যেই পূরণ হয়ে যায়। কেউ যদি রক্ত না-ও দান করেন, তার পরও প্রতি তিন-চার মাস অন্তর তার দেহ থেকে রক্তের উপাদানগুলো ভেঙে তা প্রস্রাব-পায়খানার মাধ্যমে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে চলে যায়। অতএব, রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়Ñ এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অবশ্য অনেকে সাময়িক দুর্বল হয়ে যায়। রক্ত দেয়ার পরপরই এর কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মানসিক।
আরেকটি ভুল ধারণা আছে তা হলোÑ অনেকে মনে করেন, রক্ত দিলে তাদের শরীরের যৌন শক্তি কমে যাবে। প্রতি সত্তর ফোটা রক্ত দিয়ে এক ফোটা বীর্য তৈরি হয়। এর জন্য, দায়ী অবশ্য রাস্তার পাশের ক্যানভাসাররা এবং কিছু বস্তাপচা চটি বই। এরকম ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ রক্ত তৈরি হয় অস্থিমজ্জা যা বোনমেরোতে আর বীর্য তৈরি হয় অণ্ডকোষ বা টেস্টিসে। রক্ত থেকে কখনোই বীর্য তৈরি হয় না। অতএব রক্ত দিলে বীর্য কমে যাবে এরকম ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। রক্ত ও বীর্য তৈরি দু’টি শরীরের সম্পূর্ণ দুই রকম ভিন্ন প্রক্রিয়া।
তরুণেরা স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমকে আরো বেগবান করতে পারে বিভিন্ন জায়গায় ব্লাড ক্যাম্প, স্বেচ্ছা রক্তদানের পক্ষে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম প্রভৃতির আয়োজনে অংশ নিয়ে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম সংস্থা এ ব্যাপারে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এদের মধ্যে সন্ধানী, রেড ক্রিসেন্ট, অরকা, বাঁধন, লায়ন্স এবং কোয়ান্টামের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেশের প্রবীণ রক্ত পরিসঞ্চলনবিদ প্রফেসর ডা: মুজিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ১৯৭২ সালের ১০ জুন জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর নূরুল ইসলাম নিজে স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমের সূচনা করেন। ১৯৭৩ সালে রেডক্রস (পরে রেড ক্রিসেন্ট) ১৯৭৮ সালে সন্ধানী স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে সাংগঠনিকভাবে স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়ে বাংলাদেশে স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনের অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে এদের কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে অরকা (১৯৮২), বাঁধন (১৯৯৯), কোয়ান্টাম (১৯৯৬), লায়ন্স (২০০০) সালে স্বেচ্ছা রক্ত দান কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু এদের কার্যক্রমই যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে দেশের তরুণসমাজ যত সচেতনভাবে বেশি সম্পৃক্ত হবে আমাদের দেশ মুক্ত হবে দূষিত রক্তের অভিশাপ থেকে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ব্লাড ব্যাংকগুলোর লাল রক্তের কালো ব্যবসা বন্ধ হবে চিরতরে। সবশেষে কবি সুকান্তের সেই কবিতাটা দিয়ে আমার লেখা শেষ করতে চাই।
আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাংতে পাথর বাঁধা
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়
আঠারো বছর বয়স জানেনা কাঁদা
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য।
ই-মেইল : হড়ংিযববৎ@ফযধশধ.হবঃ


আরো সংবাদ