২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সহনশীলতায় রয়েছে কল্যাণ

সালেহ মসজিদ, সানা, ইয়েমেন -

চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তির ধর্ম হিসেবে ইসলামের সপক্ষে যে দাবি প্রচলিত রয়েছে, পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা প্রায়ই এই দাবিকে অসত্য মনে করেছেন এবং তারা এখনো তা করছেন। পবিত্র কুরআনে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে গাত্রবর্ণ, ভাষা, জাতি বা সম্পদের তারতম্যজনিত যে প্রভেদগুলো রয়েছে তা নিতান্তই স্বাভাবিক (৩০ : ২২); এমনকি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা মানুষের মধ্যে আদর্শগত ও ধর্মমতগত বৈচিত্র্যকে তার নিজেরই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করেছেনÑ ‘... আল্লাহ তায়ালা চাইলে তোমাদের সবাইকে একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করে দিতে পারতেন। তিনি বরং চেয়েছেন তার দেয়া অনুগ্রহের ভিত্তিতে তোমাদের যাচাই-বাছাই করে নিতে। অতএব ভালো কাজে তোমরা সবাই (একে অন্যের সাথে) প্রতিযোগিতা করো...’ (সূরা আল মায়েদা-৫ : ৪৮)। ইসলামের এই বহুমত সহিষ্ণুতা ক্যাথলিক মতবাদের (বীঃৎধ বপপষবংরধস হঁষষঁস ংধষঁং) (চার্চের বাইরে কোনো নবী নেই) এর সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব। এমনকি ইসলামের নবী সা: স্বয়ং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, অতিরিক্ত বহুমত সহিষ্ণুতার কারণে তাঁর নিজের অনুসারীরাও দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। এই মনোবৃত্তি ইসলামের অনুসারীদের পরমতসহিষ্ণু হতে বাধ্য করে, যা খোদ কুরআনেই সমর্থিত হয়েছে। (হে নবী) তুমি বলো, এই সত্য (কুরআন) তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে এসেছে। সুতরাং যার ইচ্ছে সে ঈমান আনুক, আর যার ইচ্ছে সে অস্বীকার করুক...’ (সূরা আল কাহফ-১৮ : ২৯)। (হে নবী) তোমার মালিক চাইলে এ জমিনে যত মানুষ আছে তারা সবাই ঈমান আনত। তুমি কি জবরদস্তি করে চাইবে যে, তারা সবাই মুমিন হয়ে যাক’ (সূরা ইউনুস-১০ : ৯৯)। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে, কোনো কোনো খ্রিষ্টান মিশনারিগোষ্ঠী যে ধরনের জবরদস্তিমূলক প্রচারণা ও ধর্মবিশ্বাসকে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করে, ইসলাম তা অনুমোদন করে না। এমনকি স্বয়ং রাসূল সা:-কেও এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল।
‘তুমি হচ্ছো (পরকালের আজাবের) ভয় প্রদর্শনকারী (একজন রাসূল মাত্র)’। যদি এসব মানুষ তোমার সাথে (এই জীবন বিধানের ব্যাপারে) কোনোরূপ বির্তকে লিপ্ত হয়, তাহলে (তুমি তাদের) বলে দাও, আমি ও আমার অনুসারীরা (সবাই) আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছি। অতঃপর যাদের (আমার পক্ষ থেকে) কিতাব দেয়া হয়েছে এবং যারা (কোনো কিতাব না পেয়ে) মূর্খ (থেকে গেছে) তাদের (সবাইকে) জিজ্ঞেস করো, তোমরা কি সবাই আল্লাহর আনুগত্য মেনে নিয়েছ? (হ্যাঁ) তারা যদি (জীবনের সর্বক্ষেত্রে) আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয়, তাহলে তো ভালো কথাই), তারা তো সঠিক পথ পেয়ে গেল, কিন্তু তারা যদি (ঈমান থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমার কোনো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার কারণ নেই) তোমার দায়িত্ব হচ্ছে কেবল (আমার কথা) পৌঁছে দেয়া, তারপর বান্দাদের (কার্যকলাপ) পর্যবেক্ষণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালাই রয়েছেন’ (সূরা আলে ইমরান-৩ : ২০)। (হে নবী) তুমি (এদের আরো) বলো, হে মানুষ! তোমাদের কাছে মালিকের পক্ষ থেকে সত্য এসেছে। অতএব (এ সত্যের ভিত্তিতে) যে হেদায়েতের পথ অবলম্বন করবে, সে তো তার নিজের ভালোর জন্যই হেদায়েতের পথে চলবে। আর যে গোমরাহ থেকে যাবে, সে তো গোমরাহির ওপর চলার কারণে (এমনিই) পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আসলে আমি তো তোমাদের ওপর কর্মবিধায়ক নই (যে তোমাদের জোর করে গোমরাহির পথ থেকে বের করে আনব)’ (সূরা ইউনুস-১০ : ১০৮)।
এই পরিপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যবহারিক সহনশীলতার মূলে রয়েছে একটি আবেদন যা যুগপৎ আদর্শিক এবং বাস্তবিক রূপে সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছেÑ আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোনো ধরনের জবরদস্তি কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই। এর অর্থ হচ্ছেÑ যেহেতু বিশ্বাস একটি মনোজাগতিক প্রক্রিয়া, ধর্মীয় জবরদস্তি একটি নিষ্ফল প্রচেষ্টা মাত্র এবং এটি নিষিদ্ধও বটে। এ কারণেই ধর্মীয় মতবিরোধ ও বির্তককে একটি বন্ধুত্ব এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরিচালিত করার তাগিদ রয়েছে এবং এগুলোর ফলাফলকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে (৪ : ৫৯)।
‘প্রকৃতপক্ষে পবিত্র কুরআনের সব কটি সূরাতেই মানুষকে প্রদত্ত চিন্তাশক্তি ও যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগ করে তার ফসলকে বিবেকবুদ্ধির ঘরে তোলার জন্য অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। কুরআনের আয়াতগুলো মানুষের বোঝার জন্য এসেছে, এগুলো কোনো শ্লোক বা মন্ত্র নয়। কিন্তু যদি মানুষ তার মুক্তবুদ্ধি প্রয়োগ করে ভুল পথে চলে যায় এবং অবশেষে তার ধর্মকে ত্যাগ করে বসে, তাহলে কী হবে? ইসলাম সহনশীলতার এই পরীক্ষাও অতি সহজেই উত্তীর্ণ হয়ে যায়। যদিও বাস্তবে ধর্মত্যাগীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনার নজির কেবল মধ্যযুগেই নয়, বিংশ শতকের সুদানেও রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটার কারণ উপলব্ধিগত ভ্রান্তি। তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজের ধর্মকে ত্যাগ করে যাওয়ার (রিদ্দাহ) সাথে নিজ ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং এর বিধিবিধান ও ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার বিধিবিধানের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছেন মাত্র, যেটা স্বভাবতই বর্জনীয়। তবে এগুলোর মধ্যেও আমরা যুক্তির বাণীকেই উচ্চকিত হতে দেখেছি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ত্বাহা মুহাম্মদ ত্বাহা-এর মৃত্যুদণ্ডাদেশকে মুহাম্মদ আসাদ এবং ফাতহি ওসমানের মতো ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ অনৈসলামিক বলে ঘোষণা করেছিলেন।
এটি এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যে, সূরা বাকারাহ, (২)-এর মৌলিক সহনশীলতার নির্দেশ সম্বলিত আয়াতটি (২৫৬) নাজিল হয়েছিল মুসলমানদের সাথে বহির্বিশ্ব তথা অন্যান্য গ্রন্থধারী ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর দ্বিপক্ষীয় বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে। এ কারণে বর্তমান দিনের তরুণ মুসলমানরা স্বধর্মাবলম্বীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে অন্য একটি মূলনীতিকে অনুসরণ করেন যেটা কুরআনে কমপক্ষে আটবার বিবৃত হয়েছে। সেই অনুসারে, একজন বিশ্বাসীকে চেনার সহজতম উপায় হচ্ছে তার আচরণ, অর্থাৎ সে ভালো কাজের নির্দেশ দেবে (আল আমরু বি আল মারুফ) এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে (আন নহি আনিল মুনকার)। হাদিস শরিফের নির্দেশ মোতাবেক একজন মুসলমানকে এটা করতে হবে প্রথমত, নিজের হাত দিয়ে, এটা সম্ভব না হলে নিজের ভাষা দিয়ে এবং এটাও যদি সম্ভবপর না হয় তাহলে অন্ততপক্ষে নিজের অন্তর দিয়ে। উপরোক্ত নির্দেশটিকে যদি তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে নিয়ে সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে একজন বা একদল মুসলমানের পক্ষে বিভ্রান্তিবশত নিজেরদের নৈতিকতার মুরব্বি, বা শরিয়তের রক্ষক হিসেবে কল্পনা করে যুগপৎ অভিযোগকারী, তদন্তকারী ও শাস্তি প্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। এ ধরনের কাজ তো দূরের কথা, যারা এ ধরনের ধারণা পোষণ করেন, তারা ইসলামের নিম্নলিখিত সাতটি মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করেন?
১. আল কুরআন অতীতের রাজতান্ত্রিক শাসনের পরিবর্তে একটি জনগণের রাষ্ট্র ও (একজন আমিরের নেতৃত্বাধীন) সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এখান থেকেই আসছে ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা। দেশে যখন একটি (ইসলামী) সরকার প্রতিষ্ঠিত আছে, তখন যেমনি সাধারণ তেমনি ইসলামী নীতিবোধ অনুযায়ীও ক্ষমতার প্রয়োগ নিতান্তই রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার। যতক্ষণ পর্যন্ত মাদকদ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং রোধকরণের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, ততক্ষণ সাধারণ মুসলমানের পক্ষে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার প্রচেষ্টা রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ মাত্র। এ ধরনের কার্যকলাপ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের নৈতিক ভিত্তি বিনষ্ট করে।
২. ধর্মীয় ব্যাপারে জবরদস্তি মোনাফেকির জন্ম দেয়, যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা চরমভাবে অপছন্দ করেন।
৩. নৈতিকতার ব্যাপারে যেহেতু ব্যক্তি বিবেকের অভ্যন্তরস্থ একটি প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল যাকে, সেহেতু নৈতিক উৎকর্ষতা জোর করে আরোপ করা সম্ভব নয়। নবী করিম সা: বলেছেন, ‘অকপটতাই ধর্ম’।
৪. আমি আগেই দেখিয়েছি যে, ধর্ম ত্যাগ করে যাওয়ার মতো গুরুতর অপরাধের জন্যও কুরআন জাগতিক শাস্তির বিধান মঞ্জুর করে না। তাহলে অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কুরআনের বিধান ছাড়া কিভাবে সাধারণ মানুষ আইন প্রয়োগকারী বা শাস্তি প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে?
৫. কুরআনে যেসব কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তার জন্য কোনো ‘গণশাস্তির’ (ঝবপঁষধৎ ঢ়ঁহরংযসবহঃ) বিধান রাখা হয়নি (বরাবরই এটি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং এ ব্যাপারে অত্যুৎসাহী ব্যক্তিদের তৎপরতার কোনো অবকাশ নেই।
৬. ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে উদারনৈতিক রাষ্ট্র। একমাত্র একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রই সামগ্রিকভাবে সাধারণ ও ব্যক্তিগত নৈতিকতাধর্মী আইন প্রয়োগ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
৭. আল্লাহ তায়ালা যেখানে মুসলমানদের অমুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক মর্যাদা ও বিবেকের স্বাধীনতা (২ : ২৫৬) রক্ষা করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সেখানে সাক্ষাৎ মুসলমানেরা কিভাবে স্ব-আরোপিত জবরদস্তির শিকারে পরিণত হতে পারে।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত টানা যায় যে, সহনশীলতার যে নির্দেশ কুরআন দিচ্ছে, তা যুগপৎ মুসলিম এবং অমুসলিম উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রত্যেককেই মেনে চলতে হবে যে, যে ক্ষেত্রে যেটি সঠিক এবং ন্যায়, সেটিকে তার নিজস্ব পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নিজের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে, নিজের কারখানার ব্যবস্থাপক হিসেবে, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই নিজ আইনগত আওতার বাইরে গিয়ে নয়। তা না হলে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় চেতনার ‘বিভ্রান্ত সংশ্লেষণ’-এর ফলে একটি ফ্যাসিস্ট ইসলামী রাষ্ট্র জন্ম নিতে পারে। আল্লাহ আমাদের এই আজাব থেকে রক্ষা করুন। এমন রাষ্ট্র নিজেকে ‘ধর্মরাজ্য’ বা যাই বলে আখ্যায়িত করুক না কেন।
ভাষান্তর : মঈন বিন নাসির

 


আরো সংবাদ