০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সেদিন শুধু আমিই নুসরাতের পক্ষে ছিলাম : ওসি মোয়াজ্জেম

সেদিন শুধু আমিই নুসরাতের পক্ষে ছিলাম : ওসি মোয়াজ্জেম - ছবি : সংগৃহীত

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সেই সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন আদালতে কান্না করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

বৃহস্পতিবার সাইবার ট্রাইব্যুনালের (বাংলাদেশ) বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি এ দাবি করেন। আত্মপক্ষ সমর্থন শেষে আদালত আগামী ২০ নভেম্বর এ মামলার যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করেন।

এদিন (বৃহস্পতিবার) দুপুর আড়াইটার দিকে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি শুরু হয়। এ সময় ওসি মোয়াজ্জেম আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম শুনানির শুরুতে ওসি মোয়াজ্জেমের উদ্দেশে তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন এবং বাদীসহ ১১ জনের সাক্ষ্যে অভিযোগ পড়ে শুনিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি দোষী না নির্দোষ? জবাবে ওসি মোয়াজ্জেম নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন। এরপর বিচারক ওসি মোয়াজ্জেমের কিছু বলার আছে কিনা এবং সাফাই সাক্ষ্য দেবেন কিনা তা জানাতে চান।

জবাবে ওসি জানান, সাফাই সাক্ষ্য দেবেন না। তবে নিজে লিখিত বক্তব্য দেবেন। লিখিত বক্তব্যের কিছু তিনি মৌখিকভাবে বলতে বিচারক অনুমতি প্রদান করেন। অনুমতি দিলে তিনি মৌখিক বক্তব্য শুরু করেন।

ওসি মেয়াজ্জেম আদালতকে জানান, ১৯৯১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার চাকরি হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার আসার পর নিয়োগ স্থগিত করে দেয়। যা নিয়ে তিনি রিট করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে চাকরি ফিরে পান। চাকরি জীবনে তিনি অনেক চাঞ্চল্যকর টপ টেরর আসামি ধরেছেন। সুনামের সঙ্গে কাজ করায় ২০০ পুরস্কার পেয়েছেন। গত বছর দুই বার চিটাগং বিভাগে তিনি বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর আমি সোনাগাজী থানার ওসি হিসেবে যোগদান করি। আমার চাকরিকালীন সময়ে প্রিন্সিপাল সিরাজ সম্পর্কে বিভিন্ন অভিযোগ শুনেছি। কিন্তু থানায় কেউ অভিযোগ করতে আসেনি। গত ২৮ এপ্রিল মাদ্রাসায় গেঞ্জামের কথা শুনে পুলিশ পাঠাই। ওই এলাকার লোক ধর্মান্ধ। কোনো হুজুরের বিরুদ্ধে কিছু বলার উপায় নেই। আমার থানায় তখন কোনো নারী অফিসার ছিল না। তাই আমি মেয়র, আমার অফিসার ও মাদ্রাসার লোকসহ সবার সামনে নুসরাতকে জিজ্ঞাসা করি। সেখানে নুসরাতের দুই বান্ধবী ও মাদ্রাসার কর্মচারী নুরুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদেরও ভিডিও করেছি। আমি নুসরাতকে বলেছি, তুমি আমার মেয়ের মতো। আমার প্রমাণের প্রয়োজন। তাই জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও করি। প্রমাণ পেয়ে মামলা নিয়ে প্রিন্সিপালকে আটক করি।

পরদিন ২৮ মার্চ হাজার খানেক লোক প্রিন্সিপালের মুক্তির জন্য মানববন্ধন করে। সেদিন কয়েজন সাংবাদিক আমার কাছে জানতে চান, কেন নির্দোষ সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেফতার করেছি। সেদিন তাদের আমি ভিডিওটি প্রমাণ হিসেবে দেখাই। সে সময় সবাই নুসরাতের বিপক্ষে। সেদিন শুধু আমিই নুসরাতের পক্ষে ছিলাম। জিজ্ঞাসাবাদের দিন আমি নুসরাতের মাকে আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছি, কেউ ডিস্টার্ব করলে আমাকে ফোন দিতে। মাদ্রাসায় পরীক্ষার দিন ২ জন পুলিশ মাদ্রাসার গেটে ডিউটিতে ছিল। খবর পাই মাদ্রাসার একজন ছাত্রী গায়ে আগুন দিয়েছে। আমি সোনাগাজী হাসপাতালে ছুটে গিয়ে নুসরাতকে দেখতে পাই। সেখান থেকে দ্রুত ফেনী হাসপাতালে নুসরাতকে পাঠাই। সেখান থেকে আমি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকা বার্ন ইউনিটে পাঠাই। শাহবাগ থানার ওসিকে ফোন করে বলে দেই, ঠিকমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। আগুন লাগানোর দিনই আমি ঘটনাস্থলে যাই।

গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ জন আসামিকে গ্রেফতার করি। ওইদিন সাংবাদিক সজল আমার সঙ্গে থানায় আসে। আমি মোবাইল টেবিলে রেখে নামাজ পড়তে গেলে সে ওই সুযোগে শেয়ারইটের মাধ্যমে ভিডিওটি নিজের মোবাইলে চুরি করে নিয়ে নেয়।

গত ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যাওয়ার পর আমি মাটি দিতেও আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার ঊর্ধ্বতন অফিসাররা আসতে নিষেধ করায় আসিনি।

১২ এপ্রিল ভিডিওটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আমার নজরে আসে। আমি গত ১৪ এপ্রিল ভিডিও চুরি হওয়া নিয়ে থানায় জিডি করি। এরপর গত ১৫ এপ্রিল বাদী আমার বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। আমি ভিডিওটি করেছি শুধু প্রমাণ রেখে সিরাজউদ্দৌলাকে আটকের জন্য।

এরপর বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, আপনার সময়কালে কয়টা নারী ও শিশু মামলা তদন্তাধীন ছিল। জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, ২-৩টা হতে পারে। তারপর বিচারক প্রশ্ন করেন, মোট কয়টা মামলা তদন্তাধীন ছিল। জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, মামলার অর্ধেকের বেশি মাদকের মামলা। আর বাকিগুলো রাজনৈতিক মামলা।

এরপর মেয়াজ্জেম আরও বলেন, আমি শুধু ৯ জনকে গ্রেফতার করিনি। গত ৬ এপ্রিল নুসরাতের ডাইং ডিক্লারেশন গ্রহণের ব্যবস্থা করি। কিন্তু বাদী আমার বিরুদ্ধে শুধু মামলাই করেছে। তিনি নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচারের জন্য কোনো ভূমিকা রাখেননি। উনি (বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন) আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের একটি পোস্ট হোল্ড করেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার জন্য শুধু রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবানের উদ্দেশ্যে এ মামলা করেছেন। আমি এ মামলার মাধ্যমে বড় সাজা পেয়েই গেছি। আমার ছেলে স্কুলে যেতে পারে না। আমার মেয়ে এবং তার মা শয্যাশায়ী। আমার পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি ১০টি খুন করলেও এমন সাজা হয়তো আমার হতো না। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আমি এতই ঘৃণিত হয়ে গেছি যে, রংপুরে আমাকে ক্লোজ করার পর আমার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানোয় এমনটা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ মামলার আইও (তদন্ত কর্মকর্তা) আমাকে ডাকলে আমি তাকে তদন্তে সহযোগিতা করেছি। আমি বলতে পারতাম মোবাইল হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমি তা করিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আইও সঠিকভাবে তদন্ত করেননি।

এরপর বিচারক প্রশ্ন করেন যে, কোনো মামলা দায়ের বা তদন্তের জন্য বাদী বা সাক্ষীর বক্তব্য ভিডিও রেকর্ড করার আইনগত আবশ্যকতা আছে কিনা? জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, আইনগত আবশ্যকতা নেই। তবে প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ায় এখন প্রত্যেক থানায়ই এমন কাজ করে। তা শুধু আদালত চাইলেই দেখানো হয়। পাবলিশ (প্রকাশ) হয় না।

মোয়াজ্জেম আরও বলেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আল্লাহর ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। আপনার (বিচারক) কাছেও আমি ন্যায়বিচার চাই।

আদালত সূত্র জানায়, গত ১৭ জুলাই আসামি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতের চার্জ (অভিযোগ) গঠনের মাধ্যমে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। এরপর গত ২১ জুলাই এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

এর আগে গত ১৭ জুন মোয়াজ্জেম হোসেনের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এরও আগে ১৬ জুন হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেফতার হন তিনি।

গত ২৭ মে তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। ওই দিনই আদালত তা আমলে নিয়ে আসামি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিমা সুলতানার দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ মার্চ দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন তার ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহার করে নুসরাত জাহান রাফির ভিডিও ধারণ, প্রচার ও তা ভাইরাল করেছেন। ওসি মোয়োজ্জেম হোসেন সু-শৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়েও নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানির ঘটনার বক্তব্য ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। যার ফলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

আইনবহির্ভূতভাবে নুসরাত জাহান রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার ভিডিও প্রচারের অভিযোগে গত ১৫ এপ্রিল সাইবার ট্রাইব্যুনালে এ মামলাটি দায়ের করা হয়। সুপ্রিমকোর্টের আলোচিত আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।


আরো সংবাদ