২১ নভেম্বর ২০১৯

ফুসফুসের রোগে হার্টের ক্ষতি

-

এমপিসিমা একটি শ্বাসকষ্টজনিত রোগ। শ্বাসনালীর ভেতরের বাতাস যখন স্বাভাবিকভাবে আসা-যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন ফুসফুসের ছোট ছোট বায়ুথলি বাতাসের চাপে ক্রমেই ফুলতে থাকে। এ অবস্থায় এদের সঙ্কুচিত হওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফেঁপে থাকা বায়ুথলির এই অবস্থাকে এমপিসিমা বলা হয়ে থাকে। এই রোগের প্রধান লক্ষণ শ্বাসকষ্ট। সেজন্য রোগী এই রোগকে হাঁপানি মনে করে অনেক সময় নিজেই হাঁপানির ওষুধ খান।
কিন্তু এই রোগটির হাঁপানির সাথে লক্ষণগত কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও রোগের প্রকৃতিতে পার্থক্য আছে। হাঁপানি রোগীদের অনেকের যেমন মাঝে মধ্যে রোগ বিরতি দেখা যায়; এমপিসিমা রোগে তা দেখা যায় না। রোগের সূত্রপাত অতি ধীরে, রোগী প্রথম দিকে তাকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু অপর দিকে অল্পবয়সী হাঁপানি রোগীদের শুরুটা নাটকীয়ভাবে হয়। রোগীদের আত্মীয়স্বজন রোগীর কষ্ট দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টা পরে রোগী আবার সুস্থ হন।
এমপিসিমা রোগীদের ক্ষেত্রে এই চিত্র বিপরীত। রোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং রোগী যেন বেঁচে মরে থাকেন। এমপিসিমা রোগীর অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান। এর ফলে সৃষ্টি হয় ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস রোগ। রোগীর কফ-কাশ হতে থাকে, কখনো বা জ্বর হয়। এর সাথে খুব ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এই কষ্ট ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আগে হয়তো রোগী দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠতে পারতেন। নিচতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে পারতেন। কিন্তু পরে নিজেই অনুভব করলেন যে ইদানীং এভাবে চলাফেরা করতে কষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ রোগী যে কাজে অভ্যস্ত ছিলেন এবং সহজেই করতে পারতেন সেই কাজ করতে এখন কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় রোগী প্রথম দিকে এই কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না।
এই অসুখে ফুসফুসের আয়তন বড় দেখায়, কিন্তু তার কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। বায়ুথলি ও বায়ুকোষ স্ফীত হয়। তাদের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হওয়ার জন্য শ্বাস নেয়ার সময় যে বাতাস বায়ুথলির ভেতর প্রবেশ করে তা বাইরে আসতে পারে না। ফলে অক্সিজেন বহন করে বিশুদ্ধ বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে না। বায়ুকোষের চার পাশে রক্ত বহনকারী নালী রয়েছে। বায়ুকোষ স্ফীত হওয়ায় রক্তনালীর ওপর চাপ পড়ে। চাপ অতিক্রম করে রক্ত চলাচল অক্ষুণœ রাখার জন্য হার্ট কিছুটা জোর দিয়ে দক্ষিণ নিলয় সঙ্কোচন করে। ফলে প্রথম দিকে ফুসফুসে রক্তচাপ বৃদ্ধি হয়। পরে হার্ট যখন পরিশ্রম অনুযায়ী প্রয়োজনমতো অক্সিজেন পায় না তখন পুষ্টির অভাবে হার্ট ক্লান্ত হয়ে শেষে কাজ করতে অক্ষম হয়।
এই রোগীদের বুকের খাঁচার আয়তন বড় হয়ে যায়। এক্স-রে করালে সেখানে ফুসফুসের রঙ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কালো দেখায় (বায়ুথলিতে বেশি বাতাস জমে থাকার জন্য)। ফুসফুসের আকার বড় দেখায়। দু’পাশ থেকে ফুসফুসের মাঝের অংশ হার্টের ওপর আসার জন্য হার্টের আকার সরুমতো দেখায়। দীর্ঘ দিন এই রোগে ভুগলে হার্ট ও ফুসফুসের কারণে যে রোগ হয় তার নামÑ ‘কর পালমুনেল’, অর্থাৎ ফুসফুসের রোগে হার্টের ক্ষতি।
এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। রোগী সাবধানে থাকবেন। নিজের ক্ষমতা ছাড়িয়ে কিছু পরিশ্রমের কাজ করবেন না। ধূমপান পরিত্যাগ এবং ধুলো ও ধোঁয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

লেখক :অধ্যাপক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, রাফা মেডিক্যাল সার্ভিস, ৫৩, মহাখালী টিবি গেট, ঢাকা।
ফোন : ০১৯১১৩৫৫৭৫৬


আরো সংবাদ