২১ আগস্ট ২০১৯

পাউডার দুধে ক্ষতিকর উপাদান আছে কিনা খতিয়ে দেখতে বলল হাইকোর্ট

পাউডার দুধে ক্ষতিকর উপাদান আছে কিনা খতিয়ে দেখতে বলল হাইকোর্ট - ছবি : সংগ্রহ

দেশের দুগ্ধজাত কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে যাক এটা আমরা চাই না। বাইরে দেশের কোম্পানি এখানে গেড়ে বসুক সেটাও আমরা চাই না। আমরা চাই দেশেই নিরাপদ দুধ উৎপাদিত হোক- এমন মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।
সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

এসময় আদালত বলেন, পাউডার দুধে কোনো ক্ষতিকর উপাদান আছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। দুধে ভেজাল, গোখাদ্যসহ সমস্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়ার জন্য ২০ অক্টোবর আদেশ দিবেন হাইকোর্ট।

এর আগে রোববার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান থাকায় বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত ১৪ কোম্পানির পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন ও বিতরণ পাঁচ সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সাথে বাজারে থাকা এসব দুধ কেনা ও খাওয়ার ক্ষেত্রে জনসাধারণকে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বাজারে থাকা পাস্তুরিত দুধের নমুনা চারটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরীক্ষা করার পর সেইসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গতকাল রোববার বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো: ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

মিল্কভিটাসহ ১৪টি প্রতিষ্ঠানই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন ও বিক্রি করে আসছিল। হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে এই পাঁচ সপ্তাহ দেশে বৈধভাবে পাস্তুরিত দুধ বিক্রির কোনো সুযোগ থাকল না।
যে ১৪টি কোম্পানির দুধ উৎপাদন বন্ধ করা হলো : আফতাব মিল্ক অ্যান্ড মিল্ক প্রোডাক্ট লিমিটেডের আফতাব মিল্ক, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের ফার্মফ্রেশ মিল্ক, আমেরিকান ডেইরি লিমিটেডের ‘মো’, বাংলাদেশ মিল্ক প্রডিউসারস কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেডের মিল্ক ভিটা, বারো আউলিয়া ডেইরি মিল্ক অ্যান্ড ফুডস লিমিটেডের ডেইরি ফ্রেশ, ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রজেক্টের আড়ং ডেইরি, ড্যানিশ ডেইরি ফার্ম লিমিটেডের আয়রান, ইছামতি ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের পিউরা, ইগলু ডেইরি লিমিটেডের ঈগলু, প্রাণ ডেইরি লিমিটেডের প্রাণ মিল্ক, উত্তরবঙ্গ ডেইরির মিল্ক ফ্রেশ, শিলাইদহ ডেইরির আল্ট্রা, পূর্ব বাংলা ডেইরি ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের আরোয়া এবং তানিয়া ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের সেইফ।
আদালতে বিএসটিআইয়ের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার সরকার এম আর হাসান। রিটের পক্ষে ছিলেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক ও আইনজীবী মো: তানভীর আহমেদ।

আদেশের পর ব্যারিস্টার অনীক আর হক সাংবাদিকদের বলেন, ১৪টি ব্র্যান্ডের দুধের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যদিও আমাদের কৃষিখাদ্য, মৎস্যখাদ্য আইনে গবাদিপশু বা যেকোনো পশুর ওপরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু তাদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। একই সাথে বিসিএসআইআর ও আণবিক শক্তি কমিশনের ল্যাবের যে রেজাল্ট, সেখানে দুধের মধ্যে হেভি মেটাল, স্পেশালি লেড অর্থাৎ সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে আদালত আজকে স্বতপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল ইস্যু করেছেন যে দুধে এসব ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং রাইট টু লাইফের পরিপন্থী হিসেবে ঘোষণা করা হবে না এবং স্বতপ্রণোদিত হয়ে এ রুলের সাথে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী পাঁচ সপ্তাহের জন্য এই ১৪টি লাইসেন্সধারী কোম্পানির দুধের প্রোডাকশন, বিপণন, বাজারজাতকরণ এবং এর সাথে সাথে সাধারণ ক্রেতারা যেন না খান, সে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তাদের বারিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ সপ্তাহ তারা এগুলো উৎপাদন, বিপণন করতে পারবে না।

তিনি আরো বলেন, এর সাথে সাথে বিএসটিআইকে বলা হয়েছে তাদের যে মানদণ্ড রয়েছে সেটাকে আপডেট করার ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানানোর জন্য। রুলে ১৪ কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদি করা হয়েছে। আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য ২৫ আগস্ট দিন ধার্য রেখেছেন।
গত ১৪ জুলাই এক আদেশে বিএসটিআইয়ের লাইসেন্সধারী সব ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না তা এক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা করতে চারটি ল্যাবকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। চারটি ল্যাব হলো ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ 
রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও সাভারের বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাগার। এরপর চার সংস্থার প্রতিবেদন হাতে পায় বিএসটিআই। এগুলো আদালতে জমা দেয় বিএসটিআই।
এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তৈরি করা (বিসিএসআইআর ও পরমাণু শক্তি কমিশনের ল্যাবে পরীক্ষা করা) ১১ কোম্পানির দুধ পরীক্ষার প্রতিবেদনও আদালতে দেয়া হয়। একই সাথে উপস্থাপন করা হয় ঢাবি অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের প্রতিবেদনও।

গত বছরের ১৬ মে বাণিজ্যিকভাবে পাস্তুরিত দুধ সম্পর্কে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) একটি গবেষণা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই সব প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মো: তানভীর আহমেদ। 

এই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২১ মে এক আদেশে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কমিটি গঠন করে বাজারে থাকা পাস্তুরিত দুধ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসচিব এবং বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ আদেশের পর গত ২৫ জুন বিএসটিআইয়ের আইনজীবী আদালতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। কিন্তু কোনো শুনানির আগেই সেদিন তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।
১৪টি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধে আশঙ্কাজনক বা ক্ষতিকর কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) দেয়া প্রতিবেদনে আদালত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যমে সংস্থাটির আইনজীবীর দেয়া এমন বক্তব্যে হাইকোর্ট ৯ জুলাই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ওই দিন আদালতের আদেশ ছাড়া দুধ নিয়ে কোনো প্রকার বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিজ্ঞাপন প্রচার না করতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন আদালত।

এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক গত ২৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি লেকচার থিয়েটারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কিছু খাদ্যের গুণগতমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। এরপর দ্বিতীয় দফা পরীক্ষায়ও পাস্তুরিত দুধের ১০ নমুনার সব ক’টিতে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে বলে ১৩ জুলাই এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেন ঢাবির বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। তার এ প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এরপর চারটি ল্যাবে পরীক্ষার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

 


আরো সংবাদ