১৯ মে ২০১৯

হোয়াটসআপে ইরানের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি!

হোয়াটআপে ইরানের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি! - ছবি : সংগ্রহ

ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে আলাদা। মনে হবে যেন একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সম্পর্ক নেই।

হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকিং। সৌদি আরবের তেল ট্যাংকারে অন্তর্ঘাতমূলক হামলা। মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রচেষ্টা। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা।

কিন্তু এমনকি হতে পারে যে এই প্রত্যেকটি ঘটনা আসলে এক সূত্রে গাঁথা?

বিবিসির ওয়াশিংটন ব্যুরো চিফ পল ডানাহারের ধারণা তাই। কীভাবে, সেটি তিনি ব্যাখ্যা করেছেন নিচের লেখায় :

সব কিছুর মূলে রয়েছে আসলে ইসরাইল, সৌদি আরব আর ইরানের দ্বন্দ্ব।

বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী একটি জায়গায় আলাদা। ইসরায়েলে যত রকমের শিল্প উদ্যোগ, তার আসল মেরুদণ্ড হচ্ছে সামরিক বাহিনী।

ইসরাইলে ১৮ বছর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব নাগরিককে (আরবরা ছাড়া) বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হয়।

বলা যেতে পারে ইসরাইলি তরুণদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে সামরিক বাহিনীর ন্যাশনাল সার্ভিসে যোগ দিয়ে। এই সময় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তার প্রভাব থেকে যায় তাদের সারাটি জীবনে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটি।

সফটওয়্যার?
ইংরেজীতে যাকে বলে 'ওল্ড বয় নেটওয়ার্ক', অর্থাৎ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুরা যখন পরবর্তী জীবনে প্রভাবশালী হয়ে উঠে, তখন তারা যেভাবে একে অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টা করে যার যার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে।

ন্যাশনাল সার্ভিসের সময় সব ইসরায়েলি তরুণের মেধা যাচাই করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। দেখে কার প্রতিভা কিসে। এরপর তাদেরকে সেসব ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়।

যাদের প্রতিভা কম্পিউটারে, তারা যদি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নজরে না পড়ত, তাহলে হয়তো নিজের ঘরে বসেই কিছু একটা করার চেষ্টা করতো। কিন্তু সামরিক বাহিনী তাদের কাজে লাগায় সাইবার যুদ্ধের কাজে।

এরা যখন সামরিক বাহিনী ছাড়ে, তাদের অভিজ্ঞতা আর দক্ষতাই শুধু সাথে নিয়ে যায় না। যে সম্পর্ক তাদের গড়ে ওঠে, সেগুলোও কিন্তু বাকী জীবন বজায় রাখে।

এনএস্ও নামের যে কোম্পানিটি হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকিংয়ের পেছনে, তারা এর বড় উদাহরণ। এনএসও মূলত সাইবার যুদ্ধ চালানোর জন্য নানা ধরণের সফটওয়্যার তৈরি করে।

এই কোম্পানি নানা রকম হ্যাকিং-এর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। মূলত অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষ্যে তৈরি করা তাদের হ্যাকিং প্রযুক্তি। এরপর এগুলো বিক্রি করে বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে।

তবে এখানে একটা 'কিন্তু' আছে। তারা তখনই কেবল বিদেশে তাদের এই প্রযুক্তি বিক্রি করতে পারবে, যদি এতে ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থের কোন ক্ষতি না হয়।

এর ফলে অতীতে ইরান বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে কোনো ইসরাইলি প্রযুক্তি বিক্রি করা যেতো না।

কারণ এরা সবাই ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামে সমর্থন দেয়।

তবে আরব বসন্তের পর একমাত্র কাতার ছাড়া আর সব উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

এর পরিবর্তে তারা এখন ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষ নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর। তার প্রশাসনে অনেক কট্টর ইরান বিরোধী লোককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন।

এরকম জল্পনা রয়েছে যে ইসরাইল এখন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার জন্য এসব দেশে এনএসও-কে তাদের সফ্টওয়্যার বিক্রির অনুমতি দিয়েছে।

এই জল্পনার ভিত্তি কী? হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিং সফ্টওয়্যার যাদেরকে টার্গেট করেছে তাদের মধ্যে আছেন এমন কয়েকজন মানবাধিকার আইনজীবী, যারা সৌদি আরব এবং কাতারে সরকার বিরোধী ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের হয়ে মামলা লড়ছিলেন। এটি মোটেই কাকতালীয় ব্যাপার নয়।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখাতে চান। এ কারণে মিস্টার নেতানিয়াহু ইরানকে ঠেকানোর জন্য তার চেষ্টাকে এত বেশি গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে সৌদি আরবের শাসকদের কাছে তাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি দুটি। একটি হচ্ছে ইরান। আরেকটি মুসলিম ব্রাদারহুড। ইরানকে নিয়ে তাদের এত ভয় পাওয়ার কারণ : ইরানের সামরিক শক্তি।

আর মুসলিম ব্রাদারহুডকে ভয় পাবার কারণ : এরা এমন এক রাজনৈতিক ইসলামের কথা বলে, যেটি সৌদি রাজপরিবারের বংশানুক্রমিক শাসনের অবসান ঘটাতে পারে।

অপরদিকে ট্রাম্প প্রশাসনে এখন এমন সব লোকজনের প্রভাব, যারা সবাই ইরানকে ঘৃণা করে।

ইসরাইল-সৌদি আরব- যুক্তরাষ্ট্র। এই তিন শক্তি মিলে তাই তৈরি হয়েছে এক নতুন অক্ষ।

ইরানের বিরুদ্ধে তারা একে অপরকে সাহায্য করতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে।

তাদের মধ্যে এ নিয়ে নানা ধরণের লেন-দেন হচ্ছে।

এর মধ্যে অস্ত্র বিক্রি, তেল আর গ্যাসের দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে অনেক রাজনৈতিক বিষয় রয়েছে। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে খুশি করার জন্য ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করছে।

ইরাক আক্রমণ করার আগের সময়টাতে যা ঘটেছিল, তারই যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ইরানের বিরুদ্ধে যে কোন গোয়েন্দা তথ্য, সেটি যাই হোক, তা এখন ব্যবহার করা হবে একটা যুক্তি খাড়া করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কাজে।

আমরা যারা ইরাক যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব দেখেছি, তাদের কাছে এই পরিবেশটা খুবই পরিচিত।

তবে পার্থক্য কেবল একটা জায়গায়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ - যিনি এরকম একটি আদর্শগত বিশ্বাস দিয়ে পরিচালিত হতেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব তার কাঁধে বর্তেছে। এবং সাদ্দাম হোসেনকে ইরাকের ক্ষমতা থেকে সরানোটা সেই দায়িত্বের অংশ।

তবে হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাসিন্দা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত আদর্শগত ঝোঁক নেই। আসলে একেবারেই নেই।

ট্রাম্পের শাসনামলের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী রাজনৈতিক লেন-দেন। তার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান তত্ত্ব হচ্ছে, 'আমেরিকা ফার্স্ট' অর্থাৎ আমেরিকার স্বার্থ সবার আগে।

এমন সম্ভাবনা কম যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে জড়াবেন, বিশেষ করে ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে। যদি না তাকে কেউ ভীষণভাবে উস্কে দেয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার উস্কানি দেয়ার জন্য মারাত্মক কিছু বাজে কাজের দায় ইরানের ওপর চাপাতে হবে। এটি ভালোভাবে করতে দরকার প্রচুর গোয়েন্দা তথ্য।

আর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে সব মিত্রদেশ মিলে ঐ অঞ্চলে যত বেশি লোকের ওপর সম্ভব গোয়েন্দাগিরি চালানো।

আর গোয়েন্দাগিরির জন্য সবচেয়ে ভালো টার্গেট তো হচ্ছে স্মার্টফোন, যেটি আমরা সবসময় ব্যবহার করি।

ট্রোজান হর্সের মতো এর মধ্যে ঢুকতে পারলেই জানা যাবে সবকিছু।
সূত্র : বিবিসি

 


আরো সংবাদ