২৩ আগস্ট ২০১৯

সালাতে প্রশান্তি আসে

-

বুখারি শরিফে হজরত আবু হোরায়রা রা: থেকে বর্ণিত সেই প্রসিদ্ধ হাদিস আমাদের সবার কাছে অতি পরিচিত। কিন্তু তার বাস্তব অনুশীলন কোথাও দেখতে পাই না। এক-দুইজন বাদে প্রায় সব মসজিদের ঈমাম যেভাবে নামাজের ইমামতি করেন, তাতে প্রশান্তি আসে না। ঈমামরা কি এই হাদিসটি জানেন না? অবশ্যই জানেন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করেন না। ফলে মুসল্লিরাও মুখস্থ বুলি আওড়ে যান। তারাও এ ধরনের সালাতই আশা করেন। বিখ্যাত সে হাদিসটি আবার আপনাদের স্মরণার্থে নিম্নে উল্লেখ করা হলোÑ
‘নবী সা: একদিন মসজিদে গেলেন। সে সময় অন্য একজন লোকও মসজিদে প্রবেশ করল। লোকটি নামাজ পড়ল এবং নবী সা:-এর কাছে এসে তাঁকে সালাম জানাল। নবী সা: তাঁকে সালামের জবাব দিয়ে বললেন, গিয়ে আবার নামাজ পড়ো। কারণ, তোমার নামাজ হয়নি। (‘তোমার নামাজ হয়নি’ সব অনুবাদকারী এই অনুবাদই করেন। কিন্তু আরবিটা হলো, ‘ফা ইন্নকা লাম তুছাল্লি’ যার প্রকৃত অর্থ হওয়ার কথা, কারণ, ‘তুমি নামাজ পড়োনি’) সুতরাং সে গিয়ে আবার নামাজ পড়ল এবং ফিরে এসে নবী সা:-কে সালাম জানাল। তিনি এবারো বললেন, গিয়ে আবার নামাজ পড়ো, তোমার নামাজ হয়নি। এভাবে তিনবার। অতঃপর লোকটি বলল, সেই মহান সত্তার শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ পাঠিয়েছেন, এর চেয়ে সুন্দর করে নামাজ পড়তে আমি জানি না। সুতরাং আমাকে শিখিয়ে দেন। তখন নবী সা: বললেন, ‘যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন তাকবির বলে আরম্ভ করবে এবং কুরআনের যেখান থেকে পাঠ করা তোমার জন্য সহজ হয়, সেখান থেকে পাঠ করবে। অতঃপর এতক্ষণ পর্যন্ত এমনভাবে রুকু করবে যেন রুকুতে প্রশান্তি আসে। রুকু থেকে থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। প্রশান্তভাবে সোজা হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর সেজদা এমনভাবে করবে, যাতে সেজদায় প্রশান্তি আসে। এরপর সেজদা থেকে মাথা উঠিয়ে প্রশান্তভাবে কিছুক্ষণ বসবে। অতঃপর আবার প্রশান্তভাবে সেজদা করবে এবং তোমার সমস্ত নামাজ পড়বে।’ (সহিহ বুখারি : ৭৪৯, কিতাবুল আযান, অনুচ্ছেদ : কেউ পূর্ণরূপে রুকু না করলে নবী সা: তাকে পুনরায় নামাজ পড়ার আদেশ দিতেন) রুকু থেকে সোজা হয়ে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন, যতক্ষণ আপনার মনে প্রশান্তি না আসে। সোজা না হয়ে অর্ধ সোজা থাকতেই হুট করে সেজদায় চলে যাওয়া মহান প্রভুর সামনে বেয়াদবিরই নামান্তর। এমনিভাবে প্রথম সেজদা থেকে মাথা তোলার পর পুরোপুরি সোজা না হয়ে হুট করে দ্বিতীয় সেজাদায় চলে যাওয়াও বেয়াদবি। আপনি কার সামনে দাঁড়িয়েছেন? একটু চিন্তা করবেন, আপনার ধ্যানে নিয়ে আসবেন সেই মহান প্রভুর উপস্থিতি যিনি বিশাল সাম্রাজ্যের একক অধিপতি। পৃথিবীর যেনতেন সম্মানিত ব্যক্তি বা সরকারি কোনো নেতানেত্রীর সামনে যখন দাঁড়ান তখন তো দেখা যায় বিড়ালের মতো লেজ গুটিয়ে বিনম্্র হয়ে যান এবং আপনার সর্বপ্রকার চঞ্চলতা নির্জীব হয়ে যায়। তাহলে বিশাল আরশের মালিকের সামনে আপনি এতটা বেপরোয়া হন কিভাবে? সাবেত রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আনাস আমাদেরকে নবী সা: যেভাবে নামাজ পড়েন তা বর্ণনা করে শোনাতেন এবং নামাজ পড়ে দেখাতেন। সুতরাং নামাজে যখন তিনি রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে দাঁড়াতেন, তখন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, আমরা মনে করতাম তিনি সেজদায় যাওয়ার কথা নিশ্চয়ই ভুলে গেছেন।’ (বুখারি : ৭৫৬)
রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আপনি কি বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন? না, অনেক কিছু পড়ার আছে। আপনি রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ‘রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ, হামাদান কাছিরান তাইয়্যেবান মুবারাকান ফিহি’ পড়–ন। আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ইমাম যখন সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ বলবে, তোমরা তখন আল্লাহুম্মা রাব্বানা লাকাল হামদ বলো। কেননা, যে ব্যক্তির এ কথা ফেরেশতাদের এ কথার সাথে উচ্চারিত হবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ (বুখারি : ৭৫২, কিতাবুল আযান) রিফায়া ইবনে রাফে যুরাকি রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা নবী সা:-এর পেছনে নামাজ আদায় করছিলাম। তিনি রুকু থেকে মাথা উঠানোর সময় সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ বললে পেছন থেকে এক ব্যক্তি বলে উঠল, ‘রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ, হামদান কাছিরান তাউয়্যেবান মুবারাকান ফিহি।’ নামাজ শেষ করে তিনি (নবী সা:) জিজ্ঞেস করলেন, কে কথা বলছিল? লোকটি বলল, আমি বলেছি। তখন নবী সা: বললেন, ‘আমি দেখলাম ৩০ জনেরও অধিক ফেরেশতা সর্বাগ্রে তা লিখে নেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে।’ (বুখারি : ৭৫৫, কিতাবুল আযান)
সেজদা থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসুন এবং পড়–ন ‘আল্লামহুমাগফিরলি, ওয়ারাহামনি, ওয়ারযুখনি, ওয়াহ্দিনি, ওয়া আফিনি ওয়াফু আন্নি, ওয়াজবুরনি ওয়ারাফানি। অথবা শুধু ‘রাব্বিগফিরলি, রাব্বিগফিরলি’ পড়–ন। (তিরমিজি) সেজদায় আমরা আল্লাহর অতি সন্নিকটে চলে যাই তাই যেকোনো মাসনুন দোয়া পড়তে পারি। অনেক মাসনুন দোয়া বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। আবু হোরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘বান্দার সিজদারত অবস্থাই তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ লাভের সর্বোত্তম অবস্থা। অতএব তোমরা অধিক পরিমাণে চাও।’ (মুসলিম : ৯৭৬; কিতাবুস সালাত; অনুচ্ছেদ : রুকু-সেজদায় যা বলতে হবে)
সালাত হলো আল্লাহর জিকির স্মারক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার জিকর বা স্মরণের জন্য সালাত কায়েম করো।’ (সূরা তাহা-১৪) আল্লাহ আরো বলেন, ‘আর যখন মুনাফিকরা সালাতের জন্য দণ্ডায়মান হয়, তখন তারা অলসতাভরে দাঁড়ায়, তারা মানুষকে দেখায় এবং খুব কমই আল্লাহর জিকর (স্মরণ) করে। (সূরা নিসা-১৪২) এ দুটি আয়াতের আলোকে সালাত হলো, আল্লাহর স্মরণ। যদি আল্লাহর জিকর বা স্মরণ হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের নামাজ আমাদের মধ্যে প্রশান্তি বয়ে আনে না কেন? সত্যিকারার্থে নামাজে আমরা আল্লাহকে সেভাবে স্মরণ করি না। নামাজের মধ্যে আমরা যা পাঠ করি তা হয়তো অর্থ জানি না, অথবা তাড়াহুড়া করার জন্য অর্থের প্রতি আত্মার সংযোগ ঘটে না। ফলে আমাদের সালাতে প্রশান্তি আসে না। তাহলে আমাদের সালাত আর মুনাফিকের সালাতে পার্থক্য নিরূপিত হবে কিভাবে?
আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বা তার চেয়েও কম সময় নামাজের জন্য ব্যয় করি। এ জন্য কি আরো একটু সময় আমরা বাড়াতে পারি না? সারাদিন বেহুদা সব গল্পে অনেক সময় ব্যয় করতে পারি, কিন্তু নামাজের বেলায় যত তাড়াহুড়ো। অনেকে এই প্রাণহীন নামাজ নিয়েই সন্তুষ্ট।
লেখক : ব্যাংকার


আরো সংবাদ