১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কফি আনানের সুপারিশ বাস্তবায়ন ছাড়া সঙ্কট সমাধান হবে না

রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর আজ
-

মিয়ানমারের রাখাইনে জাতিগত নিধনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমাদের উদ্বাস্তু জীবনের আজ শনিবার দুই বছর পার হলো। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের এই দিনে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত পথ দিয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। বাংলাদেশ মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাদের আশ্রয় দেয়। এর মধ্যে দুই বার তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়েও শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হয়। গত ২২ আগস্ট দ্বিতীয় বারের মতো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে যাওয়ায় এখন সর্বত্র আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফ এবং কক্সবাজারের স্থানীয় লোকদের মধ্যে বেশ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গাদের সাথে দোষ চাপনো হচ্ছে এনজিও আইএনজিওগুলোর ওপর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এনজিওগুলো প্রত্যাবাসনে রোহিঙ্গাদের নিরুৎসাহিত করছে। এ কারণে স্থানীয়দের সাথে রোহিঙ্গাদের দূরত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নাগরিকত্ব ও নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ফিরবে না,অন্য দিকে মিয়ানমার এসব দাবি উপেক্ষা করে শুধু প্রত্যাবাসনের নতুন নতুন তারিখ ঘোষণা করে চলেছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের আন্তরিকতার অভাবের কারণে বার বার প্রত্যাবাসনের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে এবং বৃহস্পতিবারও দ্বিতীয় বারের মতো এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এমতাবস্থায় কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন ছাড়া চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের কোনো পথ খোলা নেই বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমদ দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, মিয়ানমার পরিবেশ তৈরি করেনি অথচ ঘটা করে প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করে কূটকৌশলে লিপ্ত রয়েছে। প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার মোটেও আন্তরিক নয়। তারা বসে বসে কূটনীতি খেলছে এবং বাংলাদেশ তাদের ফাঁদে পড়ছে বার বার।
তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথমে দরকার ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের পরিবর্তন।ওই আইনের ফলে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছে। মিয়ানমার ওই আইনে সংশোধন অথবা নতুন আইন করেও নাগরিকত্ব আইন বদলাতে পারে। এ ছাড়া কফি আনান কমিশনের সুপারিশ এবং জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টেও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান রয়েছে। এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। এ রকম পরিবেশ সৃষ্টি হলে রোহিঙ্গারা এমনিতেই তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাবে। এসব না করে মিয়ানমার সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনের আগে তড়িঘড়ি করে বিশ্ববাসীকে দেখাতে চাইছে তারা প্রত্যাবাসনে আন্তরিক!’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের অধ্যাপিকা আমেনা মহসিন নয়া দিগন্তকে বলেন,‘নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়াসহ রোহিঙ্গারা যতক্ষণ নিরাপদবোধ করবে না ততক্ষণ তারা রাখাইনে ফিরে যাবে না। বৈশ্বিক চাপ বিশেষ করে সামনে জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনের আগে মিয়ানমার নিজকে দেখাতে চায় তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চেষ্টা করেছে কিন্তু আমরা পাঠাইনি। তবে এবারের প্রত্যাবাসন আয়োজনের সময় যেহেতু চীন ও মিয়ানমারের স্বাধীন তদন্ত দলের সদস্যরাও ছিলেন সেহেতু এটা পরিষ্কার হয়েছে যে রোহিঙ্গারা পরিবেশ না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না। আর এই পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের।
আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রসঙ্গে আমেনা মহসিন আরো বলেন, সত্যিকারের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের আন্তরিকতা থাকলে আগে সেই সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করত। এতে বুঝা যায়, মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা আসলেই লোক দেখানো।’ দ্বিতীয় দফায় প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পর আবারো আলোচনায় আনান কমিশনের রিপোর্ট।
কফি আনান কমিশনের সুপারিশে যা আছেÑ
বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কফি আনানের নেতৃত্বে মিয়ানমারের ছয়জন এবং লেবানন ও নেদারল্যান্ডের ২ নাগরিককে নিয়ে ৯ সদস্যের কমিশন গঠিত হয়। ‘অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট’ শীর্ষক ওই কমিশন মিয়ানমার ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ১৫৫টি বৈঠক করে ১১০০ ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে অং সান সু চি’র হাতে ৮৮টি সুপারিশসম্বলিত প্রতিবেদন তুলে দেয়। এতে রাখাইনে বসবাসকারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন,মানবিক সহায়তা, লোকজনের অবাধ চলাচল ও নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রাখাইনের বাসিন্দাদের অধিকারের বিষয়টি সুরাহা করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে রাখাইনের জনগণকে ‘রোহিঙ্গা’ও বলা হয়নি, মিয়ানমার সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বাঙালি’ও বলা হয়নি। বলা হয়েছে ‘রাখাইনের মুসলমান সম্প্রদায়’ হিসেবে। রাখাইনের জনগণের শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য প্রতিবেদনে রাখাইনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, নাগরিকত্ব, চলাফেরার স্বাধীনতা,অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুুতি,মানবিক সহায়তায় প্রবেশাধিকার, গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাদক, সাম্প্রদায়িক অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব, আন্তঃসাম্প্রদায়িক পছন্দের অধিকার, আন্তঃসাম্প্রদায়িক সংহতি, নিরাপত্তা খাত, ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত ইস্যু এবং দুইপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সম্পর্ক পয়েন্টে সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নিরাপদে (বাংলাদেশ থেকে) প্রত্যাবাসন করতে হবে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে। এরই মধ্যে নাগরিক হিসেবে যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের সব ধরনের অধিকার ও স্বাধীনতা দিতে হবে। আনান কমিশনের ওই সুপারিশমালা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেসময় থেকেই আহ্বান জানিয়ে আসছে। আনান কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত ও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হতে পারে। কিন্তু মিয়ানমার সেই সুপারিশমালা এখনো বাস্তবায়ন না করায় রাখাইনের প্রকৃতপক্ষে ভীতিকর পরিবেশ এখনো বিদ্যমান রয়েছে এবং প্রত্যাবাসনও আটকে আছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উখিয়া টেকনাফে বর্তমানে ৩৪টি ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা হচ্ছে সাড়ে ১১ লাখ।


আরো সংবাদ