২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঘুরে আসুন কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা

-

বর্ষা চলছে। হাওর যেন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সৌন্দর্যের বিপুল পসরা সাজিয়ে বসে আছে। বর্ষার হাওর এখন কূলহীন সাগর। চার দিকে বিশাল জলরাশি। এ জলরাশির বুকে বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর একেকটাকে ছোট দ্বীপের মতো লাগে। দূর থেকে মনে হয়, কচুরিপানা হয়ে যেন পানিতে ভাসছে গ্রামগুলো। হাওরজুড়ে গলা ডুবিয়ে থাকে হিজল গাছের সারি। এই সৌন্দর্য মন কাড়ে যে কারো। পানির নিচ থেকে জেগে ওঠা করচের বন, হাঁসের ডিমের মতো সাদা ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বরুণগাছ, কিংবা মিঠা পানিতে শুশুকের লাফ-ঝাঁপ দেখলে কার না মন আনন্দে ভরে ওঠে।
শুকনো মওসুমে হাওর মানে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি, ধূলিউড়া মেঠোপথ, রুপালি নদী। বর্ষায় এই রুপালি নদীগুলোই ফুঁসে ওঠে। দুই তীর ছাপিয়ে প্লাবিত করে ফসলি মাঠ। এই প্লøাবিত মাঠই বর্ষার হাওর।
প্রতি বর্ষাতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঘুরতে আসে এই হাওরে। হাওর অধ্যুষিত অন্যতম একটি জেলা কিশোরগঞ্জ।
কিশোরগঞ্জে বেশ কয়েকটি রুটে হাওরে যাওয়া যায়। তবে সহজ হলো জেলা শহর থেকে অটোরিকশায় করে চামড়াঘাট পৌঁছা। চামড়াঘাট মানেই হাওরের চৌকাঠে পা রাখা। এর পর ধনু নদী। নদীর পাড়ঘেঁষে বালিখলা হয়ে নির্মিত হচ্ছে হাওরে যাওয়ার উঁচু সড়ক। সড়কে দাঁড়িয়ে দেখা যায় শুশুকের লাফ-ঝাঁপ। চামড়াঘাট ও বালিখলা এলাকাটি করিমগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমানায় অবস্থিত।
কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীতে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটা বেড়িবাঁধ। নির্মিত হচ্ছে উপজেলাগুলোর সংযোগ সড়ক। এসব বেড়িবাঁধ বা সড়কে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে ৩০-৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গ্রাম চোখে পড়ে না। বাঁধ বা সড়কে দাঁড়িয়ে হাওর দেখা সাগর দেখার মতোই উপভোগ্য। এসব স্থানে বর্ষায় শত শত পর্যটক এসে ভিড় জমান।
হাওরে বর্ষা থাকে বছরের প্রায় ছয় মাস। পানি আসতে শুরু করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে। শেষ হয় আশ্বিন-কার্তিকে। এই পুরো সময়জুড়েই হাওরে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। তবে ঈদ-পার্বণ থাকলে ভিড় বেশি বাড়ে।
বেড়িবাঁধ ও উঁচু সড়ক ছাড়াও হাওরে পর্যটকদের দেখার মতো বেশ কিছু মনোরম জায়গা রয়েছে। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নের ‘দিল্লির আখড়া’এর মধ্যে অন্যতম। এখানে রয়েছে শত শত হিজলগাছ। চার শ’ বছরের পুরনো এই আখড়া সম্পর্কে সুন্দর একটি গল্প চালু আছে। এক সাধক নাকি এখানে এসেছিলেন ধ্যান করতে। তার ধ্যান ভাঙার জন্য কিছু দৈত্য তাকে নানাভাবে বিরক্ত করত। একদিন এই সাধক মহাবিরক্ত হয়ে তার দীক্ষাগুরুর মন্ত্রবলে এই দৈত্যগুলোকে হিজলগাছ বানিয়ে রাখেন। সাধুর বানিয়ে রাখা সেই হিজলগাছগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে। হিজলগাছের সারি তিন শ’ একরের পুরো আখড়া এলাকাজুড়েই! শত শত হিজলগাছ! দেখলে ধারণা হতেই পারে, একসময় এগুলো সত্যি সত্যিই দৈত্য ছিল! সারা বর্ষায় এগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
জায়গাটির নাম দিল্লির আখড়া কিভাবে হলো? সে আরেক গল্প। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের লোকজন নাকি একদিন ওই ধ্যানমগ্ন সাধকের পাশ দিয়ে নৌকার বহর নিয়ে নদীপথে যাচ্ছিলেন। এ সময় সোনার মোহরভর্তি একটি নৌকা পানিতে ডুবে যায়। নৌকার যাত্রীরা মোহর তোলার জন্য নদীপাড়ে আসে। ডুব দিয়ে তারা দু-একটি মোহর তুলেও আনে; কিন্তু সেই মোহরগুলোও চোখের ইশারায় পানিতে ফেলে দেন ওই সাধক। পরে নৌকার যাত্রীদের অনুরোধে তিনি সোনার মোহরগুলো মাছের ঝাঁকের মতো পানির উপর ভাসাতে থাকেন। মোহরগুলো তুলে নেন যাত্রীরা। এই ঘটনা শুনে সম্রাট জাহাঙ্গীর অভিভূত হন। পরে তিন শ’ একর জমি তাম্রলিপির মাধ্যমে সেই সাধুর আখড়ার নামে দান করে দেন। সেই থেকে এটি দিল্লির আখড়া।
এই বর্ষায় অন্য বছরের চেয়ে হাওরে পানি তুলনামূলকভাবে বেশি এসেছে। নৌকাভ্রমণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন অনেকে। কেউ আসছেন পরিবার-স্বজন নিয়ে। কেউবা আবার বন্ধুদের নিয়ে।
বর্ষা এলেই কিশোরগঞ্জের হাওরে ঢাকা থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসেন সাংবাদিক ও গীতিকার সোহেল অটল। এবারো ঘুরতে এসেছিলেন তিনি। সোহেল অটল বলেন, ‘টানা সাত বছর ধরে আমি হাওরে আসছি। বলা যায় কিশোরগঞ্জের হাওরের প্রেমে পড়ে গেছি আমি। দিল্লির আখড়ায় বেশ কয়েকবার গিয়েছি। এটি একটি অসাধারণ জায়গা। এবার আখড়ায় যেতে না পারলেও ইটনা, মিঠামইন, ও নিকলীর হাওরে ঘুরেছি। ট্রলারের ছাদে বসে হাওরের সূর্র্যাস্ত দেখা দারুণ একটি ব্যাপার।’
শ্রাবণ মাস এখন শেষপর্যায়ে। হাওরে এখনো টইটম্বুর পানি। ঈদের ছুটিতে একবার ঘুরে আসা যেতেই পারে কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে। ঘুরে আসতে পারেন দিল্লির আখড়া থেকেও। হিজলের বন ভেদ করে একবার আখড়ায় পৌঁছতে পারলেই দেখা যাবে সেই সাধুর স্মৃতি। আখড়ার নির্জনতায় আপনারও মনে হবে, সত্যি এটি ধ্যান করার মতো চমৎকার একটি স্থান বটে।
আখড়ায় রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদের থাকার ঘর। বর্তমানে আখড়ায় মোহন্ত নারায়ণ দাসসহ তিনজন বৈষ্ণব আছেন। এখানে আশ্রিত হয়ে আছে ৪০-৫০ জন শ্রমজীবী মানুষ। এর সবাই নিরামিষভোজী। থাকে একটি যৌথ পরিবারের মতো। রাতে এখানে দর্শনার্থীদের থাকারও ব্যবস্থা আছে। আখড়ার পাশে রয়েছে ঘের দেয়া দু’টি পুকুর। ইচ্ছে করলে পুকুরের ঘাটলায় বসে কাটিয়ে দেয়া যাবে একটা বিকেল।
যেভাবে যাবেন : কিশোরগঞ্জে বেশ কয়েকটি রুটে হাওরে যাওয়া যায়। তবে সহজ হলো সায়েদাবাদ বা গোলাপবাগ থেকে বাসে অথবা কমলাপুর থেকে ট্রেনে সরাসরি কিশোরগঞ্জ শহরে। স্টেশনে নেমে রিকশায় মিনিট দশেক। এর পর একরামপুর। ওখান থেকে অটোরিকশায় করে চামড়াঘাট। চামড়াঘাট থেকে সোজা নৌকায়। এর পর শুরু হবে ধুকপুক ধুকপুক। মানে ইঞ্জিনের শব্দ। এই শব্দের ওপরেই থাকতে হবে চব্বিশ ঘণ্টার মতো। প্রথমে বিরক্তিকর মনে হলেও পরে কানের সাথে মানিয়ে যাবে। নৌকায় উঠেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আগে কোথায় যাবেন। তবে প্রথমে মিঠামইনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দহলিজে একটু হাজিরা দিয়ে গেলেই ভালো। এর পর সোজা দিল্লির আখড়া। দিল্লির আখড়া পরিদর্শন শেষে পরের সময়টা কাটাতে পারেন একেবারেই পরিকল্পনা ছাড়া। সব কিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতি ও আবহাওয়ার ওপর। আপনি চাইলে দিনে দিনে হাওর ঘুরে জেলা শহরে ফিরতে পারবেন। তবে দিল্লির আখড়ায় গেলে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে বৃষ্টি না হলে ট্রলারের ছাদেই রাত কাটিয়ে দিতে পারেন। তা ছাড়া ট্রলারের ভেতরে ঘুমানোর ব্যবস্থা তো আছেই। ইচ্ছে করলে হাওর উপজেলাগুলোর ডাকবাংলোতেও রাত কাটানো যাবে। এরপর ভোরে ভাসমান তাঁবু নিয়ে ধুকপুক করতে করতে নৌকার নাক ঘুরিয়ে দিতে পারেন হাওর উপজেলা ইটনা, কিম্বা অষ্টগ্রামের দিকে।
হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো: মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার) নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমরাও চাই হাওরে পর্যটক বাড়–ক। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে থানাগুলোকে বলে দেয়া আছে। আমরা দর্শনার্থীদের সচেতন করি, তারা যেন নিরাপদ দূরত্বে থেকে ভ্রমণ করেন। যারা হাওরে ট্রলারে রাত কাটাতে চান তারা যেন সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করে থানার আশপাশ এলাকায় নৌকা নোঙর করেন। নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের পুলিশ সব সময় প্রস্তুত রয়েছে।


আরো সংবাদ