১০ ডিসেম্বর ২০১৯

একটি খাল বদলে দিয়েছে দেড় লাখ কৃষকের জীবন

নওগাঁয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্প
-

রাজশাহীর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি খাল খনন প্রকল্প নওগাঁ জেলার দেড় লাখের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জীবন বদলে দিয়েছে। হতাশা যখন তাদের গ্রাস করছিল, স্বপ্ন দেখার আশা থমকে গিয়েছিল। ঠিক তখনই বিএমডিএর উদ্যোগে ওই খাল খনন প্রকল্প তাদের নব উদ্যোগে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। হাসি ফুটিয়েছে তাদের মুখে।
আজ থেকে বছর চারেক আগেও জলাবদ্ধতার কারণে হেক্টরের পর হেক্টর জমি চাষ করতে পারেননি কৃষক। ঋণ করে ফসল বুনেছিলেন, তবে বেশির ভাগ সময়ই সেই ফসল ঘরে উঠেনি। এতে করে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা চরম কষ্টে দিনযাপন করতে থাকেন। নতুন করে ফসল উৎপাদনে আগ্রহ কমতে থাকে তাদের। আর ওই সময়ই ‘ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প’ গ্রহণ করে বিএমডিএ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প এলাকায় আবাদের আওতায় এসেছে ১৬ হাজার হেক্টরের বেশি পতিত আবাদি জমি। বেড়েছে ধান উৎপাদন। সুফল ভোগ করছেন নওগাঁর ছয়টি উপজেলার দেড় লাখের বেশি কৃষক। সরেজমিন এই এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) উদ্যোগে এই খাল খনন প্রকল্পই তাদের জীবন বদলে দিয়েছে। আগে তারা কৃষি ফসল উৎপাদনে কোনো সুফলই পাননি। আর যখনই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, তখন থেকেই কৃষি ফসল উৎপাদনে তারা আলোর মুখ দেখতে থাকেন।
বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নওগাঁ সদর, মান্দা, রানীনগর, আত্রাই, পতœীতলা ও ধামুইরহাট এই ছয় উপজেলার উপর দিয়ে প্রায় ৯৩ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। ফুটওভার ব্রিজ ও ক্রসড্যাম রয়েছে ১৩টি। এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৭৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকল্পটি শেষ হয়। যার কারণে বছর প্রতি ধান, রবিশষ্যসহ চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। যদিও এর আগে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও কিছু এলাকায় পানি না থাকার কারণে এই এলাকাগুলো পতিত থাকত বলে জানান কৃষকরা।
নওগাঁ সদর উপজেলার মাগনা কোমরকোঠা এলাকার কৃষক আফজাল শাহ বলেন, বন্যার পানি জমে থাকত। আগে ঘরবাড়ি ডুবে যেত। ধান লাগাতে দুই থেকে তিন মাস দেরি হয়ে যেতো, আর বাকি সময় ধান কাটার আগেই বন্যা চলে আসত। অনেক ধান উঠানো যায়নি। তবে এখন সময়মতোই ফসল আবাদে সক্ষম হয়েছেন তারা।
মান্দা উপজেলার গড়িয়াচান এলাকার কৃষক ইনছার আলী বলেন, বোরো আবাদ নিশ্চিত করেছে এই প্রকল্পটি। জমিগুলো চাষ উপযোগী হয়েছে। প্রতি হেক্টরে যেখানে আগে ধান উৎপাদন হতো ৬০ থেকে ৭০ মণ। সেখানে এখন ১০০ থেকে ১১০ মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী সানজিদা খানম মলি নয়া দিগন্তকে বলেন, এই এলাকায় বন্যায় যে জলাবদ্ধতা তৈরি হত, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে তা নিরসন হয়েছে। এতে পুরুষের পাশাপশি নারীরাও উপকৃত হচ্ছেন। আগে যেখানে নারীরা ঘরে বসে থাকতেন, এখন তারা খালের পাড়সহ বিভিন্ন স্থানে সবজি উৎপাদন, হাঁস পালন করছেন। খালের উভয়পাশে ৩০ হাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও বনজবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ও বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী এ টি এম মাহফুজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আগে আমন, আউশ, বোরো এবং রবি শষ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। এখন পতিত জমিগুলো আবাদের আওতায় এসেছে। যার উপকার ভোগ করছেন প্রায় ৮০ হাজার নারী ও ৮৫ হাজার পুরুষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ওই এলাকায় বছরে প্রায় ২৩০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হচ্ছে।

 


আরো সংবাদ