২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সাপের ফণার নিচে বেদে শিশুর জীবন

-

বেঁচে থাকার জন্য এদের বিচিত্রসব পেশা। নৌকায় সংসার, আবার নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দেশ-দেশান্তরে। প্রকৃতির মধ্যেই এরা জীবনের বৈচিত্র্যের সন্ধান খোঁজে। জীবিকার জন্য মৃত্যুঝুঁকিতেও পিছপা হয় না। বাক্সে রাখা সাপ জড়িয়ে দেয় শিশুর গলায়। এতে শিশুটির মধ্যে ভয়ের ভাবলেশ নেই। মনে হলো এটা বিষধর সাপ নয়, যেন দেবতা।
বিনের সুরে ফণা তুলে সাপ। ছোবলে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তার নিচেই নিষ্পাপ শিশুকে ঠেলে দেন পিতা। তার সাথে খেলায় মেতে ওঠে শিশু। এমন খেলা দর্শককে আনন্দ দেয়। জীবিকার তাগিদে এমন মরণ খেলায় প্রায়ই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। সাপের ছোবলে হেরে যায় যোদ্ধা। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিজের পরাধীনতার জানান দেয়। দিনের পর দিন এভাবেই চলে বেদে শিশুদের জীবন-জীবিকার যুদ্ধ।
এটি গল্প নয়, বাস্তব। সাভার, গাজীপুর, জয়দেবপুর, মানিকগঞ্জ, চৌদ্দগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত বেদেজীবনের প্রতিদিনের চিত্র। বেদেদের ভাষ্যÑ এখানে সাপই তাদের দেবতা। শিশুদের খেলার সঙ্গী। সদ্যজাতকে ভোলাতে মায়েরা বিশাল কালো কেউটে নিয়ে কারসাজি দেখান। শিশুর কান্না থামাতে খেলনা নয়, বরং হাতে তুলে দেয়া হয় কেউটে বা গোখরো। তাদের হিসহিস শব্দে কান্না থামিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শিশু।
তাদের মতে এটি তাদের আদিম পেশা। তাই ঝুঁকি জেনেও তারা সাপ বিক্রি, সাপের খেলা দেখানো, হাতুড়ে চিকিৎসাÑ এসব করে জীবন চালায়। তারা জানায়, অবজ্ঞা, অনাহারে, অর্ধাহারে তাদের জীবন কাটছে। শিক্ষা, বাসস্থান, পরিমিত খাদ্যের সাথে পাচ্ছে না সঠিক চিকিৎসার সুযোগও।
সাভার বেদে পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, ঝুড়ি খুলে বিনে ফুঁ দিলেন এক যুবক। সাথে সাথে ফণা তুলে ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে এলো কালো কেউটে। ঝুড়ির সামনেই বসে তখন কচি হাতে সাপ পেঁচিয়ে মুখে পোরার চেষ্টা করছে একটি শিশু। এরপর সাপের চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি বসে কথা বলতে শুরু করে। মনে হয় যেন সাপের সাথেই তার আত্মার বন্ধন।

সাপুড়ে সর্দার জানান, ঝাড়ফুঁক, ব্যথা নিরাময়ের জন্য সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলানো আর সাপের খেলা দেখিয়ে যে আয় হয় তা দিয়েই সংসার চালান তারা। পেটে খাদ্যের জোগান দিতে গিয়ে অনেক সময় নির্মম ঘটনাও ঘটে। সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে সাপের ছোবলে অনেকের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে শিশুরাই বেশি। জীবন-জীবিকার তাগিতে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও সাপের ফণার নিচে শিশুদের ছেড়ে দেন তারা। কারণ যারা সাপের খেলা দেখতে আসেন তারা সাপের সাথে শিশুদের কসরতেই বেশি আনন্দ পান। তাতে টাকাও বেশি দেন। এই নির্মমতার বাইরেও সাপের সাথে বেদে সম্প্রদায়ের আরো চমকদার অনেক গল্প রয়েছে। একজন জানান, পুরুষ বশে রাখতে তারা শরীরে সাপের চর্বি দিয়ে তৈরি তেল ব্যবহার করে স্বামীর শরীরে তা নিয়মিত মালিশও করেন।
বেদেদের অভিযোগÑ এখন আগের মতো মানুষ সাপের খেলা দেখে আর আনন্দ পায় না। তাই বেদেদের ঐতিহ্যগত পেশায় ধস নেমেছে। অভাবে অনেকের সংসারও ভাঙছে। তাই এ পেশার পবিরর্তন চায় তারা। এরই মধ্যে কিছুটা পরিবর্তনও এসেছে। গড়ে উঠেছে স্কুল, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বুটিক হাউজসহ নানা প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার নারী-পুরুষের। পূর্ব পুরুষের পেশা ছেড়ে তারা এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।

 


আরো সংবাদ