২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ইসলামের দৃষ্টিতে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’

-

শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইসিএমএইচ) নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র (স্ক্যানো) এবং নবজাতক আইসিইউয়ে (এনআইসিইউ) উদ্যোগে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকে’র মাধ্যমে সেচ্চায় প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ সংগ্রহ প্রক্রিয়া চলছে। যা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথাও চলছে। ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক সঠিক মান নিরূপণে এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন Ñ এস এম আরিফুল কাদের
মুফতি শাহ্ আবদুল হালিম হুসাইনী
পিএইচডি ফেলো, আল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
প্রশ্ন : ইসলাম ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ সমর্থন করে কি?
উত্তর : ‘হিউম্যান মিল্ক’ এর মূল কনসেপ্ট ইসলামে নাজায়েজ নয়। বরং ইসলামে এটিকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু ‘ব্যাংক’ করায় ওলামায়ে কেরাম এটিতে ফেতনার আশঙ্কা থাকতে পারে বলে এটিকে হারাম ফতোয়া দিয়েছেন। ফেতনাটি হলোÑ যে শিশুরা এই ব্যাংক থেকে দুধ পান করবে এবং যে মায়েরা দুধ প্রদান করবেন, তাদের মধ্যে দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা স্থাপিত হবে। ফলে অজ্ঞতানুসারে যদি উভয়ের পরিবারের মধ্যে বিয়েশাদি হয়, তাহলে তা হারাম হবে। যা কুরআন, হাদিস ও মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন-১৯৩৭ এর সম্পূর্ণ বিরোধী। কুরআনে পাকে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে... তোমাদের সেসব মাতাকে, যারা তোমাদের দুধপান করিয়েছেন, তোমাদের দুধবোনকেও...’ (সূরা নিসা : ২৩)। হাদিসের ভাষায়, ‘দুধবোনকে বিয়ে করা সম্পূর্ণ হারাম ও নিষেধ। বংশীয় সম্পর্কে সহোদর বোনের মেয়েকে বিয়ে করা যেমন হারাম, দুধবোনের মেয়েকে বিয়ে করাও তেমনি হারাম’ (সহিহ বোখারি, হাদিস নং : ২৬৪৫)। এমনকি ওআইসির আল মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী আদ দাউলি ১৯৮৫ এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ফিকহ বোর্ড আল মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী জিদ্দা-২০০৬ সর্বসম্মতিক্রমে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংককে’ হারাম ফতোয়া দিয়েছে।
প্রশ্ন : ‘ব্যাংক’ করে অসহায় শিশুদের দিকে তাকিয়ে হালালের কোনো পথ বের করা যায় না?
উত্তর : ‘মিল্ক ব্যাংক’ জায়েজ হওয়ার জন্য দু’টি দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। (ক) হানাফি মাজহাবের অন্যতম ফকিহ ইমাম কারখি রহ. বলেন, দুগ্ধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সাব্যস্তের জন্য শর্ত হলো শিশুকে সরাসরি মায়ের স্তন থেকে দুধ পান করানো জরুরি। মায়ের স্তন থেকে আলাদভাবে দুধ পান করালে দুগ্ধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সাব্যস্ত হয় না। যদিও সূত্রটি দুর্বল। আল্লামা ইবনে হাযম রহ.ও এই মত পোষণ করেন। (আল মুহাল্লা দশম খণ্ড পৃষ্ঠা-৭)। (খ) কতটুকু দুধ পান করালে দুগ্ধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সম্পর্ক স্থাপন হবে, তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আজম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক রহ.-এর মত, সামান্য দুধ পান করলেই দুগ্ধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়। পরিমাণ কোনো ধর্তব্য নয়। পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ি ও আহমদ রহ. বলেন, নির্দিষ্ট পরিমাণে দুধপানে সাব্যস্ত হবে। পরিমাণ হলোÑ পাঁচবারের বেশি ভিন্ন ভিন্নভাবে পরিতৃপ্তসহকারে দুধ পান করতে হবে’ (ফতহুল বারি নবম খণ্ড পৃষ্ঠা-১৪৭)। তাঁরা আম্মাজান আয়েশা রা.-এর হাদিস দলিল হিসেবে পেশ করেন। আম্মাজান আয়েশা রা: বলেন, ১০বার দুধ চুষলে হারাম হওয়া সাব্যস্ত হয়Ñ এ কথা কুরআনে পাকে নাজিল হয়েছিল। পরে এ হুকুম মানসুখ হয়ে পাঁচবার চুষলে হারাম হওয়া সাব্যস্ত হওয়ার হুকুম হয়েছিল। এমতাবস্থায় বিশ্বনবী সা:-এর ইন্তেকাল হয়। যার কারণে এটা (পাঁচবার) কুরআনের অংশ হিসেবে তিলাওয়াত করা হতো’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-৩৪৬১)। এই হাদিসের পরিপ্রেক্ষিতে ড. ইউসুফ আল কারজাভিও জায়েজের পক্ষে মত দিয়েছেন।
প্রশ্ন : বিষয়টি যদি হারাম হতো, তাহলে ইরান, ইরাক, কুয়েত, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরে কিভাবে প্রচলিত আছে? বিষয়টি যদি খুলে বলতেন?
উত্তর : যদি মায়ের দুধ পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং দুধ দানকারী ও পানকারী উভয়ের তথ্য সংরক্ষণ করে উভয় পরিবার বিষয়টি জ্ঞাত থাকে, তাহলে সম্ভব হতে পারে। যদিও বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। শরিয়তের বিষয়টি মাথায় রেখে ওলামায়ে কেরামদের একটি পর্যবেক্ষণ বোর্ড রেখে এ কাজটি করা আবশ্যক। যদি কয়েকটি ইসলামী রাষ্ট্রে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ চালু থাকে। দেখতে হবে তারা কিভাবে ব্যবস্থাপনা করছে? বাংলাদেশের ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের’ কিছু নিয়মনীতি আছে। সেসব নিয়মনীতি যদি উল্লিখিত ইসলামী রাষ্ট্রের মতো এবং শরিয়ত হয়, তাহলে ওলামায়ে কেরাম এর সঠিক পদ্ধতি বিবেচনা করবেন।
প্রশ্ন : এ পদ্ধতিটি কখন ও কোথা থেকে চালু হয়েছে?
উত্তর : সর্বপ্রথম ১৯০৯ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ইউরোপ-আমেরিকাসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে শুরু হয়। মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম কুয়েতে শুরু হয়।
মুফতি শাঈখ মুহাম্মদ উসমান গনী
সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
প্রশ্ন : ইসলাম তো মানবতা কল্যাণের ধর্ম। স্বাভাবিকভাবে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ তো শিশুদের কল্যাণের জন্যই। কিন্তু এর পক্ষে-বিপক্ষে কথা চলছে। আপনার মত কী?
উত্তর : হ্যাঁ, স্বাভাবিকভাবে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ শিশুদের কল্যাণের জন্য। শিশুদের কল্যাণের স্বার্থেই গঠন করা হয়েছে। ওলামায়ে কেরাম এর পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু এ পদ্ধতিটা তখনই জায়েজ হবে, যখন সামাজিক উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট নারী নির্দিষ্ট শিশুকে দুধ পান করান এবং তা সামাজিকভাবে জানাশোনা থাকে ও পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে দুধ-রক্তের হারাম সম্পর্ক (মাহরাম) সুরক্ষিত রাখা যায়। দুধমাতা যিনি শিশুকে দুগ্ধ দিতে চান ও দুগ্ধপোষ্য শিশু যার দুধ পান করার প্রয়োজন তাদের মাঝে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বা তথ্য আদান-প্রদানে সহযোগিতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক। সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা করা সম্ভব এবং সহজতর। এর মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়বে ও নিরাপত্তা জোরদার হবে।
প্রশ্ন : ইসলামের দৃষ্টিতে মায়ের বুকের দুধ চেপে বের করার কোনো বিধিনিষেধ আছে? বিজ্ঞান কী বলে?
উত্তর : ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম। তাই সহজাত বিষয়গুলো স্বাভাবিক অবস্থায় স্থিত রাখাই ইসলামের বিধান। প্রসূতি মায়ের স্তন থেকে চেপে বা কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে দুগ্ধ নিষ্কাশন করা স্বাভাবিক প্রয়োজনে নয়। তাই বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হওয়া ছাড়া এটি অনুমোদিত নয়। মনে রাখতে হবে মানুষের স্রষ্টা, খালেক ও মালেক একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। মানুষ নিজে তার নিজের দেহের বা দেহের কোনো অংশবিশেষের মালিক নয়। সুতরাং মানুষ তার নিজের শরীরের কোনো অঙ্গ বা অংশকে নিজের বুঝ বিবেচনা বা আপন বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা আল্লাহর বিধানের বিপরীতে ব্যবহার বা প্রয়োগ করার অধিকার রাখে না। বিজ্ঞান প্রকৃতিরই অংশ মাত্র। প্রাকৃতিক নিয়মের অনুসরণই প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান অনুশীলন। এর ব্যতিক্রম সভ্যতা ধ্বংসের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন : এ পদ্ধতির দ্বারা কি শিশু মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব?
উত্তর : প্রকৃতিবিরুদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণে সাময়িক কল্যাণ দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে অকল্যাণ বয়ে আনবে। জীবন আল্লাহর দান, মরণ আল্লাহর অমোঘ বিধান। ইসলামী আকিদা বা দর্শনে ঈমান বা বিশ্বাসের ৭৭টি শাখার প্রধান মৌলিক সাতটি বিষয়ের অন্যতম হলোÑ ‘তাকদির’ বিশ্বাস করা। যা কুরআন-হাদিসের আলোকে ঈমানে মুফাসসালে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং মৃত্যু হার কমানো নয় বরং শিশুদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার এটি একটি প্রক্রিয়া মাত্র। তাই কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জায়েজের পদ্ধতি গ্রহণ করলে আশা করা যায় অপুষ্টিতে শিশু রোগাক্রান্ত না হয়ে বেঁচে থাকতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আলেম, লেখক


আরো সংবাদ