২৪ জানুয়ারি ২০২০
১১ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যা ৩৬২, গুম ১৩ জন

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে : আসক

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে : আসক - ছবি : সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন, মত প্রকাশ ও মুক্ত চিন্তার ওপর আঘাত, নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলছে অভিযোগ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

তারা তাদের কাছে সংগৃহীত পরিসংখ্যানের তথ্য তুলে ধরে জানায়, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩৬২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে যা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার রাজধানীতে লালমাটিয়ার মূল সড়কে এক মানববন্ধনে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন শিপা হাফিজ নিপু, নীনা গোস্বামী। এতে অভিযোগ করা হয় কার্যকর জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা প্রভৃতি জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্র আরো বেশি প্রসারিত করছে।

এতে আরো জানান হয়, এ বছর এখন পর্যন্ত ১৩ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যার মধ্যে ৪ জন ফিরে এসেছে আর একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এসবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা এবং এর ধরণ চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। গত এগারো মাসে ১হাজার ৩৫১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ৯৪০ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে। ৪৪৩ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে এবং ৬৮২ জন শিশু নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এসব ঘটনাসমূহের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের অভাব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে দুরূহ করছে এবং দুর্বৃত্তদের আরো বেশি বেপরোয়া করে তুলছে। গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বেও বহুল সমালোচিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অনুরূপ ধারা রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুমোদন করা হয়েছে। ফলে তথ্য ও যোগাযোগ আইনের ৫৭ ধারার অপব্যবহার রোধ হয়নি বরং আরো নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বলা হয় জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার সর্বোপরি মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকার সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাসমূহ জনগণের মানবাধিকার সুরক্ষায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে।

আজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের প্রাক্কালে জনগণের মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নিম্নোক্ত দাবি জানিয়ে একর্মসূচিতে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়।

বলা হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা যেকোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যেমন- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, দায়িত্বে অবহেলা ইত্যাদির অভিযোগ উঠলে তা দ্রুততার সাথে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং সম্পৃক্তদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শাস্তি প্রদান করতে হবে। এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে আটক বা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে। নাগরিকদের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার যাতে খর্ব না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের ভয়ভীতি কিংবা প্রতিহিংসার শিকার হওয়া ছাড়াই নাগরিকরা যাতে এ অধিকারসমূহ চর্চা করতে পারে সে পরিবেশ তৈরীর ওপর জোর দিতে হবে। গণমাধ্যম ও নাগরিকদের মত প্রকাশের অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা বন্ধে কার্যকর সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

নারীর প্রতি সকল বৈষম্য নিরসন সংক্রান্ত সনদের ধারা ২ এবং ১৬ (গ) থেকে আপত্তি প্রত্যাহার করা হবে। প্রতিবন্ধী, ইনডিজিনিয়াস, দলিত, তৃতীয় লিঙ্গ, অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের পূর্ণ চর্চা নিশ্চিত এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিজ বিশ্বাস ও রীতি চর্চার অধিকার ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


আরো সংবাদ