২১ নভেম্বর ২০১৯

আউট পাসে দেশে ফিরেছেন ৩৬ হাজার নির্যাতিত শ্রমিক

-

অভাবের সংসারে সুখের আশায় অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। কফিলের হাতে নির্যাতন, আকামা জটিলতা, বেতনভাতা না পাওয়ার সমস্যাসহ নানাভাবে নির্যাতিতরা টিকতে না পেরে অবশেষে দূতাবাস থেকে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, ওমান, বাহরাইন, জর্ডান, লেবানন ছাড়াও আশিয়ানভুক্ত দেশ মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কোনো না কোনো ফ্লাইটে দেশে ফেরত আসছেন। এর মধ্যে নির্যাতিত শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি বলে দেশে ফেরত আসা শ্রমিকদের জবানবন্দীতে উল্লেখ রয়েছে। ওই হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৯ মাসে দূতাবাস/হাইকমিশন থেকে আউটপাসে দেশে ফেরত এসেছেন প্রায় ৩৬ হাজার শ্রমিক (নারী-পুরুষ)। আর ফিরে আসা শ্রমিকদের অনেকেই নির্যাতনের বিচার দাবি ছাড়াও ক্ষতিপূরণ পেতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে লিখিত অভিযোগ করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ কর্মীই ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে ভোগান্তির শিকার। অভিযোগ রয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সির কিছু মালিকের সাথে ব্যুরোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দহরম-মহরম বেশি হওয়ায় প্রতারিত-নির্যাতিত শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বিদেশে যাওয়ার পর যে শ্রমিক খালী হাতে দেশে ফিরেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছেন সেপ্টেম্বর মাসে। এই মাসে আট হাজার ৭২৫ জন নারী-পুরুষ শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে চার হাজার ২৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে তিন হাজার ৩৭২ জন, মার্চে তিন হাজার ৮৭৫ জন, এপ্রিলে তিন হাজার ৪৬ জন, মে মাসে তিন হাজার ৪৭৫ জন, জুনে এক হাজার ৭৭৮ জন, জুলাইয়ে তিন হাজার ৮৮০ জন। গতকাল মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, চলতি বছরের ৯ মাসে ৩৫ হাজার ৮০৯ শ্রমিক আউটপাসে দেশে ফিরেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারাই আউট পাসে ফিরছেন তাদের হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশ প্রত্যেকের জবানবন্দী রেকর্ড করে তারপর যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন। পরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে তাদের বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক তানভীর হাসান বলেন, এই মুহূর্তে সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। নানা সমস্যায় তারা ফিরে আসছেন বলে জবানবন্দী দিচ্ছেন। আমরা তাদের দেয়া তথ্যগুলো রেকর্ড করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এরপর কী হচ্ছে তা আর জানি না। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে ফেরত আসা শ্রমিকদের কাছ থেকে কিছু এনজিও তথ্য সংগ্রহ করছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে বরিশাল পিরোজপুর জেলার বাসিন্দা মুন্নিসহ আটজন দেশে ফেরেন। তারা প্রত্যেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে নির্যাতনের জবানবন্দী দিয়েছেন। মুন্নি সৌদি আরবে কিভাবে কফিল এবং তার স্ত্রী সন্তানদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয়েছেন এবং কিভাবে সেখান থেকে পালিয়ে দূতাবাসের শেল্টার হোমে আশ্রয় নিয়ে দ্বিতীয় দফায় নির্যাতিত হয়েছেন সেই লোমহর্ষক বর্ণনাও দিয়েছেন। বিদেশে নির্যাতিত হওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুন্নি আবেগাপ্লুত হয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, আল্লাহ আমাকে ফেরত নিয়ে এসেছেন এ জন্য আল্লাহর কাছে হাজারো শুকরিয়া। তবে তিনি তার ওপর নির্যাতনের চেষ্টাকারী সৌদির গৃহকর্তা আলীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে কি না সেটি বার বার প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান।
মুন্নির বক্তব্য অনুযায়ী, ১১ মাস আগে তিনি রাজধানীর ফকিরাপুলের আল আজিজ নামক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবের রিয়াদে পাড়ি জমান। সেখান থেকে দেড় দিনের দূরত্বের কফিলের বাড়িতে পৌঁছান। যথারীতি কাজ শুরু করেন। কিছু দিন না যেতেই বাড়ির গৃহকর্তার কুদৃষ্টি পড়ে তার ওপর। মুন্নি বলেন, গৃহকর্তা তাকে প্রায় তার রুমে ডাকত। কাজের কথা বলে ডেকে নিলেও রুমে যাওয়ার পরই পাজা করে ধরার চেষ্টা করত। যখন রুমে ডাকত তখন সে অনেকটা ‘উলঙ্গ’ অবস্থায় থাকত। এসব অভিযোগ তিনি গৃহকর্তা আলীর স্ত্রী হেনাকে জানালেও তিনি বিশ্বাস না করে উল্টো তাকেই স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলেই মারধর করত। এ ছাড়াও তাদের ছয় মেয়ে আর সন্তানদের কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সারাক্ষণ একটার পর একটা কাজের চাপে অনেকটা দিশেহারা করে ফেলেন। উপায় না দেখে সাত মাস কাজ করার পর একদিন বাড়ি থেকে তিনি পালিয়ে যান। বের হয়ে পড়েন আরেক বিপদে। তিন দিন মরুভূমিতে থাকার পর এক পর্যায়ে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সন্ধান পান। শেল্টার হোমে চার মাস থাকার পর গত দুই সপ্তাহ আগে তিনি আউটপাসে দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে তাকে বিদেশে নির্যাতন সম্পর্কে যা যা জিজ্ঞেস করা হয়েছে তার সবই তিনি বলে এসেছেন বলে জানান মুন্নি আক্তার। গত রাতে মুন্নি এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার মা এখনো ইট ভাঙ্গার কাজ করে দিন পার করছেন। মায়ের কষ্ট দূর করার জন্যই বিদেশ গিয়েছিলাম। কিন্তু বিদেশে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমি এখানে কষ্টে থাকলেও আর কোনো দিন সৌদি যাবো না। কারণ সৌদিরা ভালো মানুষ না। তারা শুধু মিথ্যা কথা বলে। শুধু তারাই যে খারাপ সেটা বলব না। আমাদের দূতাবাসের শেল্টার হোমের দায়িত্বে যারা আছেন তারাও কিন্তু খারাপ হয়ে যাচ্ছেন। আমি থাকার সময় দেখেছি মেয়েদের থাকার কষ্ট, খাবারে কষ্ট লেগেই আছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি যে ফ্লাইটে দেশে ফিরেছি ওই ফ্লাইটে আমার সাথে আরো সাতজন এসেছেন। একজনের নামে মামলা থাকায় রিয়াদ এয়ারপোর্ট থেকেই তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। শুধু মুন্নি নয় তার মতো আউট পাসে দেশে ফেরা প্রত্যেক শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ দিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকরা দিনের পর দিন ঘুরেও রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের কাছ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারছেন না। অভিযোগ রয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সুযোগ সুবিধা নেয়ার জন্য নির্যাতিতদের পক্ষে না থেকে এজেন্সিগুলোর পক্ষে কাজ করেন? বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের নজরে দেয়ার কথা জানিয়ে একাধিক ভুক্তভোগী এ প্রতিবেদককে বলেন, এসব অনিয়ম দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে নির্যাতিত মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। অপর দিকে সৌদির শেল্টার হোমগুলোতে অনিয়মের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে দেখার জন্য দেশে ফেরা নির্যাতিত নারীরা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান।

 


আরো সংবাদ