১১ ডিসেম্বর ২০১৯

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড চলতি বছরে

-

এ বছরটা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বছর হতে যাচ্ছে। ১৮৮০ সাল থেকে আধুনিক উপায়ে তাপমাত্রার রেকর্ড সংরক্ষণের পর থেকে এ বছরই হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বছর। এ বিষয়ে আগাম সংবাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)। এটা দীর্ঘমেয়াদি মনুষ্য সৃষ্ট একটি কারণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসগারীয় অঞ্চলে শক্তিশালী এল নিনু না ঘটা এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা। প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব এটা। গত ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত এ সংক্রান্ত নতুন রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৯ সালটি হবে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ৫ শীর্ষ বছরের একটি।
বৈশ্বিক এবং মহাসাগরে তাপমাত্রার একটি গড় প্রকাশ করেছে নোয়া। তাদের রিপোর্টে বলেছে, গত অক্টোবর মাসের বৈশ্বিক ভূমি ও মহাসাগরের উপরের গড় তাপমাত্রা ১.৭৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (০.৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বেশি ছিল। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে তা ছিল ০.১১ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি। ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অক্টোবর মাসটি ছিল ১০ম উষ্ণতম মাস এবং ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবরটি গেছে ৫ম শীর্ষ উষ্ণতম মাস। বিংশ শতাব্দী থেকে চলতি বছরের গত অক্টোবর মাসটি ছিল ৪৩তম উষ্ণ মাস। এটাকে এভাবে বলা যায় যে ৩৮ বছরের একজন মানুষ এর চেয়ে ঠাণ্ডা কোনো মাসে বাস করেননি।
নাসা ও নোয়া এই দুই সংস্থার তাপমাত্রার রেকর্ডে ২০১৯ সালকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বছর হিসেবে স্থান দিয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস সেন্টার গত অক্টোবর মাসকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মান হিসেবে স্থান দিয়েছে। কোপারনিকাস সেন্টার কমপিউটার মডেলিং করে তাপমাত্রার এই রেকর্ডটির ব্যাপারে বলেছে। বিজ্ঞানীরা তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস তথা কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকেই দায়ী করেছেন। কয়লা, ভূগর্ভস্থ তেলের মতো জীবাষ্ম জ্বালানি পোড়ানোকে বিজ্ঞানীরা গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেছনের কারণ হিসেবে বলছেন।
নোয়ার গবেষণা অনুসারে উষ্ণতম বেশি তাপমাত্রা উত্তর ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তর-পূর্ব কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল, দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর, আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের তাপমাত্রা গত অক্টোবরে বেশি ছিল। নোয়া বলছে, উষ্ণতার বিপরীতে ঠাণ্ডা ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল। এই অঞ্চলের শিলাগুলো মাসব্যাপী ঠাণ্ডা ছিল। নোয়ার এই রিপোর্টটি ওয়াশিংটন পোস্টে ছাপা হয় গত ১৯ নভেম্বর।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে রাখার জন্য ২০১৫ সালে ১৯৫টি দেশ প্যারিসে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত সংস্থা ইউএনএফসিসিসিতে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের রাখার এই চুক্তি থেকে ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দেশকে সরিয়ে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার সময় চুক্তিতে স্বাক্ষর করা হয়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝড়, বন্যা, ভূমিধস ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত দুই দশকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ৬ নম্বরে রয়েছে। জার্মান ভিত্তিক জলবায়ু পরামর্শক গোষ্ঠী ‘জার্মানওয়াচ’ প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক-২০১৬ এর প্রতিবেদন অনুসারে এ ধরনের ক্ষতি ও সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় প্রথম তিনটি দেশ হলো হন্ডুরাস, মিয়ানমার ও হাইতি।
২০১৫ প্যারিস চুক্তির খসড়ায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করেছিল তাকে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে ২০৬০ থেকে ২০৮০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য বলা হয়েছে।
বিবিসি বলছে, চলতি বছর বিশ্বে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার শতাধিক রেকর্ড ভেঙেছে। গত ১ মে থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়েছে ২৯টি দেশে। যুক্তরাষ্ট্রের কেলিফোর্নিয়ার ‘বার্কেলি আর্থ’ এসব তথ্য জানিয়েছে। ইউরোপে চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়ে তীব্র দাবদাহ আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এ বছর ফ্রান্সে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এ বছর ৩০টি সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। জাপানে ১০টি তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। গত ৮ জুন কুয়েতের আবহাওয়ায় রোদের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চলতি বছর ২৪ এপ্রিল গত পাঁচ দশকে ঢাকায় ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। সেদিন ঢাকায় ৪০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যশোরে ৪২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।


আরো সংবাদ

সকল