২৩ অক্টোবর ২০১৯
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ

গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো তথ্য সংগ্রহ করছে ব্যাংকগুলো

গ্রাহকদের ওপর তথ্য পূরণ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ; হিসাব খোলার ফরম এখন পুস্তিকার আকার ধারণ করেছে ; চলতি মাসেই হিসাব খোলার ফরম সহজীকরণ করা হবে
-

ফরম পূরণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অপ্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ করেছে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি গ্রাহকের যেসব তথ্য ব্যাংক কর্তৃক পূরণ করে সরবরাহ করার কথা সেসব তথ্য প্রদানের দায়িত্বও গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে ব্যাংকের হিসাব খোলার ফরম কলেবরে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এখন একটি পুস্তিকার আকার ধারণ করেছে।
ব্যাংকে ব্যবহৃত ফরমগুলো সহজীকরণের জন্য গঠিত কমিটির একটি সভায় এ অভিযোগ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে এ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম রুহুল আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বিআইবিএম, সোনালী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে বার্ষিক উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক পর্যালোচনা সভায় ব্যাংকে ব্যবহৃত ফরমগুলো সহজীকরণের উপায় নির্ধারণ করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ সেপ্টেম্বর এ সম্পর্কিত একটি কমিটি গঠন করা হয়। গত মঙ্গলবার কমিটির প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে, সেবাগ্রহীতার সময়, খরচ, যাতায়াত ও ভোগান্তি কমানোর জন্য ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে ব্যবহৃত ফরমগুলো ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সহজীকরণের কাজ সম্পন্নকরণ।
সভার কার্যবিবরণীতে এ বিষয়ে বলা হয়, ‘কমিটির প্রথম সভায় সভাপতির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহককে প্রদত্ত সেবায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ফরম বিশেষ করে হিসাব খোলার ফরমটি আসলেই জটিল এবং সেটি পূরণ করা কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া ফরমটিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশ কিছু তথ্য চাওয়া হয়। ফলে এটি ফরম না থেকে রীতিমতো একটি পুস্তিকার আকার ধারণ করেছে। এ ধরনের ফরম সহজ করে অবশ্যই গ্রাহকবান্ধব করতে হবে।
কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপ-মহাব্যস্থাপক কামাল হোসেন বলেন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পরবর্তীতে বিএফআইইউ ২০১৮ সালে গ্রাহকদের মৌলিক তথ্য নিয়ে হিসাব খোলার নির্দেশনা জারি করে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের নির্দেশনাগুলো পরিপালনের জন্য হিসাব খোলার ফরমের সাথে নতুন নতুন ফিল্ড সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকগুলো নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে। কারণ, হিসাব খোলার ফরম প্রকৃতপক্ষে গ্রাহক এবং ব্যাংকের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। তবে অনেক ব্যাংক ইচ্ছেমতো অপ্রয়োজনীয় অনেক তথ্যও গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়ে থাকে। এমনকি গ্রাহকের যেসব তথ্য ব্যাংক কর্তৃক পূরণ করে সরবরাহ করার কথা সেই সব তথ্য প্রদানের দায়িত্বও গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এভাবে ফরমের কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিএফআইইউ ‘ই-কেওয়াইসি’ (ইলেট্রনিক নো ইউর কাস্টমার) নিয়ে কাজ করছে, যার পাইলটিং আগামী অক্টোবর মাসে শুরু হবে। ই-কেওয়াইসি বাস্তবায়ন হলে হিসাব খোলার ফরম সহজ হবে এবং জটিলতা কমবে। এতে সরাসরি এনআইডি ভেরিফেকেশনের সুযোগ থাকবে।
কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত সচিব এ বি এম রুহুল আজাদ বলেন, ফরম সহজীকরণের জন্য বিএফআইইউ ‘ই-কেওয়াইসি’র কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, তা প্রশংসনীয়। তবে বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। তা ছাড়া ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে কেওয়াইসি চালু হলেও ফরমের প্রয়োজনীয়তা সব সময় থাকবে। তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ফরম সহজীকরণের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ই-কেওয়াইসির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ কমিটি ফরম সহজীকরণের কাজ সম্পন্ন করবে। ফরমগুলো সহজ করতে হবে যেন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের সময়, যাতায়াত ও খরচ কমে আসে। ফরমের অপ্রয়োজনীয় যাবতীয় বিষয় বাদ দিয়ে যথাসম্ভব ছোট কলেবরে সাদা-কালো হিসেবে মুদ্রণ করলে ব্যাংকের খরচও কমে আসবে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে কমিটির অপর সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মোছাম্মত শিরিন সবনম বলেন, ব্যাংকগুলো নাগরিক সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক সেবা ও অভ্যন্তরীণ সেবাÑ এ তিন ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। সেবা প্রদানের জন্য ব্যাংকের ফরমগুলো এমন হতে হবে যাতে একজন সাধারণ মানুষ অথবা স্কুলের শিক্ষার্থী কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করেই দ্রুততম সময়ে তা যথাযথভাবে পূরণ করতে সক্ষম হয়। চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সাধারণ মানুষ অথবা স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে ফরমগুলো ‘ইউজার টেস্ট’ করা যেতে পারে বলে তিনি মতামত দেন।
সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংকে ব্যবহৃত ফরমগুলো সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। ফরম সহজীকরণের জন্য সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট, প্রাইম ও বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয়।
জানা গেছে, এ কমিটি পরবর্তী সভা আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ফরমের একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।

 


আরো সংবাদ