২৩ নভেম্বর ২০১৯

তাকাফুল : ইসলামী ইন্স্যুরেন্স-৪

-


ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ও জুয়ার প্রশ্ন : শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ইন্স্যুরেন্স প্রক্রিয়া-পদ্ধতি যারা অবলম্বন করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে জুয়া ও লটারি প্রভৃতির তো প্রশ্নই আসে না এবং তার কোনো প্রয়োজনও পড়ে না। এমনটি প্রশ্ন আসতে পারে, হয়তো সুদি কার্যক্রম দ্বারা পরিচালিত ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ক্ষেত্রে। ইসলামী ইন্স্যুরেন্সগুলোতে বীমার দাবি পরিশোধে দু’টি প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়ে থাকে বা হতে পারে। যার একটির কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি, অর্থাৎ সাধারণত এমন প্রয়োজনে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী উদ্যোক্তারা একটা তহবিল ‘তাবাররু‘ নামে পৃথক গঠন করে রাখেন এবং মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মোতাবেক পূর্বসম্মতি ও শর্ত মোতাবেক প্রত্যেক সদস্য ও শেয়ারহোল্ডার নিজ নিজ প্রিমিয়াম বা কিস্তি হিসাবে যে টাকার অঙ্ক জমা করেন, তার উদাহরণত ৫ শতাংশ ওই ‘তাবাররু’ ফান্ডে চলে যায়। অবশিষ্ট মূল টাকা এবং এই ছোট অঙ্ক সবই ব্যবসায়-বিনিয়োগে লেগে থাকে। উভয় ফান্ডের বিনিয়োগ থেকেই মুনাফা আসে। তবে এরই মধ্যে যদি কোনো সদস্য মারা যান বা দুর্ঘটনাকবলিত হন; তা হলে সে ক্ষেত্রে এই তাবাররু ফান্ড হতে সংশ্লিষ্ট বিপদগ্রস্তের বীমার দাবি সহজেই পরিশোধ করে দেয়া যায়। এখানে লটারিরও কোনো সুযোগ ও প্রয়োজন নেই এবং জুয়াবাজিরও প্রশ্নই উঠে না। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা পুরোপুরি না বুঝেও না জেনে অথবা অবাস্তব শোনা কথায় বিশ্বাস করে, প্রশ্ন করে থাকি কিংবা অপপ্রচারে জড়িয়ে পড়ি। অথচ পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা হলো Ñ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; কর্ণ, চক্ষু, হৃদয়Ñতার প্রত্যেকটির সম্পর্কেই কৈফিয়ত তলব করা হবে’ (বনি ইসরাঈল : আয়াত নং-৩৬)।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘সহজেই বীমার দাবি শোধ’ করা যায় কিভাবে? এক সাথে পাঁচ লাখ, বিশ লাখ বা আরো বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে তা কিভাবে সম্ভব? ছোট একটা অঙ্কের প্রিমিয়াম জমা করে, অল্প কিছু দিন পর মৃত্যুতে একটা বিরাট অঙ্ক প্রাপ্তিতে লটারি বা জুয়ার সাদৃশ্য -এর প্রশ্ন উঠছে না? তার জবাব হলো, প্রতিষ্ঠিত বড় বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের মাসিক/ত্রৈমাসিক/ষাণ¥াষিক/বার্ষিক প্রদেয় কিস্তি যা-ই হোক, গড়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার সদস্যের যে প্রিমিয়ামগুলো জমা পড়ে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই একটা বড় অঙ্ক জমা হয়ে থাকে। যার ৫ শতাংশ হারে বিপদগ্রস্ত সদস্যের সাহায্যার্থে পূর্ব সম্মতি ও শর্ত মোতাবেক ‘তাবাররু’ ফান্ডে জমা হলো; সেখানেও একটা বড় অঙ্ক হয়ে যাচ্ছে, অথচ প্রতি মাসে হাজার হাজার সদস্য বিপদগ্রস্ত বা মারা যাচ্ছেন না। মাসে বা ছয় মাসে একজন সদস্য মারা গেলে তার বীমার দাবির বড় একটা অঙ্ক শোধ করা মোটেও কঠিন হয় না। কেননা সংশ্লিষ্ট জড়িত অভিজ্ঞজনদের ভাষ্য মতে, এ ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি বা বীমার দাবি পরিশোধ করতে গিয়ে মূল প্রিমিয়ামে হাত দেয়ার প্রয়োজনই পড়ে না; কেবল তাবাররু তহবিল থেকে শোধ করে, তাতেও বড় মাপের তহবিল অবশিষ্ট থেকে যায়। সুতরাং যেখানে ‘জুয়া’র অস্তিত্বই নেই সেখানে জুয়া বা জুয়ার সাদৃশ্য খোঁজা বা তেমন কাল্পনিক চিন্তা বা যোগ-বিয়োগ সাজিয়ে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সগুলোকেও সুদি বীমার কাতারে ফেলে, চোখ বন্ধ করে ফাতওয়াদানের অধিকার ইসলামী শরিয়ত কাউকে প্রদান করেনি।
আমাদেরকে আমাদের উস্তাদ ও প্রবীণ আলেমদের ব্যাপারে, বিশেষত যেখানে ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী বীমা শুরুর প্রারম্ভিক কালে জাতীয় মসজিদের সাবেক খতিব উস্তাদুল-আসাতেজা হজরত মাওলানা উবায়দুল হক প্রমুখের মতো হাক্কানি ও মুত্তাকি মনীষীরা ওই ব্যাংক ও বীমাকে ইসলামীকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন; সুদি প্রক্রিয়া-পদ্ধতি ও জুয়ামুক্তির ব্যবস্থাপনা হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন; এমনকি নিজেরা শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, প্রচলিত সুদি ও ইসলামী ব্যাংকিং ও বীমাকে পৃথক করে দিয়ে গেছেন। সেখানে তাঁদের প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস রাখা চাই। তার পরেও কোথাও যদি সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয়, তা অনুসন্ধানের তো আমাদের সুযোগ আছেই। সুতরাং ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ হিসেবে বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক মতলবে এসব ইসলামী ব্যাংকিং ও বীমা ব্যবস্থাকে বিতর্কের দিকে ঠেলে দেয়া এবং সাধারণ মুসলিম জনতাকে সন্দেহের দিকে ঠেলে দেয়া নিজের পায়ে নিজেদের কুঠারাঘাত করার নামান্তর।
উল্লেখ্য, আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন যে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মৃত্যুর পূর্বে (সম্ভবত) ১৯৭৪ সালে ওআইসি সম্মেলনে আর্থিক ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ইসলামীকরণে স্বাক্ষর করে এসেছেন! যা পরবর্তীতে ( যাদের মাধ্যমেই হোক) উনিশ শ’ আশির পরে বাংলাদেশে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার সেই একই বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম দু’টি ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় বিদগ্ধ ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন, এ জেড এম শামসুল আলমের লেখা ‘ইসলামী তাকাফুল’ পুস্তকটিতে। যেমন :
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ইতোমধ্যেই দু’টি ইসলামী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং একটি ইসলামী জীবন বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়ে এক বিরাট এবং বিরল অবদান রেখেছেন। উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদসহ আরো অনেকে। আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ’ (পৃ. ৮)। সমাপ্ত
মুফতি : ইসলামি ফাউন্ডেশন


আরো সংবাদ