১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কুরআনে কিসাস প্রসঙ্গ

-

বর্তমান বিশ্বে অন্যায়ভাবে মানব হত্যা এবং এ সংক্রান্ত অন্যায় অপরাধের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জীবিতরাও উৎকণ্ঠিত কখন কী হয়! কেউ এখন আর এ থেকে নিরাপদ ভাবতে পারছে না। সচেতন মহল তাই এর প্রতিরোধের নানা রকম উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এতদসংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকার নিয়ে আল কুরআনের একটি পন্থা হলো ‘কিসাস’। মূলত মৃত্যুর বিনিময়ে মৃত্যু কিংবা কোনো ধরনের জখমের বিনিময়ে অনুরূপ জখমের পরিভাষা হলো ‘কিসাস’ বা ‘অনুরূপ প্রতিশোধ’। ইসলামী অপরাধ আইনের গুরুত্বপূর্ণ এই পরিভাষাটি সরাসরি কুরআন ও হাদিসে ব্যবহৃত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ইসলামী অপরাধ আইনে তিন ধরনের অপরাধের কথা বলা হয়েছে। যথা : ১. কিসাস (অনুরূপ প্রতিশোধ), ২. হুদুদ (আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি) এবং ৩. তা’যির (ভীতি প্রদর্শনমূলক শাস্তি)। এসব শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো : ১. অপরাধীকে শোধরানো, ২. ক্ষতিগ্রস্তদের সান্ত্বনা এবং ৩. অন্যদের অনুৎসাহিত করা।
কিসাস মূলত কয়েকটি অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করে : ১. হত্যা (ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত উভয়ই), ২. উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে, ৩. ভুলকৃত হত্যা এবং ৪. ভুলক্রমে মানবতাবিরোধী এমন অপরাধ যা মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
পবিত্র কুরআনে কিসাসের বিধানের পাশাপাশি তার উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। কিসাসের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে দু’টি সূরায় তিনটি আয়াতে বর্ণনা এসেছে। দু’টি আয়াতে বিধান এবং অন্যটিতে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালোভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব। হে বুদ্ধিমানগণ, কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।’ (সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১৭৮-১৭৯)
অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন, ‘আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখমগুলোর বিনিময়ে সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।’ (সূরা মায়েদাহ, ৫: ৪৫)
উপরোক্ত আয়াত তিনটি থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। যেমন : ১. ন্যায়বিচার সবার জন্য, ২. ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার আছে বৈধ উপায়ে প্রতিশোধ নেয়ার, ৩. সমাবস্থার প্রতিশোধের বাইরেও শর্তসাপেক্ষে টাকা ও সম্পদের ক্ষতিপূরণও চাইতে পারবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা তার উত্তরাধিকারীরা, ৪. ন্যায়বিচার অবশ্যই আল্লাহর দেয়া বিধান মোতাবেক হতে হবে, ৫. আল্লাহর দেয়া বিধান উপেক্ষাকারীদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং ৬. কিসাসের মধ্যেই অন্যদের জীবনের নিরাপত্তা রয়েছে।
এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, হত্যাকারীকে হত্যার মধ্য দিয়ে কিভাবে জীবনকে বাঁচানো যায়? উত্তরে বলা যেতে পারে : ১. যখন কোনো অপরাধী ঠিক সমপরিমাণ শাস্তি পাবে তখন সমাজের অন্য কেউ ওই অপরাধে জড়াতে চাইবে না এটাই মানব প্রকৃতি। সুতরাং একজনের মৃত্যুদণ্ডের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের অনেকের জীবনকে নিরাপদ করা সম্ভব হবে। অন্য দিকে, ২. ‘হাতের বিনিময়ে হাত’, ‘পায়ের বিনিময়ে পা’, ‘চোখের বিনিময়ে চোখ’ বা অন্য কোনো অঙ্গের বিনিময়ে যদি অনুরূপ শাস্তি অপরাধীকে দেয়া যায় তাহলে ওই অপরাধী সমাজের জন্য ন্যায়বিচারের একটি জীবন্ত শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে। তখন অন্যরা সেই ভয়াবহতা সরাসরি অনুভব করবে এবং এ ধরনের কোনো অন্যায়ের সাথে কখনো সম্পৃক্ত করতে চাইবে না।
কিন্তু একটা কথা অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে তা হলো : ১. কিসাসের শাস্তি কিন্তু কোনো ব্যক্তি দিতে পারবে না। এটির মূল দায়িত্ব সরকার বা বিচারব্যবস্থার ওপর, ২. প্রত্যেক অপরাধেরই শাস্তি হতে হবে। এটি এমন নয় যে, আপনজনেরা শাস্তি পাবে না কিন্তু অন্যরা পাবে। অর্থাৎ কোনো বৈষম্য করা যাবে না, ৩. অনুরূপভাবে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আছে প্রতিশোধ নেয়ার, ৪. দিয়্যতের (টাকা বা সম্পদের বিনিময়ে প্রতিশোধ) ব্যাপারে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি আগে থেকেই থাকতে হবে, ৫. অপরাধী যদি ক্ষতিপূরণ দিতে অসমর্থ্য হয় তাহলে তার পরিবার এবং পরিবার অসমর্থ হলে সমাজের ওপর, এমনকি পর্যায়ক্রমে সরকারের ওপরও বর্তাবে, ৬. যেকোনো ক্ষতিপূরণ অবশ্যই নির্ধারিত নিয়মনীতির মাধ্যমে এবং বৈধ উপায়ে আদায় করতে হবে। এটি ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে বরং বিচারব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সত্যিকার অর্থেই যদি মৃত্যু ও এতদসংক্রান্ত কোনো অপরাধের জন্য সমপরিমাণ প্রতিশোধ অপরাধী থেকে নেয়া যায় তাহলে বিশ্বজিৎ কিংবা রিফাতের মতো আর কেউ দুর্ঘটনার শিকার হবে না। আল্লাহ আমাদের এরকম পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ রাখুন।
লেখক : শিক্ষক


আরো সংবাদ