১৯ জুলাই ২০১৯

ছাত্রদলের সঙ্কটে হিমশিম বিএনপির হাইকমান্ড

সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিক্ষুব্ধ ও পদপ্রত্যাশীরা
-

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি সঙ্কট নিরসনে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দফায় দফায় বৈঠক করেও সঙ্কটের চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন নেতা ইতিবাচক হলেও সার্চ কমিটির একটি পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সমাধানের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। দুই পক্ষের বিপরীতধর্মী দুই প্রস্তাবের কারণে কার্যত ছাত্রদলের বিদ্যমান সঙ্কটের সমাধান ঝুলে আছে। বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা জানান, তারা ইতিবাচকভাবে সন্তোষজনক সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছেন। বিক্ষুব্ধদের প্রস্তাবনা বিবেচনায় নিয়ে সঙ্কট নিরসনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্য দিকে কাউন্সিলের লক্ষ্যে গঠিত তিন কমিটিসহ প্রয়োজনে আরো একাধিক কমিটি গঠন করে সেগুলোতে ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সার্চ কমিটি। তবে কাউন্সিল সফলে সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার শর্তে বহিষ্কৃত ছাত্রনেতাদের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছে উভয় কমিটি। ফলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেই এখন এককভাবে এই সঙ্কটের সমাধান দিতে হবে। ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ ও কাউন্সিলে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী নেতারা সঙ্কট নিরসনে বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। সিদ্ধান্ত জানানোর পর তারা করণীয় নির্ধারণ করবেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি মানা না হলে ফের আন্দোলনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা। আগামীকাল শনিবার তারেক রহমানের সাথে স্কাইপে আবারো বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে সার্চ কমিটির। এর মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বহিষ্কৃতরা তো বিএনপির সহযোগী সংগঠনেরই (ছাত্রদল) নেতাকর্মী। আমরা দলের শৃঙ্খলার জন্য কাজ করছি। তাদের বিষয়টি দল ইতিবাচকভাবেই দেখছে। আমরা আমাদের কাজ করেছি। এখন সার্চ কমিটির নেতারা আলোচনার মাধ্যমে অচিরেই একটা সমাধান দিবে বলে আশা করি।
উল্লেখ্য, গত ৩ জুন ঈদুল ফিতরের একদিন আগে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বাতিলের পাশাপাশি পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। কাউন্সিলে প্রার্থী হতে ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী যেকোনো বছরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হওয়াসহ তিনটি শর্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এরপর ৯ জুন ছাত্রদলের কাউন্সিল সফলের লক্ষ্যে খায়রুল কবির খোকনকে আহ্বায়ক করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, ফজলুল হক মিলনকে প্রধান করে বাছাই কমিটি এবং শামসুজ্জামান দুদুকে আহ্বায়ক করে আপিল কমিটি গঠন করে বিএনপি। এমন প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনে শর্তের বিরোধিতা করে তা প্রত্যাহারের দাবিতে ১১ জুন বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে ছাত্রদলে বিলুপ্ত কমিটির সিনিয়র নেতারা। তাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সঙ্কট নিরসনে ওই দিনই সার্চ কমিটির নেতাদের দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। সার্চ কমিটির আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করলেও সঙ্কটের সুরাহা না হওয়ায় পুনরায় আন্দোলনে নামে বিক্ষুব্ধরা। আন্দোলন চলাকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ ছাত্রদলের অনেক সাবেক নেতাই বিক্ষুব্ধদের হাতে লাঞ্ছিত হন। একপর্যায়ে আন্দোলন ঠেকাতে ২২ জুন বিক্ষুব্ধ ১২ নেতাকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে ১৫ জুলাই কাউন্সিলের তারিখ রেখে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। কিন্তু বিক্ষুব্ধদের আন্দোলনের মুখে কাউন্সিলের লক্ষ্যে প্রার্থীদের মধ্যে ফরম বিতরণ কর্মসূচি করতেই পারেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
ছাত্রদলের উদ্ভূত সঙ্কট নিরসনে গত ২৯ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। পরে তাদের সাথে দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকেও যুক্ত করা হয়। এরপর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধদের পাশাপাশি সার্চ কমিটির নেতাদের সাথেও একাধিক বৈঠক করেন। আন্দোলনকারীদের সাথে বিএনপির দুই নেতার বৈঠকে সঙ্কট নিরসনে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে কাউন্সিল পর্যন্ত একটি সাংগঠনিক আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয় বিক্ষুব্ধরা। এ ক্ষেত্রে বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের মধ্যে যারা বিএনপির নির্বাহী কমিটিতে আছেন তাদের কমিটিতে রাখা যাবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিক্ষুব্ধদের সেই প্রস্তাবনা তারেক রহমানের কাছে পাঠিয়ে দেন। এমন অবস্থায় গত ৩ জুলাই নয়াপল্টনে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির কার্যালয়ে বিক্ষোভের সময় অপ্রীতিকর ঘটনাবলীর জন্য ক্ষমা চেয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করেন ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতাকর্মীরা।
জানা যায়, সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়ের সাথে বৈঠক করেছেন বিক্ষুব্ধরা। এর আগে গত মঙ্গলবার শাজাহানপুরে স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় বিক্ষুব্ধদের সাথে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন নেতার বৈঠক হয়। সেখানে বিক্ষুব্ধরা তাদের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রস্তাবে অটল থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। গত বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তারেক রহমান স্কাইপে যুক্ত হয়ে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং সার্চ কমিটির সাথে কথা বলেছেন তিনি।
ছাত্রদলের একাধিক বিক্ষুব্ধ নেতা জানান, সার্চ কমিটির নেতাদের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র তিন নেতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে ইতিবাচক ছিলেন তারা। তারপরও দল আগের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন তারা। তারা বলেন, একটি সাংগঠনিক আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি আমরা জানিয়েছি। তারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
জানতে চাইলে ছাত্রদলের কাউন্সিলের আপিল কমিটির প্রধান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বৈঠকে সব বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই সঙ্কটের সমাধান হবে। বিক্ষুব্ধদের সার্থ সংরক্ষণ করে সুষ্ঠু কাউন্সিল কিভাবে করা যায় তা নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে নতুন নেতা নির্বাচনে যেসব শর্ত বিএনপির হাইকমান্ড দিয়েছে সেগুলো ঠিক রেখেই ছাত্রদলের নতুন কাউন্সিল হবে বলে তিনি জোর দিয়ে বলেন।

 


আরো সংবাদ