২৩ জানুয়ারি ২০২০

মৃত্যুর আগেই বীরঙ্গনার স্বীকৃতি চান নুরজাহান বেগম

মৃত্যুর আগেই বীরঙ্গনার স্বীকৃতি চান নুরজাহান বেগম - ছবি : নয়া দিগন্ত

স্মৃতিময় বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ৪৮ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে বীরঙ্গনা নুরজাহান বেগম। সরকারী জমি পেলেও আইনী জটিলতায় দখল পায়নি’ বীরঙ্গনা নুরজাহান বেগম। মৃত্যুর আগেই স্বীকৃতি পেয়ে মরতে চান।

বীরঙ্গনা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘১৯৭১ সালে বয়স ছিল ১৩। কিশোরী হলেও আমাকে রেহাই দেয়নি নরপশু রাজাকাররা। মা ও ছোট ভাইকে মারপিট করে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তারা। আমাকে তারা তুলে দিয়েছিন অবাঙ্গালী বিহারীদের হাতে। একটি বন্ধ ঘরে আটকে রাখা হয় আমাকে। রাত হতেই নরপশুরা হায়নার মত আমার উপর হামলে পড়ে। চিৎকার করে কাঁদলেও বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ। দিনে এক বেলা অথবা দুই বেলা খাবার দিতো তারা। প্রায় দুই মাস অসহায় অবস্থায় অমানবিক নির্যাতন সইতে হয়েছে আমাকে। আমার মত আরো ১২/১৩ জন মহিলাকে সে সময় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। তার মধ্যেই দুই জন মারাও যায়। যারা বেঁচে ছিলাম তারা প্রতিনিয়ত ডাকতাম আল্লাহকে। বলতাম এই হয়নাদের হাত থেকে রক্ষা কর তুমি। আল্লাহ হয়তো আমার কথা শুনেছেন, দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে হায়নাদের পরাজিত করে এবং আমাকে উদ্ধার করে।’

নুরজাহান বেগমের স্বামীর নাম মোকাররম হোসেন। বাড়ী রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। 

নুরজাহান বেগম আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে উদ্ধার করে বাড়ীতে পৌঁছে দেবার পর শুরু হয় আমার আরেক জীবন যুদ্ধ। টানা এক মাস চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে। সুস্থ হওয়ার পর বুঝতে পারি আমি যেন চিড়িয়াখানার কোন যন্তু। প্রতিবেশিরা সামনে কিছু না বললেও লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখতো। মাঝে মধ্যেই বলতো কূটকথা। মনের আবেগে জীবন ত্যাগের নানা রকম কথা চিন্তা করলেও আমার বৃদ্ধ মা মানু বিবির মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে যেতাম সে সব ভাবনা। চিন্তা শুধু আমিই করতাম না। আমাকে নিয়ে মা এবং ছোট ভাইও করতো সব চিন্তা। নরপশুদের হাত থেকে জীবনে বেঁচে থাকা এই আমাকে কে করবে বিয়ে। ১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে আমাকে বিয়ের প্রস্তব নিয়ে আসে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা চৌগাছি গ্রামের মনির উদ্দিন মোল্লার ছেলে মোকাররম মোল্লা। বিয়েও হয় আমাদের। তবে স্বামীর বাড়ী থেকে মেনে নেয়া হয়নি আমাকে। যে কারণে ওই বাড়ীতে যাওয়া হয়নি আমার। একই সাথে আমার স্বামীকে ছেড়ে আসতে হয়েছে তার বাবার বাড়ী।

তিনি আরো বলেন, মা মারা গেছে। বর্তমানে আমি ভাইয়ের দেয়া ১২ শতাংশ জমিতে কোন রকমে ঘর করে বসবাস করছি। আমার ১ ছেলে, ৪ মেয়ে। অসুস্থতা পেয়ে বসেছে আমাকে। ৪ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, আর ছেলেকে কাজের সন্ধানে ভাইদের সহযোগীতায় বিদেশ পাঠিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, দেশের জন্য আমার সবকিছু দিয়েছি। শুনেছি ও পেয়েছি মানুষের তাচ্ছিল্য। এতে আমার কোন দুঃখ নেই। আমি সব সময় দেশের মঙ্গল কামনা করি। দেশ এগিয়ে যাক এটাই আমার কমনা।
নুরজাহান বেগম বলেন, সরকারী ১০ শতাংশ খাস জমি বন্দোবস্ত দিলেও আইনী জটিলতার কারণে তার দখল বুঝে পাচ্ছি না। ওই জমির দখল নিতে গেলে প্রভাবশালীরা নানাভাবে হুমকি দিচ্ছিল। এখন জমির আশাও ছেড়ে দিয়েছি।

অনেক বড় মনের মানুষ নুরজাহানের স্বামী মোকাররম হোসেন। কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, বয়সে কিশোর হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাগুরার চৌগাছিতে আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি নানা রকম সহযোগীতা। তাই মুক্তিযোদ্ধা ও বীরঙ্গনাদের প্রতি ছিল আমার দুর্বলতা। নুরজাহানের বাড়ীর পাশে ছিল আমার এক চাচাতো বোনের বাড়ী। ১৯৭৩ সালে ওই চাচাতো বোনের বাড়ীতে বেড়াতে এসে দেখা হয়, মাগুরায় যুদ্ধ করা বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে। তাদের সাথে কয়েক দিন সময় কাটানোর পর। নুরজাহান সম্পর্কে আমি বিষদ জানতে পারি। তার উপর আমার মমতা সৃষ্টি হয়। আমি তাকে বিয়ে করি। তবে বিয়ের পর নানা জনের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে কূটকথা। তবে আমার বাবা মনিরুদ্দিন সেখ ও মা কালা বিবি’র এক মাত্র ছেলে সন্তান হলেও তারা আমাদের এই বিয়ে মেনে নেননি। কোন উপায় না দেখে শ্বশুরালয়েই বসবাস শুরু করি। সে সময় থেকেই আমি দর্জির কাজ করি। তবে আর্থিক দৈন্যতার কারণে বাজারে কোন দোকান নিতে পারিনি। বর্তমানে ওই বাড়ীতেই কোন রকমে চালিয়ে আসছি এ পেশা। ফলে সংসার চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে।

তিনি আরো বলেন, নরপশুরা নুরজাহানকে ধরে নিয়ে গেছে, করেছে অত্যাচার। এটিতো তার দোষ নয়। যারা এমনটি করেছে তাদের দোষ। আমি মানুষ। তাই মানুষত্ব বোধ থেকেই আমি নুজাহানের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি তাকে বিয়ে করে ঠকিটি। আমি মনে করি একটি অসহায় মেয়ের বেঁচে থাকার জন্য একটু অবলম্বন হয়েছি। তাছাড়া সে তো খুব ভাল মেয়ে। একজন ভাল মানুষকে ভাল বাসাইতো মানুষের প্রধান ধর্ম।

নুরজাহানের স্বামী  বলেন, দেশের কাছে আমাদের কোন চাওয়া নেই। আমি চাই আমাদের এই দেশটা সুন্দরভাবে চলুক। মানুষ ভাল থাকুক। সরকার সুন্দর ভাবে দেশটি পরিচালনা করুক।

নুরজাহানের ছোট ভাই কোবায়দুর রহমান কোবেদ সেখ বলেন, তিন বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। মা আর বোনই ছিল আমার সব। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছনের ঘরের মাটির ডোয়ায় আমি ‘জয় বাংলা’ লিখেছিলাম। আর এটিই ছিল আমার অপরাধ। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে রাজকাররা আমাদের বাড়ীতে হামলা চালায়। করে লুটপাট। আমার মা’কে রাইফেল দিয়ে তারা আঘাত করে। আর হাত বাঁধে আমার। সে সময় আমাদের চোখের সামনে তারা নুরজাহানকে তুলে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার ১২ দিন পর এলাকায় একটি গুলির শব্দ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজাকার ও রিফুজিরা আমাদের বেশ কয়েক জনকে আটক করে পার্শ্ববর্তী সোনাপুর বাজারের আজিজ মিয়ার রুটির দোকানে নিয়ে যায়। আমাকে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের জমির উদ্দিন মুন্সি ও বাবলু মাষ্টারকে জ্বলন্ত লাকড়ির মধ্যে ফেলে দেয়। আগুনে আমাদের তিন জনেরই শরীর যায় ঝলসে। সেই ঝলসে যাওয়া দাগ এখনো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ, খলিলুর রহমান, আব্দুল লতিফ, শহর আলীসহ তাদের সঙ্গীয়রা ১৭ ডিসেম্বর রাজবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যৌথভাবে জেলা শহরের বিহারী কলোনীতে (বর্তমান নিউকলোনী) অপারেশন চালায়। এ সময় তারা নুরজাহানকে উদ্ধার করে এবং আমাদের বাড়ীতে তাকে পৌঁছে দেয়। আমি ওই সব মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে চির ঋণি।

তিনি বলেন, আমার বোন অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে চলছে তাদের সংসার। আমি চাই এ বীরঙ্গনা যত দিন বেঁচে থাকবে, ততদিন যেন সে ভাল থাকতে পারে সে ব্যবস্থা অন্তত করবে জাতীর জনকের কন্যা শেখ হাসিনা।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, নুর জাহান বেগমের বিষয়ে আমি বিষদ শুনেছি। তাকে যাতে বীরঙ্গনার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তার কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে কিনা খোঁজখবর নিয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে।


আরো সংবাদ