১৮ নভেম্বর ২০১৯

বিসিএস উত্তীর্ণ হয়েও ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ নিয়োগবঞ্চিত ২২৩ জন!

বিসিএস উত্তীর্ণ হয়েও ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ নিয়োগবঞ্চিত ২২৩ জন! - ছবি : নয়া দিগন্ত

টানা তিন মেয়াদে বর্তমান সরকারের আমলে নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সরকারের তিন মেয়াদে এখন পর্যন্ত (২৮তম থেকে ৪০তম) ১৩টি বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গড়ে প্রায় প্রতি বছরই একটি করে বিসিএস পরীক্ষা হচ্ছে এবং নিয়মিতই নিয়োগ পাচ্ছেন উত্তীর্ণরা বা নির্বাচিতরা, যা অতীতে হয়নি। তবে, দেশের সবচেয়ে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা- বিসিএসের প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক- এই তিন ধাপ অত্যন্ত যোগ্যতর হিসেবে এবং সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আপত্তি থাকায় নিয়োগ পেতে ব্যর্থ হয়েছেন এই মেধাবী-উত্তীর্ণদের একটি অংশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০টি বিসিএস-এ চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে ২৩০ জন নিয়োগ পাননি। যোগ্যতর হয়ে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলেও তারা শুধুমাত্র ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ নিয়োগ পাচ্ছেন না বলে বঞ্চিতদের অভিযোগ। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নিয়োগবঞ্চিতদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, প্রার্থী বা প্রার্থীদের নিকটাত্মীয়রা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক তাদের ব্যাপারে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে (২০০৯-২০১৪) ২৮ থেকে ৩৪তম বিসিএস পর্যন্ত ২০৩ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। পুনঃতদন্তে অনাপত্তি পাওয়ায় তাদের মধ্যে ১৪৫ জনকে ইতোমধ্যে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ৩৫ বিসিএস-এ ৩২ জন, ৩৬ বিসিএস-এ ৭২ জন এবং ৩৭ বিসিএস-এ ৬১ জন নিয়োগবঞ্চিত রয়েছেন। ৩৬ বিসিএস-এ ১০২ জনের ব্যাপারে প্রথমে আপত্তি ছিল। এরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর বরাবর মানবিক আবেদন করেন ৪ নভেম্বর ’১৮। তখন পুনঃতদন্ত ছাড়াই ডিসেম্বর ’১৮-তে তাদের মধ্য থেকে ৩০ জনের গেজেট প্রকাশ করে নিয়োগ দেয়া হয়। অপর ৭২ জন এখনও ঝুলে আছেন। তাদের ব্যাপারে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আপত্তি থাকায় এখনো নিয়োগ পাননি। নিয়োগের জন্য তারা এখনো প্রতীক্ষায় রয়েছেন এবং মন্ত্রী-এমপির কাছে ধরনাও দিচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২৮ থেকে ৩৭ বিসিএস পর্যন্ত মোট ২২৩ জন বিসিএসের প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক- এই তিন ধাপে যোগ্যতর হিসেবে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আপত্তি থাকায় নিয়োগ পাচ্ছেন না।

বর্তমান সরকারের লাগাতার তিন মেয়াদে দু’টি বিশেষ বিসিএস (৩২ ও ৩৯) অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৩২ বিসিএস শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য এবং এদের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। অপরটি ৩৯ বিসিএস শুধুমাত্র ডাক্তারদের জন্য। এদের নিয়োগ এখনো শুরু হয়নি। তবে, ভাইভা পর্যন্ত শেষ হয়েছে। এখন নিয়োগের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্য যাচাই চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিএসসি বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর শুরু হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গেজেট প্রকাশের পালা। মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে ‘পুলিশ যাচাইকরণ’ করে। এই যাচাইকরণের কাজটি সাধারণত করে থাকে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। তবে গত কয়েক বছর অন্য গোয়েন্দা সংস্থা দিয়েও কাজটি করানো হয়েছে।

পিএসসি ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন প্রার্থীর প্রাক্-যাচাই ফর্মে দেয়া ১৬ ধরনের তথ্য যাচাই করা হয়। শিক্ষার্থীরা কোথায় পড়া-শুনা করেছেন, সর্বশেষ পাঁচ বছর কোথায় থেকেছেন এবং রকম সাধারণ তথ্যের পাশাপাশি তিনি কোনো ফৌজদারি বা অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতার, অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হয়েছেন কি না, এসব তথ্য যাচাই করা হয়। এসব যাচাই-বাছাই শেষ করে বিশেষ শাখার পুলিশ সুপার ও ডিআইজি মর্যাদার একজন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করে প্রতিবেদন পাঠান। এর বাইরে অন্য কোনো তথ্য যাচাই করার কথা না থাকলেও ৩৫ বিসিএসের পর থেকে একাধিক প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা প্রার্থীর পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ও যাচাই করছেন বলে জানা গেছে। এখানেই উত্তীর্ণ মেধাবীরা আটকে যাচ্ছেন। উত্তীর্ণ প্রার্থীর স্বজনেরা ছাড়াও নিকটাত্মীয়রাও যদি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থেকে থাকেন, তাদেরও আটকে দেয়া হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ রকম ‘রাজনৈতিক বিবেচনার’ প্রতিবেদনের কারণে গত কয়েকটি বিসিএসে শতাধিক প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, পিএসসির সুপারিশকৃতদের নিয়োগ দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। তবে, সুপারিশকৃত কারো বিরুদ্ধে যদি কোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বা অতীতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকে তাদের নিয়োগ না দিতে পারে। তবে, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে একমত না হওয়াদের বঞ্চিত বা নিয়োগ না দেয়া, একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের শামিল। নিয়োগে না দেয়া সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ লালনের অভিযোগ থাকলেও নিয়োগবঞ্চিত করার অধিকার নেই সরকারে। তবে তাকে ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বা নীতিনির্ধারণী কাজে সম্পৃক্ত না করা যেতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৩৫, ৩৬, ৩৭ বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারসহ বেশ কয়েকটি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তদের সাথে কথা বলে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ আমাদের স্বপ্নই ছিল বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হবো। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে, যখন নিয়োগ পাইনি, তখন সব দিক থেকেই হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছি। পরিবার, সমাজ, বন্ধুমহল সবার কাছেই নিজেদের ছোট মনে হচ্ছে। আমাদের ব্যাচ বা ইয়ার ম্যাটরা যখন আরাম আয়েশ করছে, তখন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য টিউশন বা ব্যাচ পড়িয়ে বা কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। এর চাইতে লজ্জার ও হতাশার আর কী হতে পারে ?

এ ব্যাপারে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, কারো বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না থাকে, তা হলে তাকে বা তাদের নিয়োগ না দেয়ার যৌক্তিকতা নেই। তার বা তাদের পরিবারের কেউ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলে উত্তীর্ণ প্রার্থীকে নিয়োগ না দেয়া সঠিক নয়।
বঞ্চিতদের ব্যাপারে জানতে চাইলে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল সচিবালয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, যাদের এখনো নিয়োগ হয়নি, তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুনঃতদন্ত করা হচ্ছে। অল্পদিনের মধ্যে এবং খুব দ্রুত আরো কিছু নিয়োগ দেয়া জন্য গেজেট করা হবে।

এ দিকে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ৩৫, ৩৬ ও ৩৭ বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিতদের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এ তিনটি বিসিএসে যাদের ব্যাপারে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পুনঃতদন্তের পর আরো বেশ কিছু বঞ্চিতরা নিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন। এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নব-নিয়োগ শাখার কোনো কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অপর দিকে, পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ৩৮ বিসিএসের ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা চলছে এখন। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ভাইভা চলবে। ৪০ বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে। এ মাসে (নভেম্বরে ’১৯) মাসে ৪১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সূত্রে বলা হয়েছে। 


আরো সংবাদ