২৩ জানুয়ারি ২০২০

এক পরিবারে সাত প্রতিবন্ধী

যশোরের চৌগাছায় পৌর শহরে একই পরিবারে সাত প্রতিবন্ধী নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলে সরলা বালার। শহরের ঋষি পাড়ার বুদ্ধি ও শারীরিক সাত প্রতিবন্ধীকে নিয়ে সরলা দারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তার অভিযোগ চিকিৎসকের ভুলেই তার পরিবারে আজ সাত প্রতিবন্ধী। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভুলের মাশুল তাকে দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকের ভুলেই তার সন্তানরা প্রতিবন্ধী হয়েছে।

জানা যায়, সরলা বালা স্বামী নিরঞ্জন ঋষি ও সন্তানদেরকে নিয়ে পৌর শহরের ৬নং ওয়ার্ডের ঋষিপাড়ায় বসবাস করেন। শহরের যশোর মেইন বাসস্ট্যান্ডের অদূরেই একখন্ড জমির উপর স্বামী-সন্তানদের নিয়ে কাঁচা-পাকা ঝুপড়িতে বসবাস তার। হত দরিদ্র সরলার জীবন চলে বকরি ছাগল প্রজনেনর সামান্য অর্থ দিয়ে।

এক সময় বেশ কয়েকটি পাঠা থাকলেও বর্তমানে মাত্র দুটি পাঠা আছে তার। স্বামী নিরঞ্জন করিমন চালাতেন। স্ট্রোকের পর প্যারালাইজড বছর তিনেক হলো। কোনভাবে চলতে-ফিরতে পারেন। সরলার চার ছেলের মধ্যে ছোট তিন ছেলে মহন (১৯) এবং জমজ মিলন ও নয়ন (১৫) তিন জনই শারীরিক এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পাঁচ মেয়ের মধ্যে বড় অম্বালিকা (৩৫) শিশুবেলায় হামজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তিহীন। সেজে মেয়ের দুই ছেলে বিদ্যুৎ (১৪) ও বিধান (১২) বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদেরও নেই থাকার কোনো জায়গা। এক বাড়ির মধ্যেই থাকে তারা। উপজেলা সমাজসেবা অফিস এসব প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধী আইডি কার্ড দিয়েছেন। তবে সে কার্ডের কোন অনুদান তারা পায়না।

 সরেজমিনে কথা বলতে সরলার বাড়ি গেলে প্রথমে তিনি কথা বলতেই চাচ্ছিলেন না। ক্ষোভের সাথে বলছিলেন বাপু কত লোক আসে। বলে এ দেব, ও দেব। শুনে চলে যায়। কিছুই তো পাইনে। তোমাদের সাথে কথা বলতে আমার যে সময় নষ্ট হবে, সে সময়ে কাজ করতে পারবো। কথার ছলে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। স্বাভাবিক হয়ে আসেন তিনি। বলেন, শুনবা ? আমার এই কাহিনী ? তুমরা বাপু শিক্ষিত মানুষ। আমরা তো হত-দরিদ্র। আমার মাথা গোজার মত এইটুকুই আছে।

আমার সাত সন্তানের মধ্যে একটি সন্তান মারা যায়। সে সময় হাসপাতালের টিএইচও ছিলেন ডা. অরুন কুমার বিশ্বাস। ৯৮ সালের শেষ দিকে আমার পেট কেটে লাইগেশন (অপারেশন) করা হয়। কিন্তু তার পরও ৯৯ সালে আমার পেটে সন্তান আসে। আমি হাসপাতালে গেলে তারা বলেন সন্তান আসেনি। তোমার পেটে কিছু হয়েছে। ২০০০ সালের ৫ জুন আমার ছেলে মহনের (বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী) জন্ম হয়। ২০০৪ সালে ১ জানুয়ারি জমজ ছেলে মিলন ও নয়নের (বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী) জন্ম হয়। ওদের জন্মের পর আমাকে হাসপাতালে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা দেয়া হয়। বলা হয় এনিয়ে তুমি কোন ঝামেলা করো না। আমি গরীব মানুষ। আমি কিই বা করবো ?।

তিনি বলেন, বড় ছেলে মদন তার স্ত্রী নিয়ে আলাদা। করিমন চালিয়ে কোন রকম নিজের সংসার চালায়। বড় মেয়ে অম্বালিকা আমার ঘাড়ে। অন্য মেয়েদের বিয়ে দিছি। তাদের মত তারা কোনরকমে কাজকাম করে চলে। সেজো মেয়ের দুইছেলে। তারাও বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। ওদের কোন ভিটা জমি নেই। এই দেখ আমার ইকেনেই থাকে। ছোট ছেলে দুটো (মিলন ও নয়ন) ওই দেখ বইয়ের প্যাকেট নিয়ে স্কুলে যায়। পড়া তো পারে না। শুধুই যায়। বললেন, বড়মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। আর স্বামীর একটা কার্ডকরে দিয়েছে কমিশনার।

এ ব্যাপারে চৌগাছা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আতিয়ার রহমান বলেন, ওই পরিবারের বড় মেয়ে এবং তার পিতাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড কম হওয়ায় তাদের সবার ভাতা দেওয়া যায়নি। সরকারি ভাবে শতভাগ প্রতিবন্ধীদের ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা হলেই কেবল সবাইকে দেওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে চৌগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নির্মল কান্তি কর্মকার বলেন,বর্তমানে কোন পরিবারে শতভাগ প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা নেই। ২০১৬ সালে একটি এনজিওর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের পরিচয়পত্র দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রতিশ্রুতি আছে দেশের শতভাগ প্রতিবন্ধীদের ভাতার আওতায় আনা হবে। সেটি হলেই কেবল ওই পরিবারের সবাইকে ভাতা দেয়া সম্ভব হবে।


আরো সংবাদ