১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই

রাষ্ট্রপ্রতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
-

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) সভাপতি, এ দেশের বাম আন্দোলন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই। গত রাতে তিনি রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। তিনি স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল আন্দোলনে তার অবদানের কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের অবদান মানুষ চিরদিন মনে রাখবে। আবদুল হামিদ বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ একজন প্রবীণ রাজনীতিককে হারালো। এতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হামিদ মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিতে তার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
ন্যাপ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাঈল হোসেন নয়া দিগন্তকে জানান, গত ১৪ আগস্ট তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। এ দিকে নামাজে জানাজার ব্যাপারে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের একমাত্র মেয়ে আইভী আহমদ নয়া দিগন্তকে জানান, আজ শনিবার সকালে পরিবার ও দলের নেতারা বসে ঠিক করবেন। কারণ অনেকেই এখনো তার মৃত্যু সংবাদ পাননি। তাই আজ শনিবার কখন কোথায় কী হবে তা জানানো হবে।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৩৭ সালে। ছাত্রাবস্থায় তিনি ব্রিটিশবিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৫২ সালে আজিমপুর সরকারি কলোনির একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। তার এই ফ্ল্যাটটিই হয়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলনের হেড কোয়ার্টার। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি পুরোপুরিভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে দেবীদ্বার আসনে মুসলিম লীগের জাঁদরেল প্রার্থী মফিজ উদ্দিনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৫৭ সালের এপ্রিলে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দলীয় নেতৃত্বের বিরোধিতা করে শেখ মুজিবুর রহমান মোজাফফর আহমদের প্রস্তাবের পক্ষে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং প্রস্তাবটি পাস হয়েছিল।
১৯৫৭ সালের ২৭ জুলাই মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ গঠন প্রক্রিয়ায়ও একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসন মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে হুলিয়া, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। তিনি আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। আট বছর আত্মগোপনে থেকে ১৯৬৬ সালে আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
১৯৭১ স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্বের একজন এবং প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য বিশের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এ সময় তিনি জাতিসঙ্ঘেও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সাথে তাকেও স্বাধীনতা পদক দেয়ার ঘোষণা করলে তিনি তা সবিনয়ে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে কুঁড়েঘরের মোজাফফর বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। জীবনে শেষ দিনগুলোতে তিনি রাজধানীর বারিধারায় মেয়ের বাসায় জীবনযাপন করতেন।


আরো সংবাদ