১৮ অক্টোবর ২০১৯

হতাশা নয়, প্রত্যাশা

-


হতাশা শব্দের অর্থ নিরাশা, নৈরাশ্য, আশাভঙ্গ ইত্যাদি। হতাশা মানব জীবনের খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু তা দীর্ঘ দিন ধরে স্থায়ী হলে মানসিক সমস্যার সাথে শারীরিক সমস্যার কারণও হতে পারে। এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। প্রায় সবাই কোনো না কোনো কারণে হতাশায় ভোগেন। হতাশার অনেকগুলো কারণ আছে তন্মধ্যে অন্যতম হলোÑ প্রত্যাশাপ্রাপ্তির অমিল, প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থতা, ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা, মানসিক দৃঢ়তা না থাকা, একাকিত্ব, দীর্ঘ দিন পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অথচ এগুলো জীবনেরই অংশ। এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না, যে জীবনে কোনো অবস্থায়ই এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। যারা দৃঢ়তার সাথে এসব পরিস্থিতি থেকে নিজেদেরকে উত্তরণ করতে পারেন, তারাই পরবর্তীতে সফল হয়। আর দুর্বলরা ভেঙে পড়ে; জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ছুড়ে দেয়।
ইসলামের হতাশার কোনো স্থান নেই। মানুষের কোনো কিছু পাওয়ার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করার যতটা না ক্ষমতা আছে, ঠিক তার বিপরীত সমীকরণে আছে পাওয়ার নিশ্চয়তা। এসব কিছুই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ক্ষমতায় নিয়ন্ত্রাণাধীন। তিনিই বান্দাহর কাজের উদ্দেশ্য এবং প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করেন কাকে কী দেবেন আর কী দেবেন না। এই দেয়া না দেয়ার মাঝেই প্রকৃত কল্যাণ-অকল্যাণ নিহিত আমাদের জন্য, অথচ তা আমরা বুঝতে পারি না।
আমাদের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক যোগ্য, শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, চৌকস মানুষে তাদের প্রাপ্য পাচ্ছে না। পক্ষান্তরে, বিপরীত অবস্থানের মানুষেরা অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। তখনই না পাওয়া মানুষগুলো হতাশায় পড়েন। কখনো কখনো সেসব ব্যর্থতার কিছু যৌক্তিক কারণও খুঁজে বের করে নিজেদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। অথচ আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, জান-মাল ও ফসলের কিছুটা ক্ষতি দিয়ে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাওÑ যাদের ওপর কোনো মুসিবত এলে বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’Ñ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর আর অবশ্যই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাবো’ (সূরা বাকারা : ২: ১৫৫-১৫৬)।
ইসলামের শিক্ষা হলো, এগুলো যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে, সেহেতু এগুলোর মধ্যে কোনো না কোনো কল্যাণ অবশ্যই রয়েছে। আল্লাহ ঘোষণা করছেন, ‘নিশ্চয়ই দুঃখের সাথে সুখও রয়েছে’ (সূরা আল ইনশিরাহ : ৯৫:৫-৬)। এটি খুবই আশ্চর্যের যে, একই সূরায় পরপর দুইবার বাক্যটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ কেউ এই পুনরুল্লেখ করার কারণে বলেছেন, ‘প্রত্যেক একটি কষ্টের কারণে দুইটি সুখ রয়েছে এটি জানানো হয়েছে। ফলে একটি কষ্ট দুইটি ভালো কিছুকে (সুখকে) অতিক্রম করতে পারে না এটাই স্বাভাবিক।’ এরপরও আল্লাহ আশ্বস্ত করছেন, ‘... তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। ...’ (সূরা আল যুমার : ৩৯ : ৫৩)।
হতাশা থেকে মুক্তির অন্যান্য যেসব উপায় কার্যকরী হতে পারে তা হলোÑ
কুরআন তিলাওয়াত। এটির প্রভাব অতি সূক্ষ্মভাবে ব্যক্তির উপার বর্তায়। যেকোনো ধরনের হতাশা এবং অবষণœতা থেকেও মুক্তি দিতে পারে কুরআন থেকে তিলাওয়াত।
নিজের প্রতি সততা প্রদর্শন। বিষয়টি একটু অন্যরকম মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মিল-অমিলের কারণগুলো যদি খুঁজে বের করা যায়, তাহলেও এক ধরনের সান্ত্বনা পাওয়া যায়, যা হতাশা দূর করার কার্যকরী সহায়কও বটে।
নিজের ও অন্যের প্রতি সদয় হওয়া। নিজের প্রতি সদয় হওয়ার অর্থ নিজের ক্ষমতা, পরিণতি সম্পর্কে জানা এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অথচ, আল্লাহ; তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত’ (সূরা হাদিদ, ৫৭: ৩)। অন্য দিকে নিজের সমস্যার সমাধান অনেক সময় অন্যের প্রতি সদয় হওয়ার মাধ্যমেই করা সম্ভব। বিষয়টা অবাক হওয়ার মতো মনে হলেও অত্যন্ত কার্যকরী। অন্যের উপকার করতে পারলে যে ধরনের সুখানুভূতি তৈরি হয়, তা নিজের জন্য কিছু করতে পারলেও হয় না।
নিজের যা কিছু আছে তাতেই সন্তুষ্টি থাকা এবং তা প্রকাশ করা। আমাদের মন খারাপ হয় তখন যখন আমরা আমাদের অন্য কোনো ভালো অবস্থানের কারো সাথে তুলনা করি। অথচ আমাদের উচিত ঠিক তার উল্টোটা করা। হাদিসেরও শিক্ষা তাই। (বুখারি : ১৪৫৩)।
আল্লাহর কাছে দোয়া করা। তিনিই শিখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে দোয়া করতে হবে। ‘হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ নাজিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী’ (সূরা আল কাসাস : ২৮ : ২৪)।
পরিশেষে বলব, এ দুনিয়াতে সবকিছু পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ চাইলেও তা
করতে পারবে না। তাই আখেরাতের জীবন রয়েছে। সেখানেই চাওয়া-পাওয়ার পূর্ণতা পাবে যারা তাদের এই জীবনকে সত্য ও সুন্দরের জন্য ব্যয় করবে। আর একমাত্র জান্নাতিরাই সেই সৌভাগ্যবান হবেন। আল্লাহ আমাদের তার অধিবাসী হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন, আমিন।
লেখক : শিক্ষক

 


আরো সংবাদ