০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রসিকিউটরের পদ থেকে তুরিন আফরোজকে অপসারণ

-

শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের পদ থেকে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে অপসারণ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজকে শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপনে প্রদত্ত নিয়োগ বাতিলক্রমে প্রসিকিউটর পদ থেকে অপসারণ করা হলো।
এর আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পাসপোর্ট অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের (যুদ্ধাপরাধ) মামলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ। গত বছর এপ্রিলে অভিযোগ ওঠে, মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওয়াহিদুল হককে ফোন করে কথা বলেন তুরিন। পরে পরিচয় গোপন করে ঢাকার একটি হোটেলে তার সাথে দেখাও করেন।
ওই অভিযোগ ওঠার পর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ওয়াহিদুল ও তুরিন আফরোজের কথোপকথনের রেকর্ড ও বৈঠকের অডিও রেকর্ডসহ যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের সব মামলা থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তুরিনকে।
তুরিন আফরোজ সে সময় অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো জবাব দেননি। এক ফেসবুক পোস্টে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ওই গোপন বৈঠকের কথা তিনি অস্বীকার করেননি।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের তিন বছরের মাথায় প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তুরিন আফরোজ। তাকে ওয়াহিদুল হকের মামলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ২০১৭ সালের নভেম্বরে।
পরের বছর মে মাসে তুরিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক বলেছিলেন, ওয়াহিদুল হককে গ্রেফতার করার সময় গুলশান থানার ওসি তার মোবাইল ফোন জব্দ করেছিলেন। ওই মোবাইলে কথোপকথনের দু’টি রেকর্ড ছিল। একটি কথোপকথন হয়েছে টেলিফোনে। সেখানে তুরিন আফরোজ আসামি মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে দাওয়াত দিয়েছেন দেখা করার অনুমতি চেয়ে। ফোনটা তুরিনই করেছিলেন।
অন্য রেকর্ডটি ছিল দুই ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের। এই কথোপকথনে মামলা সংক্রান্ত অনেক কথা রয়েছে এবং মামলার ডকুমেন্ট হস্তান্তরের কথোপকথন রয়েছে। ওসি এটা পাওয়ার পর মনে করলেন যে, আমাদের জানানো দরকার। আমরা এটা হাতে পাওয়ার পর প্রসিকিউশনকে দিয়েছি।
তদন্তাধীন মামলার আসামির সাথে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো আইনজীবীর গোপনে দেখা বা সাক্ষাৎ নৈতিকতাবিরোধী মন্তব্য করে সানাউল সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমত কথা হচ্ছে উনি এ মামলা তদন্ত করেন না। তদন্ত করেন তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান। ফেসবুকে দেখলাম উনি (তুরিন আফরোজ) গোপনে তদন্ত করতে চেয়েছিলেন আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু এ রকম কোনো নিয়ম নেই আমাদের তদন্তে।
এ দিকে তুরিনকে অপসারণের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি একজন আসামির সাথে, যে মামলা তিনি নিজে করছিলেন, তার সাথে আলাপ-আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। মামলার আলোচনা করার সময় এও বলেছিলেন, এ মামলায় কোনো সারবর্তা নেই। সেই যে কথোপকথন টেপ করা হয়, টেপ করা কথোপকথনগুলো এবং তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগ আমাদের কাছে পাঠান। এ অভিযোগ নিয়ে সাক্ষীদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং উনার সাথে কথা বলার প্রয়োজন যতটুকু মনে করি হয়েছিল। যে সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, সেগুলো কিন্তু অল আর ডকুমেন্টরি। সেই জন্য আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অব্যাহিত দিয়েছি।
তুরিন আফরোজের আগের কাজে নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, যে কারণে আজ (গতকাল) তাকে অব্যাহতি দেয়া হলো, তার আগ পর্যন্ত তিনি কিন্তু নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেছেন।
এ ব্যাপারে তার সেন্স অব জাজমেন্ট কেন কাজ করেনি আমি জানি না, তার দিক থেকে এসব বক্তব্য যেটা ধারণ করা হয়েছে, যেটা তার গলা বলে প্রমাণিত হয়েছে, এটা উনি কেন করলেন, আমরা বুঝতে পারছি না। এটা দুঃখজনক।
অপসারণের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, কাজটা যে আমি খুশি হয়ে করেছি, তা না। কিন্তু তাকে অব্যাহতি দেয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ যে মামলা নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই মামলায় চার্জ গঠন হয়ে গেছে, সেই কারণে আমার মনে হয় এই ব্যাপারটির একটি নিষ্পত্তি টানা দরকার ছিল, সেজন্য এটা করা হয়েছে।
তুরিনের কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ বলে মন্তব্য এসেছে। এ ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না সাংবাদিকরা জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, আমি তো এ রকম কথা বলতে পারব না, আমার এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য নেই।
তুরিন আফরোজকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সাথে কথা হয়েছে, যে প্রমাণাদি আছে, সেটা যদি এখন ইয়ে করতে চান, সেটা তো ওপেন। কিন্তু টেপ করা কথাবার্তা আমরা পেয়েছি এবং তার বিরুদ্ধে নালিশ হয়েছে এবং আমরা সার্বিকভাবে আলোচনা করার পর তাকে অব্যাহতি দিয়েছি।

 


আরো সংবাদ