২৩ নভেম্বর ২০১৯

তাকাফুল : ইসলামী ইনসিউরেন্স-২

-


শুধু নাম দেখেই হালাল-হারাম বলা যায় না : শরিয়াহ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহকে সহিহ নির্দেশনা বা সঠিক সিদ্ধান্ত দানের মতো যথাযোগ্য একজন আলেম বা মুফতির কাজ হচ্ছে, মৌলিক বোধ-বিশ্বাসকেন্দ্রিক বিষয় হোক বা ইবাদত-আমল হোক বা বিয়েশাদি ও সামাজিক বিষয়াদি হোক বা লেনদেন ও ব্যবসায়-বাণিজ্য বিষয়ক কিছু হোক; তা যদি নামে ও কাজে সর্বোত্তম তিন যুগে এবং গবেষক ইমামগণের যুগে পরিচিত ও জানাশোনা বিষয় হয়ে থাকে; তা হলে তারা যেভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়টিতে ফায়সালা-সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ ও মোতাবেক (পারস্পরিক আমল ও আচরিত রীতি) যে দিকনির্দেশনা প্রদান করে গেছেন; ঠিক সেভাবেই আমাদের হালাল-হারাম বা বৈধ-অবৈধ ফায়সালা দিয়ে যেতে হবে। তার ব্যতিক্রম করার কোনো সুযোগ শরিয়তে নেই; যেমন সালাত, সওম, হজ, জাকাত প্রভৃতি বিষয়ে।
বিষয়টি যদি এমন হয় যে, দেশ-দেশান্তরের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কারণে নামে পরিবর্তিত হয়েছে বটে, তবে বাস্তব কাজে সেই একই বিষয়, একই আমল; তা হলে সেক্ষেত্রে সেই মূলের অনুরূপ তা-ও বৈধ বা অবৈধ বলে গণ্য হবে। যেমন ‘সালাত’, ‘সওম’ আমল দু’টির নাম পরিবর্তিত হয়ে, পারস্য অঞ্চলে ও উপমহাদেশে ‘নামাজ’ ও ‘রোজা’ নামে পরিচিত ও প্রচলিত হয়ে আছে। এতে শরিয়তে কোনো সমস্যা নেই। কারণ মূল কাজ বা আমল সেই একই।
আরেকটু স্পষ্ট করে বলা যায়, মনে করুন! একটা লোকের নাম ‘নির্মল’ বা ‘বিমল’ বা ‘বিপ্লব’ যার অর্থও একেবারে খারাপ বা তেমন মন্দ নয়! পরিষ্কার বা পরিচ্ছন্ন, ময়লামুক্ত ও ইনকিলাব-সংগ্রাম। আমাদের কুরআনের শব্দ ‘তাজকিয়া’ বা ‘তাসফিয়া’ ও জিহাদ-সংগ্রামের কাছাকাছি অর্থ। এখন এই নামের কেউ যদি মুসলমান হয় বা একজন মুসলমান এমন নাম ধারণ করেন; কিন্তু তার কাজকর্ম, ইবাদত-বন্দেগি সব শরিয়ত মতে ঠিক থাকে; তা হলে শরিয়ত কি তাকে একজন মুসলমান বলে স্বীকৃতি দেবে না? অবশ্যই দেবে; যদিও নামটি আরবি শব্দে হয়নি। এ ক্ষেত্রে বেশির চেয়ে বেশি শরিয়ত এ টুকু বলতে পারে যে, ‘আরবি ভাষায় হলে বা দাসত্ব প্রকাশ পায় এমন হলে বা আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর নামের সাথে মিল করে নাম রাখলে, অধিক ভালো হতো!’ আর এটি সবাই জানেন যে, ‘ভালো’ বা ‘অধিক ভালো’ বিষয়গুলো আপেক্ষিক, যার কোনো শেষ নেই। যে কারণে আইন এসব ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির সুযোগ দেয় না।
সুতরাং ‘ইনসিউরেন্স’ বা ‘তাকাফুল’ নামটির আড়ালের অর্থ যদি ভালো হয়, পারস্পরিক কল্যাণ সাধন যদি লক্ষ্য ও মুখ্য হয়, সঞ্চিত ও আহরিত অর্থ যদি শরিয়তের বৈধ ও হালাল ব্যবসায়-বাণিজ্যের পদ্ধতি-প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করা হয়। যেমন মুদারাবা, মোরাবাহা, মুশারাকা ও বা‘য়ে সালাম প্রভৃতি এবং তা থেকে পূর্ব-স্থিরীকৃত কর্মকৌশল ও বৈধ শর্তাবলির আওতায় বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ, যাবতীয় খরচ বাবদ এটা অংশ এবং ঝুঁকি মোকাবেলায় একটা অংশ প্রদান করা হয়; তা তো শরিয়ত মোতাবেক হালাল না হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না!
আর যদি এমন হয় যে, ঝুঁকি মোকাবেলায় শুরুতেই পূর্বশর্ত ও সম্মতি মোতাবেক প্রিমিয়ামের ৫ শতাংশ বা ২ শতাংশ হারে শেয়ারহোল্ডাররা প্রদান করে থাকেন বা রাখা হয়; সেটি তো আরো উত্তম (যা কিনা আমাদের জানা মতে ফারইস্টসহ বিভিন্ন ইনসিউরেন্স কোম্পানি করে থাকে)। সুতরাং যারা মূল বিষয়টি কী? কী করা হয়? কিভাবে করা হয়? পন্থা-পদ্ধতি-প্রক্রিয়া কেমন?Ñ এসব ভালো করে না জেনে, না বুঝে শুধু ‘বিমল’, ‘নির্মল’ ও ‘বিপ্লব’ বা ‘ইনসিউরেন্স’ নাম দেখেই ‘হারাম’ বা ‘না-জায়েজ’ বা ‘সুদি’ বলে ফেলেন কিংবা ‘ফাতওয়া’ দিয়ে বসেন; তাঁরা আর যাই হোন না কেন, একজন মুহাক্কিক আলেম বা মুফতি হতে পারেন না।
আর বিষয়টি যদি এমন হয় যে, নামে সেই সহিহ-সঠিক, শরিয়তসম্মত; কিন্তু কাজে-কর্মে, বোধ-বিশ্বাসে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা অসহনীয় মাত্রার ভিন্নতা রয়েছে; তা হলে নাম সহিহ হলেও, সেই নাম বা নামধারীদের বা তাদের তেমন কর্মকাণ্ডকে বৈধ বলা হবে না, বলা যাবে না। যেমন কাদিয়ানিদের ‘ইসলাম’-কে বা তাদের নামাজ-রোজাকে বৈধতার সিদ্ধান্ত বা স্বীকৃতি প্রদান করা জায়েজ হবে না।
ঠিক তেমনি কেবল নামে ইসলাম বা ইসলামী দেখে কিংবা মুদারাবা, মুশারাকা ইত্যাদি শর‘ঈ হালাল ব্যবসার টার্মগুলো যদি ফরমে, সাইনবোর্ডে থাকে অথচ বাস্তবে এগুলো অনুসরণ করা না হয় এবং তা তদারকি করার মতো শরিয়তের ব্যবসায়-বাণিজ্য অধ্যায় ভালো বোঝেন এমন কোনো আলেম বা শরিয়াহ বোর্ড না থাকে; সে ক্ষেত্রে নামে মুসলমান বা নামে ‘শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত’ হওয়ারও কোনো মূল্য নেই। তেমন কোনো কোম্পানি বা অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানকে শরিয়তসম্মত বলা এবং তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্যকে হালাল বলা যাবে না।
লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

 


আরো সংবাদ