২৩ নভেম্বর ২০১৯

তালিকাতে নেই এনআইডি নম্বর, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড ১০ টাকার চালে ভয়াবহ অনিয়ম

সরেজমিন রংপুর- শেষ
-

রংপুরের পীরগঞ্জের শানেরহাট ইউনিয়নে ১০ টাকার চাল, ভিজিডি, জন্ম নিবন্ধনসহ এমন কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেই, যেখানে অনিয়ম করা হয়নি। এখানে বিধিমালা ভেঙে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এনআইডি নম্বর ছাড়াই। তালিকাভুক্ত করে চাল উত্তোলন করা হয়েছে ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তি, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড খাদ্যবান্ধব ও কর্মসূচিতে একই ব্যক্তি, এনআইডি নম্বর চেয়ারম্যানের ভাইয়ের, তালিকায় নাম অন্যজনের, তালিকায় অসম বণ্টন ছাড়াও অতিরিক্ত জন্মনিবন্ধন ফি নেয়ারও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, এই চিত্র শুধু এই ইউনিয়নেরই নয়, সারা বাংলাদেশের। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযান চালানোর দাবি তাদের। বিষয়টি নিয়ে নয়া দিগন্তের সরেজমিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের শেষ পর্ব এটি।
এনআইডি নম্বর দেয়া ছাড়াই তালিকায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৭ জনকে। এরা হলেন পার্বতীপুর গ্রামের একরামুল (১৫৩), আনোয়ারা (১৫৪), মনোয়ারা (২১৮), গোলাম রব্বানী (৭৪১), ঘোষপুর গ্রামের সালমা (২৭৭), নায়েব (২৯২), শ্যামলী (৩০৪); মেস্টা গ্রামের মিলন মণ্ডল (৪৮৩), সোহরাব (৪৮৪); রাউতপাড়ার জগন্নাথ রায় (৫২৩); পাহাড়পুরের শাহনাজ (৭২৬), সুলতান (৭৩৭); দামোদারপুরের জান্নাতি (৭৩৮), সাবিনা (৭৩৯); কাজিরপাড়ার শিপন (৭৮৯), জোসনা (৭৯০), আনজেরা (৭৯১), ডিপ্টি (৭৯২), হালিমা (৭৯৩), রঞ্জ (৭৯৪); ছোট পাহাড়পুর গ্রামের হামিদ (৮৪৪), সাহাদুল (১০২২), আব্দুর রহিম (১০২১), শুকরাম বাবু (১০২৩); পবনপাড়ার শিবধারী রাম (৮৫২); বড় পাহারপুর গ্রামের সাত্তার (১০৩৫)।
ভোটার তালিকায় নাম নেই, বরাদ্দ তালিকায় যাদের নাম আছে তারা হলেন : শানেরহাট ইউনিয়নের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও ৯ জনকে বরাদ্দের তালিকায় রাখা হয়েছে। এরা হলেন : নুরমল (৩২৩), মজিদুল (৩২৫), হাজিরন (৩২৬), হোসনে আরা (৩২৭), আফসার (৩৩৪), সায়ারুল (৪৯৭), আসতারা (৫৩৩), আইয়ুব (৫৩৩) ও রফিক (৫৪৪)।
তালিকায় একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এসব কার্ডধারীরা হলেন : থামার সাদুল্যাপুরের ছালামের স্ত্রী রুপালী (৭১৫ ও ১২৬৩), হরিরাম সাহাপু গ্রামের সাত্তার মিয়ার স্ত্রী আছতারা (৫১২ ও ৫৩৩)। তারা একই ব্যক্তি হয়ে দুই দফায় চাল তুলছেন।
এ দিকে নীতিমালায় না থাকলেও খাদ্যবান্ধব ও কর্মসূচিতে একই ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে। তারা হলেন : পালানু সাহাপুর গ্রামের মিলন (৫৭৯), আতিয়ার (৫৮৯), মুক্তি (৫৯৮), কায়েম (৬৩৪); পবনপাড়া গ্রামের বুলবুলি (৬৫০), হারিছা (৬৫৪); রাউৎপাড়ার জগন্নাথ রায় (৫২৩)। এসব ব্যাপারে ওই ইউনিয়নের সাবেক রিলিফ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য খবির উদ্দিন জানান, এনআইডি নম্বর ছাড়া তালিকা তৈরি করা, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও বিধি ভেঙে বরাদ্দ তালিকায় নাম দেয়া, একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড বরাদ্দ দেয়া এবং খাদ্যবান্ধব ও কর্মসূচিতে একই ব্যক্তির নাম দেয়ার মাধ্যমে ইউনিয়নে ১০ টাকার চাল নিয়ে হযবরল পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সুনাম এখানে দারুণভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের আসন পীরগঞ্জেই যদি একজন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেন, তাহলে আমরা কোথায় যাব। সেই ব্যক্তি আবার কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রার্থী। তিনি বলেন, আশাকারি আওয়ামী লীগের চলমান শুদ্ধি অভিযানে বিষয়টি নজরে আসবে উপজেলা ও জেলা নেতৃবৃন্দের।
এনআইডি নম্বর চেয়ারম্যানের ভাইয়ের, তালিকায় নাম অন্যজনের : এ দিকে ৭৭৯ নং কার্ডে রেমা রানী নামে এক উপকারভোগীর নাম তালিকায় রাখা হলেও তার পাশে যে এনআইডি (৮৫১৭৬৮৮৫৫৪৪৫৬) নম্বরটি দেয়া হয়েছে সেটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মন্টু মিয়ার ছোট ভাই আখতারুজ্জামানের। আখতারুজ্জামানকে এলাকায় ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে সবাই জানেন।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হরিরাম সাহাপুর গ্রামের মন্টু জানান, আমি রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করি। আমি ১০ টাকার চাল তো দূরের কথা, সরকারি কোনো সুবিধাই পাই না। অথচ চেয়ারম্যান সাহেবের ভাই কোটিপতি ব্যবসায়ী, তার এনআইডি দিয়ে চাল তোলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হোক।
অসম বণ্টন : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছোটপাহাড়পুর গ্রামে ভোটার ৫৫২ জনের মধ্যে ১৩০ জনকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ওই গ্রামে তালিকাভুক্ত নামের মধ্যে ২৮ ব্যক্তি নেই। অন্য দিকে হরিরাম সাহাপুর গ্রামে ভোটার ১ হাজার ৪৪৬ জনের মধ্যে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৪৩ জনকে। এতে সুসম বণ্টন নিশ্চিত হয়নি।
অতিরিক্ত জন্মনিবন্ধন ফি : অনুসন্ধানে এলাকাবাসী জানিয়ছেন, জন্মনিবন্ধন বিধিমালায় ১ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত ফ্রি, ৪৫ দিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ২৫ টাকা, পাঁচ বছর থেকে ওপরে ৫০ টাকা নেয়ার বিধান থাকলেও গত তিন বছরে এখানে প্রতিটি জন্মনিবন্ধন ফি বাবদ ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে কোনো রশিদ দেয়া হয়নি। বিষয়টি ইউনিয়নবাসীর কাছে ওপেন সিক্রেট।
ভিজিডির দুর্নীতি : ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয় দুস্থ অসহায়দের। সেখানেও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে অনিয়মের নানা চিত্র।
ভুয়া এনআইডি কার্ড : ভুয়া এনআইডি কার্ড দিয়ে ভিজিডির তালিকায় ২২ জনের নাম লিখিয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরা হলেন পার্বতীপুর গ্রামের দেলোয়ারা খাতুন (কার্ড ২), খোলাহাটির গ্রামের মারুফা বেগম (৩৩), ববিতা বেগম (৪৯), মঞ্জুয়ারা বেগম (৫৪), মেস্টা গ্রামের নিপা বেগম (১০১), নাছিমা খাতুন (১০২), হরিরাম সাহাপুর গ্রামের সান্ত্বনা বেগম (১০৯), একই গ্রামের নাছিমা বেগম (১১৩); পালানু সাহাপুর গ্রামের গোলাপী (১৩৩), কহিনূর বেগম (১৪১); পবনপাড়ার আনজুায়ারা (১৩৪), অঞ্জলি রানী (১৩৫), জয়ন্তি রানী (১৩৬), বুলবুলি বেগম (১৪২); ধল্যাকান্দি গ্রামের রিনা বেগম (১৪৬), শেফালী বেগম (১৫১), শাপলা বেগম (১৫৪); ছোটপাহারপুর গ্রামের সান্ত্বনা (১৮৭), মাফিয়া বেগম (১৯২), মারুফা বেগম (১৯৫); পাহারপুর গ্রামের অঞ্জনা বেগম (১৯৯), রমিছা বেগম (২০৬)।
অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে অন্যজনের এনআইডি নাম ব্যবহার করে ১৬ জনকে ভিজিডি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এরা হলেন পার্বতীপুরের চামেলী (কার্ড নং ১৬), দামোদারপুর গ্রামের রেনু বেগম (২৮); খোলাহাটি গ্রামের আসতারা (২৯), বিলকিস (৩০), নাজনীন বেগম (৪১); ঘোষপুর গ্রামের আরেফা (৫৯), শিউলি বেগম (৬৩), মাহফুজা (৬৫); রায়তীপুর সাদুল্যাপুর গ্রামের জরিনা বেগম (১৪৩), খামার সাদুল্যাপুর গ্রামের গোলেনুর (১৭০), খামার সাদুল্যাপুর গ্রামের রিক্তা বেগম (১৭৩), ছোটপাহাড়পুর গ্রামের গোলনাহার বেগম (১৮০) ও শাপলা বেগম (১৯৩)।
এ ব্যাপারে চেয়ারম্যানের বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য খন্দকার শহিদুল আলম মিঠু জানান, চেয়ারম্যান সাহেব খাদ্যবান্ধব, ভিজিডি, জন্মনিবন্ধন, মাতৃকালীন ভাতা, বয়স্কভাতা, ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচি, রিলিফসহ সব সরকারি কর্মসূচিতে যেভাবে অনিয়ম, দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তুলেছেন, তাতে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হচ্ছে। বিষয়গুলো জানিয়ে আমি স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা, দুদকসহ বিভিন্ন দফতরে গত ১২ জুন সব প্রমাণাদিসহ লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আবেদনের পর খাদ্য কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে সরেজমিন তদন্ত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ দিকে চেয়ারম্যান বলে বেড়াচ্ছেন, কোনো অভিযোগই কাজে আসবে না। এতে আমি ও ইউনিয়নবাসী উদ্বিগ্ন। সাবেক এই সেনাসদস্য আরো বলেন, আমরা ইউনিয়নবাসী চাই যত দ্রুত সম্ভব বিষয়গুলো উচ্চতর কমিটির মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এ ব্যাপারে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: সেলিম সরদার জানান, ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সব বরাদ্দে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের কথা আমার কাছে এসেছে। কিছু কিছু বিষয়ে আমিও সত্যতা পেয়েছি। বিষয়গুলোর তদন্তের মাধ্যমে সুরাহা হওয়া দরকার।
এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সভাপতি প্রার্থী মিজানুর রহমান মন্টু জানান, আমার প্রতিপক্ষ আমার নামে এসব কুৎসা রটাচ্ছে। এসব অভিযোগ সঠিক নয়, তবে গত ১৯ সেপ্টেম্বর মৃত, একাধিক ভোক্তা, ঢাকায় অবস্থান, স্বচ্ছল এ ধরনের ৬৬ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সেখানে প্রকৃত দুস্থদের নাম তালিকাভুক্ত করে তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। যদি আরো পাওয়া যায়, সেটাও সংশোধন করা হবে।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল মোমিন জানান, ওই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এখনো তদন্ত রিপোর্ট আসেনি। তিনি বলেন, এর আগেও আমি পীরগঞ্জ অডিটোরিয়ামে একটি আলোচনা সভায়ও চেয়ারম্যান সাহেবকে বিষয়গুলো নিয়ে অভিযোগের ব্যাপারে বলেছিলাম। এ ব্যাপারে রংপুরের ডিসি আসিব আহসান বলেন, এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সরকারি বরাদ্দে যদি কেউ অনিয়ম করে তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে সুশানের জন্য নাগরিক সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আলম বেঞ্জু জানান, পীরগঞ্জের শানেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের ১০ টাকার চাল, ভিজিডি, কাবিখা, কাবিটাসহ বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দের যে চিত্র উঠে এসেছে, এটা শুধু সেখানকার চিত্র নয়। এটা পুরো বাংলাদেশের চিত্র। এভাবে সরকারের সব ভালো উদ্যোগকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদনÑ আপনার সব উদ্যোগ সফল করতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হোক। এটি করা হলে বর্তমান সরকারের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল হবে।
অন্য দিকে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন জানান, ওপর থেকে নিচ সবখানেই দুর্নীতি-অনিয়ম এখন আষ্টেপৃষ্ঠে গেড়ে বসেছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সরকারি বরাদ্দ হরিলুট করা হচ্ছে। শুধু শানেরহাট ইউনিয়ন নয়, খুব সামান্য বাদে প্রায় সব ইউনিয়নগুলোতেই একই দশা। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা বাড়তেই থাকবে।


আরো সংবাদ