১১ ডিসেম্বর ২০১৯

সভ্যতা বিকাশে করণীয়

-

মানুষ পৃথিবীতে অন্যদের মতো শুধু প্রাণী নয়, কিছু মানবীয় বৈশিষ্ট্য তাকে তাবৎ প্রাণীকুল থেকে আলাদা করেছে। মানুষের যেমন আছে জৈবিক বা বস্তুগত দিক, তেমনি রয়েছে নৈতিক দিক। মানুষের মধ্যে যৌনাচার, ক্ষুধা, বিশ্রাম, কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা ইত্যাদি বস্তু প্রবৃত্তি সক্রিয়। অপর দিকে ধৈর্য, উদারতা, ক্ষমা, মহত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা ইত্যাদি মহৎ নৈতিক গুণাবলিও মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। মানুষ অধিকমাত্রায় ‘আত্মা’ সর্বস্ব। অন্য প্রাণীদের জৈবিক সত্তাই মুখ্য। মানুষ ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে পারে। প্রাণীদের নৈতিক সত্তা অনুপস্থিত। মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও চেষ্টা করার এখতিয়ার আছে। কিন্তু প্রাণীদের স্বাধীন কোনো সত্তা নেই, নিয়তি ও প্রকৃতির বিধি মানতে বাধ্য। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা, প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আছে। আর প্রাণীরা মানুষের নিয়ন্ত্রণেও অধীন। মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। এমন মর্যাদার পরও মানুষ যখন শুধু কু-প্রবৃত্তির দাস হয়ে পড়ে তখন তার অবস্থা প্রাণীদের চেয়ে নিম্নস্তরে পর্যবসিত হয়। আর মানুষ থাকে না। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর (তাদের কতককে তার স্বভাবদোষে) সর্ব নিম্নে পতিত করেছি’ (সূরা ত্বিন, আয়াত : ৪-৫)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘তাদের রয়েছে অন্তর, কিন্তু তা দিয়ে তারা অনুভব করে না, তাদের চক্ষু রয়েছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না, তাদের কর্ণ রয়েছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না, তারা হলো পশুর ন্যায় বরং তা অপেক্ষাও অধিক অধম’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত : ১৭৯)।
তদুপরি আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন অতিমূল্যবান নেয়ামত জ্ঞান : যার দ্বারা মানুষ বোঝে, চিন্তা করে, উপলব্ধি করে ও কথা বলে। এই জ্ঞানের দ্বারাই মানুষ আল্লাহকে চিনতে পারে। মানুষের চোখ, কান, নাক, জিহ্বা তথা পঞ্চইন্দ্রিয় জ্ঞান অর্জনের প্রথম মাধ্যম। আকল বা বিবেক জ্ঞান অর্জনে দ্বিতীয় মাধ্যম। আর ‘অহিয়ে ইলাহি’ জ্ঞান অর্জনে স্বচ্ছ ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অন্য দিকে বিদ্যাÑ যা মানুষকে বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, কবি ও সাহিত্যিক সৃষ্টি করে। বিদ্যাই মানুষকে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি বানায়। যাদের থেকে উপকৃত হয় সারা বিশ্বের মানুষ।
মানুষের নৈতিক সত্তা বা গুণাবলির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে মানব সমাজ। মানুষের জৈবিক আকৃতি ও গঠন নয় বরং নৈতিক সত্তাই মানুষকে মনুষ্যত্বের চেতনায় রূপান্তর করে। মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানায়। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘শপথ মানুষের এবং তার যিনি তাঁকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সেই সফলকাম হবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং সেই ব্যর্থ মনোরথ হবে যে নিজেকে কুলষিত করবে’ সূরা আস-শামছ আয়াত ৭-১০। নৈতিক সত্তার পরিপূর্ণতার মধ্যেই মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য নিভর্রশীল।
পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে কিন্তু সৎ মানুষ বাড়েনি। শিক্ষিতের হার বাড়ছে কিন্তু সুশিক্ষিতের সংখ্যা বাড়েনি। আইন বেড়েছে, কিন্তু অপরাধী কমেনি। দেহের সৌন্দর্য বাড়লেও চরিত্র বাড়েনি। শিক্ষক বেড়েছে কিন্তু শিক্ষকদের নীতিবোধ বাড়েনি। নেতার সংখ্যা বাড়লেও নীতিবানের সংখ্যা বাড়েনি। সমাজে মানুষ থাকলেও মনুষ্যত্ব আজ তিরোহিত। আজ আমরা নৈতিকতার উন্নতির চেয়ে বস্তু সত্তা ও প্রবৃত্তির উৎকর্ষতার জন্য বেশি ব্যস্ত।
গুম, খুন, হত্যা, সন্ত্রাস, লুটপাট, চাঁদাবাজি চলছে অবলীলায়। ১০ টাকার জন্য মানুষ খুন হয়। মা সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করছে, সদ্য প্রসূত শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলছে। শিশুরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। প্রেমিক সেজে বান্ধবীকে পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা ও লাশ টুকরা টুকরা করতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। মানুষ জুয়ার ব্যবসায় বসিয়ে হচ্ছে ক্যাসিনো কিং। লাল পানির নেশা ও উদ্যোম নৃত্যের ঘোরে ঘটছে রুচিবিবর্জিত সব জঘন্য অপরাধ। বিল্ডিংয়ে রডয়ের পরিবর্তে বাঁশ দিচ্ছে। শেয়ার বাজার, ব্যাংক, কয়লা, পর্দা, বালিশ, টিন, বই ইত্যাদি নিয়ে ঘটছে কলঙ্কজনক কাণ্ড। মানুষ্যত্ব ও নৈকিতকতা আজ দুর্বৃত্তায়নের খাঁচায়, মানুষরূপী অমানুষদের হাতে বন্দী। অথচ কুকুর প্রশিক্ষিত হয়ে গোয়েন্দার কাজ করছে, টিয়া পাখি মানুষের মতো কথা বলছে, ডলফিন বিভিন্ন কসরত দেখিয়ে নৃত্য করছে, জঙ্গলের গাছ হচ্ছে সুসজ্জিত আসবাবপত্র। কিন্তু কেন মানুষের এ অধঃপতন? মানুষ পাপ ও পুণ্যের হিতাহিত শূন্য এক পাষণ্ড নরাধমে পরিণত হচ্ছে। যা পশুবৃত্তের চেয়ে ভয়ঙ্কর। মানুষের অন্তর মরে যাচ্ছে। লোহার মতো মনুষ্যত্বের ওপর মরিচা ধরছে।
মুক্তির জন্য দরকার মনুষ্যত্বের বিকাশ। নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং মানুষের বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা। মানুষ মনের চাইতে মনুষ্যত্ব মনের পরিপুষ্টি দরকার। দরকার সুশিক্ষা। কোনো জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই। বরং সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করলেই হবে। ফলে কুশিক্ষায় শিক্ষিত ডাক্তারদের হাতে রোগীর মৃত্যু হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে দালান-কোঠা, ইমারত ধ্বংস হবে এবং অর্থনীতিবিদদের দিয়ে দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হবে। বিচারকদের হাতে বিচারব্যবস্থার কবর রচিত হবে। সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মানে হলো একটি জাতির অবলুপ্তি এবং দুর্নীতির মহোৎসব ও দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি চালুর নামান্তর। মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশিক্ষা ও আদর্শনির্ভর নৈতিক শিক্ষা দরকার।
আল্লাহর ভয় অবক্ষয় থেকে মুক্ত করে মনুষ্যত্বের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করে। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক, তাহলে তিনি তোমাদের অন্তরে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার মাপকাঠি দান করবেন। তিনি তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন’ সূরা আল আনফাল, আয়াত : ২৯। আল্লাহকে ভয় করা ফরজ। আল্লাহর ভয় মানুষকে সবসময় এমনকি নিভৃতে-একান্তেও খারাপ থেকে ফিরিয়ে রাখে। গুনাহ বর্জনে সহায়তা করে।
মনুষ্যত্ব বিকাশে আখেরাতের ভয় জরুরি। পরকালের চিন্তা যদি মানুষের অন্তর ও হৃদয়ে পরিপূর্ণ রূপে স্থির হয়ে যায়, তাহলে সে আর অন্যায় কাজে হাত বাড়াবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দান কর অথচ আখেরাতের জীবনটাই হলো উত্তম ও চিরস্থায়ী’ (সূরা আল-আ’লা, আয়াত : ১৬-১৭)। মৃত্যুর স্মরণ পাপ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের পরিচয় লাভ করেছে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করেছে’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৬৫০১)। মৃত্যুই মানুষের জীবনে শেষ নয়। ফলে আখেরাতের প্রাপ্তিকে অগ্রাধিকার দিন।
প্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ পাপ কাজে লিপ্ত হয়। কুপ্রবৃত্তি মানুষকে অন্যায় কাজে ধাবিত করে, মনুষ্যত্বকে পরাজিত করে তাকে প্রবৃত্তির দাস বানায়। সুকুমার বৃত্তির জন্য তাই প্রবৃত্তির দমন দরকার। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করবে ও নিজের প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বিরত থাকবে। অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা’ সূরা আন-নাজে’য়াত, (আয়াত : ৪০-৪১)। রাসূল সা: বলেন, ‘সেই লোক প্রকৃত মুজাহিদ যে নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে’ (আত-তিরমিজি, হাদিস-১৫৪৬)। এভাবে প্রবৃত্তিকে আল্লাহর ইচ্ছার অনুগত বানিয়ে নিন।
মনুষ্যত্বের বিকাশের জন্য চাই আত্মপর্যালোচনা। ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য ছুটছি, না অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি? রাসূলে করিম সা: বলেছেন, ‘তোমাকে হিসেবের জন্য ধরার আগেই তুমি নিজের হিসেবটা নিয়ে নাও’। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনুপরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে। আর যে অনুপরিমাণ মন্দ কাজ করবে, তা-ও সে দেখতে পাবে’ (সূরা জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)। ভালো ও মন্দ সব কাজই সামনে আসবে। আত্মপর্যালোচনা পাপ বর্জনে সহায়তা করে।
সংস্কৃতি মনুষ্যত্ব বিকাশের ভিত্তিস্বরূপ। নৈতিক চরিত্র গঠনে সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, গান ইত্যাদি বিস্তর ভূমিকা রাখে। মানুষের চিন্তা, কল্পনা, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজকর্ম, সভ্যতা সবই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হতে হবে সমাজের বেশির ভাগ মানুষের বিশ্বাসবোধে উজ্জীবিত, মানব কল্যাণধর্মী ও অশ্লীলতা মুক্ত। আমাদের সংস্কৃতি বোধ করি এ গুলোর প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে অপসংস্কৃতি আমাদের বিবেকবোধকে কুরে কুরে ধ্বংস করছে। মনুষ্যত্ব বিকাশে সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের বিবেক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আদালত। কথাটি অনেক বড় অর্থবোধক। মনুষ্যত্ব বা বিবেকবোধ অথবা নৈতিক চরিত্র প্রতিটি মানুষের অভ্যন্তরে একটি আদালত বা বিচারব্যবস্থা। (ওহঃবৎহধষ ঈড়ঁৎঃ) হিসেবে কাজ করে। বিবেক স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেতর থেকে মানুষকে ‘মনুষ্যত্বের’ পথে পরিচালিত করে। অন্যায় ও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ব্যক্তিকে সাবধান করে। যা বাহ্যিক আদালত বা প্রশাসন (ঊীঃবৎহধষ ঈড়ঁৎঃ) করতে পারে না।
নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও মানুষের বিশ্বাসবোধ ধ্বংস হলে মানুষ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব বিনাশ হতে বাধ্য। বস্তুত তার আলামত প্রস্ফুটিত হচ্ছে। মানুষের এই সুকুমারবৃত্তি বিকাশের জন্য দেশে ও বিদেশে আন্দোলনের দরকার। রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, প্রশাসন যন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, আইনসভা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সর্বত্র দরকার এগুলো লালন ও পরিপালন। দরকার ভালো মানুষের উদ্যোগ, অন্যথা মানব সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য। কারণ, অসৎ লোকদের কর্মকাণ্ডে সমাজ ধ্বংস হয় না, সমাজ ধ্বংস হয় সৎ লোকদের নীরবতায়।
লেখক : সিনিয়র ব্যাংকার


আরো সংবাদ