২৩ নভেম্বর ২০১৯

শিশু হত্যা-নির্যাতনের কারণ ও প্রতিকার

-


বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের (শিশুদের) স্নেহ ও মমতা করে না এবং আমাদের বয়স্কদের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে জানে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (আবু দাউদ ও তিরমিজি)। মনীষী জেমস রাসেল বলেছেন, ‘শিশুরা হচ্ছে ঈশ্বরের দূত, দিনের পর দিন যারা প্রেম, আশা এবং শান্তি সম্পর্কে প্রচারের জন্য প্রেরিত হয়।’ কবি বলেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’ (কিশোর, গোলাম মোস্তফা)। আজকের এই শিশুরাই আমাদের কাছে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র :মিডিয়াতে চোখ পড়লেই শিশু হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ প্রভৃতি খবর শুনে সবাই আঁতকে উঠছি। জাতির জন্য এ এক ভয়াবহ সংবাদ! মহামারী আকারে বেড়ে চলেছে দিন দিন। একে মহোৎসব বলেও অনেকে খেদোক্তি করছেন। মায়ের পেটের শিশু পর্যন্ত আজ গুলিবিদ্ধ হচ্ছে এই দেশে। জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্তের ১৫ আগস্টের প্রধান শিরোনাম : ‘সাত মাসে ১৯১ হত্যাÑ বাড়ছে শিশুহত্যা নির্যাতন’। শিশু অধিকার ফোরাম, অধিকার ও পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত সাত মাসে (গত ৯ আগস্ট পর্যন্ত) ১৯১ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু নির্যাতন ও নির্যাতন পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি এ ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রতিনিধি অ্যাডওয়ার্ড গত ৬ আগস্ট বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেছেন, ইউনিসেফ উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছে যে, বাংলাদেশে খুব অল্প দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে পিটিয়ে শিশুহত্যা করা হয়েছে।
ওই পত্রিকার বিস্তারিত রিপোর্টে আরো জানা যায়, ‘শিশু নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় গত ৩ আগস্ট ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে সুটকেসের ভেতরে থাকা একটি ৯ বছরের ছেলে শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার বুকে ও কপালে ছ্যাঁকার দাগ আর পিঠে পাঁচ ইঞ্চির মতো গভীর জখমের চিহ্ন ছিল। এরপর ৪ আগস্ট শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটল আরেকটি। অভাবের তাড়নায় স্কুলের পড়া ছেড়ে গ্যারেজে কাজ নিয়েছিল ১২ বছরের শিশু রাকিব হাওলাদার। শিশু রাকিবকে গ্যারেজ মালিক মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়ার কমপ্রেসার মেশিনের নল ঢুুকিয়ে দেয় তার মলদ্বারে। এরপর চালু করে দেয়া হয় কমপ্রেসার। শিশু রাকিবের দেহে বাতাস ঢুকে ছিঁড়ে যায় পেটের নাড়িভুঁড়ি। ফেটে যায় ফুসফুসও। এর আগে সিলেটে চুরির অভিযোগে শিশু সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৫ আগস্ট বরগুনায় মাছ চুরির অভিযোগে রবিউল আউয়াল নামে ১১ বছরের এক শিশুকে শাবল দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট চাঁদপুরে অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ দিতে গিয়ে নিজ কন্যা সুমাইয়া আক্তারকে (৩) পিটিয়ে খুন করেছেন এক দম্পতি। এর মাস খানেক আগে গত ২৫ জুলাই গাইবান্ধায় গরু চুরির অভিযোগে আরিফ মিয়া (১৩) নামে এক কিশোরের পা ভেঙে দিয়েছে নির্যাতনকারীরা। এতেও থেমে থাকেনি, সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দিয়ে তারা আরিফের শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি সিলেটে বাবা ও চাচারা মিলে এক শিশুকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করেছে। এভাবেই প্রতিনিয়ত ঘটছে শিশু নির্যাতন ও নির্যাতন পরবর্তী হত্যাকাণ্ড।’
শিশু আইনে কী আছে : শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করে, যাতে সংশ্লিষ্ট শিশুর দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়, শরীরের কোনো অঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি হয় বা কোনো মানসিক বিকৃতি ঘটে, তিনি এই আইনের অধীন অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং ওই অপরাধের জন্য তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
কারণ ও প্রতিকার : বিশেষজ্ঞরা অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, অজ্ঞতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রভৃতিকে দায়ী করছেন। মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্নার মতে, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে শিশু নির্যাতন ও নির্যাতন পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, এ থেকে উত্তরণের জন্য মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রয়োজন রয়েছে। শিশু নির্যাতন হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কমানো যেতে পারে। একই সাথে আইনের ব্যত্যয় কোথায় আছে তা গবেষণা করে বের করা উচিত বলেও তিনি মতপ্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেছেন, মূলত দরিদ্র শ্রেণীর শিশুরা, শ্রমজীবী বাবা-মায়েদের এবং তাদের অনুপস্থিতিতে এ শিশুদের দেখার কেউ থাকে না। আরেকটি গ্রুপ যারা নিজেরাই কর্মজীবী তারা এবং গৃহকর্মীরা ধর্ষণের ঝুঁকিতে থাকছে বেশি। তিনি বলছেন, অনেকে অজ্ঞতার কারণে আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকেই আদালত বা পুলিশের কাছে যাচ্ছে না। ফলে এসব অপরাধ ঘটছেই। অনেক শিশু বা অভিভাবকই জানেন না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়?
আজ সর্বক্ষেত্রেই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। একটা শুরু হয়ে শেষ না হতেই আরেকটা সমস্যা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন আগেও ইভটিজিংয়ের ভয়াবহতা ছিল ভয়াবহ। টলারেন্সের অভাব, ধনী-গরিব বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, ধর্ষণ-মারাত্মক এক সমস্যার মুখোমুখি আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ শিশুরা। এগিয়ে আসতে হবে এবং সোচ্চার হতে হবে সচেতন ও বিবেকবানদের। আর নয় শিশু ধর্ষণ, হত্যা আর নির্যাতন। আসুন সবাই আরো সহনশীল হই, এই সহনশীলতা আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক সমস্যা আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে। শৈশবকালেই শিশুদের নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষাদান নিশ্চিত করি। তাই শিশুদের জন্য কাক্সিক্ষত নিরাপদ আবাস ও সুন্দর পৃথিবীর উপহার আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। মহান আল্লাহর অপূর্ব দান এ শিশুদের আমরা আদর, স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে ভরে তুলি নিজ নিজ আঙ্গিনাকে।
লেখক : নিবন্ধকার


আরো সংবাদ