২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আবু বক্করের গলায় কালো দাগ মাথা ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন

জড়িতদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল বিএফডিসি
-

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা হেফাজতে মারা যাওয়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিকের (৪৫) গলায় কালো দাগ, মাথা ও পায়ে রয়েছে আঘাতের চিহ্নহ্ন। লাশের পোস্টমর্টেমে মিলেছে এসব আলামত।
গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে আবু বক্কর সিদ্দিকের লাশের পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়। ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা: সোহেল মাহমুদ পোস্টমর্টেমের নেতৃত্ব দেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, লাশের পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়েছে। গলায় কালো দাগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার মাথায় ও পায়ে আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে। তবে কী কারণে আবু বক্কর সিদ্দিকের মৃত্যু হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, আমরা লাশ থেকে আলামত সংগ্রহ করে ঢামেকের হিস্টোপ্যাথলজি বিভাগে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে রিপোর্ট এলে পূর্ণাঙ্গ পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জমা দেয়া হবে।
এ দিকে থানা হেফাজতে আবু বক্কর সিদ্দিকের মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল বিএফডিসি। শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আলী আজমসহ জড়িত অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন তার সহকর্মীরা। গতকাল সকালে বিএফডিসির সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন সহকর্মীরা। এ সময় তারা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসির ফাঁসি চাই বলে স্লোগান দেন। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিএফডিসির সড়ক অবরোধ করে রাখেন সহকর্মীরা। পরবর্তীতে পুলিশের আশ্বাসে তারা সড়ক ছেড়ে দেন। এ সময় ফ্লোর সেটিং ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম বলেন, থানায় মানুষ নিরাপদে থাকে। সেখানে কিভাবে আবু বক্কর মারা গেল? সুস্থ মানুষকে মোটরসাইকেল থেকে গ্রেফতার করল। থানা থেকে তাকে লাশ হয়ে বের হতে হলো। থানা হেফাজতে এই মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। জুনিয়র ক্যামেরা সহকারী মোতালেব হোসেন বলেন, আমরা ওসির বিচার চাই। কেন এমন ঘটনা ঘটল, আমরা তা জানতে চাই। বিএফডিসির তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়নের নেত্রী ফিরোজা বেগম বলেন, আবু বক্করকে গ্রেফতার করা হলো শনিবার। তখনো তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। মামলা হয়েছে রোববার। মামলা হওয়ার আগেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে। জানালার গ্রিলের সাথে কেউ চাদর দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। তার শরীরে দাগ, গলায় চিকন দাগ, চাদর দিয়ে আত্মহত্যা করলে তার গলায় মোটা দাগ থাকবে। তিনি আরো বলেন, আবু বক্কর সরকারি কর্মকর্তা। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেওড়াপাড়ার একটি কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, এমন চিঠিও আসে। তার সাথে পুলিশ এমন আচরণ করল কিভাবে? আমরা এর বিচার চাই।
থানা হেফাজতে আসামির মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না পুলিশ
এ দিকে গ্রেফতারকৃত আসামির থানা হেফাজতে মৃত্যুর দায় পুলিশ এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। গতকাল ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ফুল দেয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি। এ সময় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন পুলিশ দাবি করেছে আবু বক্কর সিদ্দিক গলায় চাদর পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, থানায় এত নিরাপত্তার মধ্যে কিভাবে তিনি আত্মহত্যা করলেন? সার্বক্ষণিক হাজতখানার সামনে পুলিশ থাকে, সিসি ক্যামেরা রয়েছে। তার পরও থানা পুলিশের নজরে পড়ল না কেন? জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, রোববার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামির মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ মৃত্যু আত্মহত্যা বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গত রোববার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার হাজতখানায় মারা যান বিএফডিসির ফ্লোর ইনচার্জ আবু বক্কর সিদ্দিক। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি আত্মহত্যা। পুলিশের দাবি, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়া এবং ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে এক নারী মামলা করার পর শনিবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। ওই রাতেই থানা হাজতে গলায় ফাঁস দিয়ে আবু বক্কর আত্মহত্যা করেছেন’ বলে দাবি করে পুলিশ। তবে আবু বক্করের পরিবারের দাবি, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শরিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এক নারী বাদি হয়ে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তাকে গ্রেফতার করে হাজতে আনলে তিনি আত্মহত্যা করেন। আমাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ আছে বলে দাবি করেন তিনি।
নিহত আবু বক্কর সিদ্দিকের পারিবারিক সূত্র জানায়, আবু বক্করের দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। স্ত্রী আলেয়ার সাথে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে থাকতেন। সন্তানরা মায়ের কাছেও থাকত। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বালিয়াকান্দি গ্রামে। তার বাবার নাম নুরুল ইসলাম। গতকাল বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পোসটমর্টেম শেষে আবু বক্করের লাশ দাফনের জন্য নোয়াখালীতে নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায় পারিবারিক সূত্র।


আরো সংবাদ