১৯ নভেম্বর ২০১৯

আইএস সদস্যের ঔরসে জন্ম নেয়া সন্তানকে নিয়ে টানাপোড়নে ইয়াজিদি নারী

আইএস সদস্যের ঔরসে জন্ম নেয়া শিশুকে টানাপোড়েনে নিয়ে ইয়াজিদি নারী - বিবিসি

‘অ্যাডামের ছিল সোনালী চুল ও সবুজ চোখ। দেখতে সে তার অন্য ভাই বোনদের চেয়ে আলাদা ছিল। তার প্রথম কান্নার আওয়াজ শোনার পর থেকেই আমি তাকে ভালবেসে ফেলি,’ বলেন তার মা জোভান। কিন্তু অ্যাডামের পিতা আইএস সদস্য আবু মুহাজিরের হাতেই বন্দী ছিল তার মা ইয়াজিদি নারী জোভান। তাদের ঘরে জন্ম হয় অ্যাডামের।

যুদ্ধে আবু মুজাহির মারা গেলে জোভান তার নবজাতককে নিয়ে ফিরতে চাইলেন নিজের সংসারে। কিন্তু পারলেন না। পরিবার ও সমাজের চাপে অ্যাডামকে হারালেন জোভান। হারালেন তার আগের সংসারও।

আগের জীবন

জোভান তার স্বামী খেদরের সাথে একটি গ্রামে বসবাস করতেন। এই গ্রামেই তিনি বড় হয়েছেন। তার স্বামী ও সংসার নিয়ে তিনি খুব সুখেই ছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করেই তার জীবন আমূল বদলে যায়। সময়টা ছিল ২০১৪ সালের আগস্ট মাস। কালো পতাকা উড়িয়ে দুটো গাড়ি সেদিন তাদের গ্রামে এসে পৌঁছালো। জোভান ও খেদর বুঝতে পারছিলো না গ্রামে কী হচ্ছে কিন্তু ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল যে তাদের সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। গাড়িতে করে যে লোকগুলো এসেছিল তারা ইসলামিক স্টেটের সদস্য।

এই গ্রুপের কোন কোন মুখ তাদের পরিচিত ছিল। তাদের কেউ কেউ পাশের গ্রামের ছেলে যাদেরকে তার স্বামী খেদর চিনতেন। তারা তখন তাদের জোর করে একটি গাড়িতে তুলে সিঞ্জার উপত্যকায় নিয়ে যায়। তাদের সাথে ছিল আরো ২০টির মতো পরিবার। পরে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকের রাজধানী বাগদাদের কাছের একটি শহরে। এর পাঁচ মাস পর আই এস জঙ্গিরা তাদেরকে নিয়ে যায় জোভান ও খেদরের গ্রামের কাছে মসুল শহরে।

সেসময় ওই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তখন আই এসের ওই গ্রুপের নেতা খেদরকে বলেন তাদেরকে বুঝিয়ে গ্রামে ফিরিয়ে আনতে।‘আমরা সবাইকে বলেছিলাম যে তাদের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু কেউ একথা বিশ্বাস করেনি,’ বলেন খেদর।গ্রামবাসীরা জানতো আইএস যোদ্ধারা যেসব পুরুষকে তুলে নিয়ে যেত তারা যদি কোন কাজের না হয় তাহলে তাদের মেরে ফেলা হয়।খেদর ও তার স্ত্রী জোভানের মতো ইয়াজিদিদের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না।যারা মাউন্ট সিঞ্জারে পালিয়ে গিয়েছিল তারা সেখানে আটকা পড়ে গেল। তাদের ছিল না খাবার পানি। ছিল প্রচণ্ড গরম। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শত শত মানুষ মারাও গিয়েছিল।

অপহরণ

কিন্তু যারা পাহাড়ে যায়নি তাদেরকে ধরে নিয়ে গেল আইএস। সেসব পরিবারের সদস্যরা ছিটকে পড়লো এদিকে সেদিকে। ছেলেদের পাঠিয়ে দেয়া হলো জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। আর নারীদের নিয়ে যাওয়া হলো যৌন-দাসী হিসেবে। আর যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি হলো না তাদের হত্যা করা হলো।

আইএস ঠিক কতজন ইয়াজিদিকে অপহরণ করেছে তার কোন হিসেব নেই কারো কাছে। তবে জাতিসংঘের এক হিসেবে বলা হচ্ছে, সেসময় সিঞ্জারে চার লাখ ইয়াজিদি বসবাস করতো। তাদের মধ্যে কয়েক হাজারকে হত্যা করা হয় এবং সাড়ে ছয় হাজারের মতো ইয়াজিদিকে দাস বানিয়ে তাদের ধর্ষণ করা হয়, নির্যাতন চালানো হয় এবং তাদের অনেককে বিক্রি করে দেয়া হায়।

জোভানের সাথে ছিল তার তিনটি সন্তান। তাদের একটি লরির পেছনে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় আইএস খেলাফতের তথাকথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা শহরে। পরের চার বছর জোভানের সাথে তার স্বামী খেদরের আর দেখা হয়নি।

জোভান ও তার সন্তানদের রাখা হয় একটি তিনতলা বাড়িতে। সেখানে ছিল আরো দেড় হাজারের মতো নারী ও শিশু। তাদের অনেকেই জোভানের পরিচিত ছিল।

নতুন জীবন

এক পর্যায়ে জোভানকে বলা হলো কোন আইএস যোদ্ধার কাছে তাকে তুলে দেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তাকে দেয়া হলো আবু মুহাজির আল তিউনিসি নামের এক যোদ্ধাকে যে তিউনিসিয়ার নাগরিক ছিল। সে ছিল শীর্ষস্থানীয় একজন কমান্ডার।

জোভানকে তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করতে বলা হয়। এরপর জোভান সারা দিন ধরে শুধু কাঁদতো। তিন তিনবার পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়। প্রত্যেকবারই সে আবু মুহাজিরের হাতে ধরা পড়ে। ‘একসময় আমার আত্মহত্যা করার কথাও মনে হয়েছিল। কিন্তু সন্তানদের কথা ভেবে সেটা করতে পারিনি।’ জোভান বুঝতে পারলেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তার আর উপায় নেই।

আইএসের যে সদস্যের হাতে জোভান বন্দী ছিলেন তার সম্পর্কে তিনি খুব বেশি বলতে পারেননি। তবে তিনি বলেছেন যে আইএসের সেই যোদ্ধা তাদের সবাইকে দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ বেশিরভাগ পরিবারেই বাচ্চাদেরকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। ছেলেদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আর মেয়েদেরকে ব্যবহার করা হতো যৌন কাজে ও বাড়ির কাজের লোক হিসেবে। আবু মুহাজির তখন জোভান ও তার সন্তানদের নিয়ে রাকার একটি বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। ওই বাড়িটি ফাঁকা পড়েছিল।

জোভান জানান, আবু মুহাজির যখন রণক্ষেত্রে না গিয়ে বাড়িতে থাকতেন তখন তিনি তার বাচ্চাদের দেখাশোনা করতেন। কখনো কখনো তাদেরকে কাছে একটি পার্কে নিয়ে যেতেন খেলতে।

অ্যাডামের জন্ম

এর মধ্যেই গর্ভবতী হয়ে পড়লেন জোভান। ‘কোন ওষুধ ছিল না। আমি জানতাম না যে আমি কী করবো,’ বলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বাহিনী সেখানে প্রতিদিন বোমা ফেলতো। ইরাকি ও কুর্দি যোদ্ধারা যুদ্ধ করতো সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন এলাকায়। ঠিক তখনই আবু মুহাজির জোভানকে অন্য কোন আইএস যোদ্ধার কাছে বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন দেখলো যে জোভানের পেটে তার সন্তান বড় হচ্ছে তখন সে তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে।

গর্ভধারণের সাত মাসের মাথায় জোভান খবর পেলেন যে আবু মুহাজির এক যুদ্ধে মারা গেছে। অ্যাডামের যখন জন্ম হয় তখন রাকায় প্রতিদিন বোমা পড়তো। জোভানের বড় দুই সন্তান হাওয়া ও হাইথাম তার নতুন সন্তানের জন্ম দেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। ‘বাচ্চারা অ্যাডামকে খুব ভালবাসতো। তারা তার যত্ন নিতো। বিশেষ করে হাওয়া। সে শুধু আমার কন্যাই ছিল না, ছিল বন্ধুও। অ্যাডামকে সে-ই খাওয়াতো, ঘুম পাড়াতো।’

ঘন ঘন বোমা পড়ার কারণে জোভান তার সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে বেড়াত এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। সবসময় বিদ্যুতও থাকতো না। খাবার জোগাড় করাও ছিল খুব কঠিন। বাচ্চাদের যাতে খাবারের অভাব না হয় সেজন্যে খুব কম খেতেন জোভান। ‘অ্যাডাম ছিল চুম্বকের মতো। আমি জানতাম সে আমার আসল স্বামীর সন্তান ছিল না। ওর বাবা ছিল একজন খুনি। কিন্তু অ্যাডাম তো আমার শরীরেরই অংশ। তার দেহে বইছে আমারই রক্ত।’ 

পলায়ন

ইরাকে খেদর তার পরিবার ও বাচ্চাদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। জানতেন না নতুন এই বাচ্চাটির কথাও। এর মধ্যে ১৪ মাস পার হয়ে গেছে। এবং খেদর প্রতিদিনই তাদের হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। এক পর্যায়ে তিনি তার পরিবারের খোঁজ পেলেন। আইএসের কাছ থেকে পাচারকারী যে দলটি ইয়াজিদি নারী ও পুরুষদের কিনে নিচ্ছিল তাদের কাছ থেকেই জোভানের খোঁজ পেলেন তিনি। কিন্তু একেকটি বাচ্চার জন্যে তাকে ছ' হাজার ডলার করে পরিশোধ করতে হতো।

হাইতাম, হাওয়া এবং আজাদ তাদের পিতার সাথে একত্রিত হলেন। কিন্তু জোভানকে আরো দু' বছর রাকায় থেকে যেতে হয়। তার নতুন সন্তান অ্যাডামকে খেদর গ্রহণ করবেন কিনা সে বিষয়ে তিনি খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না।

খেদরও কয়েক মাস ধরে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। কারণ এসব বিষয়ে ইয়াজিদি সম্প্রদায় খুবই কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে থাকে। এসব নিয়মের একটি হলো কেউ যদি একবার ধর্ম ত্যাগ করে সে আর ফিরতে পারে না। কিন্তু আইএসের হাতে অপহৃত নারীদের ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ইয়াজিদি স্পিরিচুয়াল কাউন্সিল এসব নিয়ম-নীতি কিছুটা শিথিল করে। তবে আইএস উগ্রবাদীদের কারণে ইয়াজিদি কোন নারী, সন্তানের জন্ম দিলে তার কী হবে সেটা পরিষ্কার ছিল না।

ইয়াজিদি ধর্মে শুধু জন্ম গ্রহণের মাধ্যমেই এই ধর্মের অনুসারী হওয়া যায়। কেউ এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে না। ফলে, কোন সন্তানের পিতা ও মাতা- দুজনেই যদি ইয়াজিদি হন, তবেই শুধু তাকে ইয়াজিদি হিসেবে গ্রহণ করা হবে।

জোভান তখন এমন ইয়াজিদি নারীদের সাথে বসবাস করতেন যাদের আইএস সদস্যরা একসময় বন্দী করে রেখেছিল এবং ওই উগ্রবাদীরা যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে। তাদের সবাই সামাজিক কারণে সিঞ্জার গ্রামে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ তাদের কারো কারো গর্ভের দু' তিনজন শিশুরও জন্ম হয়েছিল।

খেদর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন যে বাচ্চাদের তাদের মাকে প্রয়োজন। তখনই তিনি জোভান ও অ্যাডামকে নিতে রাজি হয়ে গেলেন।

গ্রামে ফেরা

চার বছর পর জোভান সিঞ্জার গ্রামে ফিরে গেলেন। সাথে ছিল গ্রামের নতুন অতিথি অ্যাডামও। কিন্তু কয়েকদিন পরেই পরিবারের চেহারা বদলে গেল। তারা বলতে লাগলো অ্যাডামকে ফেলে দিতে। ‘তারা আমাকে ধর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে শুরু করলো। তারা বলতে লাগলো আইএস উগ্রবাদীর ঘরে জন্ম নেয়া মুসলিম কোন বাচ্চাকে সমাজ কখনোই গ্রহণ করবে না,’ বলেন জোভান।

খেদর তখন জোভানকে নিয়ে গেলেন মসুলের একটি এতিমখানার ম্যানেজার সাকিনে মোহাম্মদ আলী ইউনুসের কাছে। তিনি ভেবেছিলেন ওই ম্যানেজার হয়তো তার স্ত্রীকে রাজি করাতে পারবেন বাচ্চাটিকে এতিমখানায় রেখে আসার ব্যাপারে। কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালানোর পরেও রাজি হচ্ছিলেন না জোভান। খেদর তখন কাঁদতে শুরু করেন। ‘একজন মায়ের কাছ থেকে তার বাচ্চাকে সরিয়ে নেয়ার মতো কষ্টের আর কিছুই হতে পারে না। এটা হচ্ছে আমার হৃদপিণ্ডের একটা অংশ কেটে নেয়ার মতো। কিন্তু একজন মানুষের এই অনুভূতির চেয়েও বড় ইয়াজিদি সমাজের চাওয়া।’

ম্যানেজার তখন মিথ্যে কথা বলেন। তিনি বলেন বাচ্চাটি অসুস্থ। তাকে ভাল মতো দেখাশোনা করা দরকার। কয়েক সপ্তাহ পরেই তাকে আবার জোভানের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে। এই আশ্বাস নিয়েই গ্রামে ফিরে গেলেন জোভান। কয়েকদিন পরেই তিনি সবকিছু মেনে নিতে শুরু করলেন। ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তার বাকি তিন সন্তানের লালন পালনে। কিন্তু এক পর্যায়ে অ্যাডামকে ভুলে থাকা তার জন্যে খুব কঠিন হয়ে পড়লো। ‘প্রত্যেক রাতে আমি তাকে স্বপ্নে দেখতে লাগলাম। কীভাবে তাকে ভুলে যাব আমি? সে আমার শিশু। আমি তাকে দুধ খাইয়েছি!’ 

এর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি তার বাচ্চাদের বললেন, থেরাপি চিকিৎসা নিতে তিনি ডহুক শহরে যাচ্ছেন। কিন্তু আসলে তিনি যাচ্ছিলেন অ্যাডামকে তিনি যে এতিমখানায় রেখে এসেছিলেন সেখানে।

অ্যাডামের জন্যে কষ্ট

‘আমার মনে হয়েছিল যে আমি অ্যাডামের সাথে প্রতারণা করছি। আমার অন্য বাচ্চাদের তো পিতা আছে কিন্তু অ্যাডামের তো কেউ নেই।’ জোভান যখন এতিমখানায় গিয়ে পৌঁছালেন তাকে বলা হলো অ্যাডাম অসুস্থ এবং তার সাথে তিনি দেখা করতে পারবেন না। কিন্তু দু তিনদিনের চাপাচাপির পর ম্যানেজার স্বীকার করলেন যে কিছু বাচ্চাকে স্থানীয় একজন বিচারকের মাধ্যমে দত্তক দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অ্যাডামও ছিল।

কান্নায় ভেঙে পড়লেন জোভান। তিনি আর বাড়িতে ফিরে যাননি। বরং আশ্রয় নিলেন উত্তর ইরাকে নারীদের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে। এর কয়েক মাস পর খেদর তাকে তালাক দিলেন এবং বললেন বাকি বাচ্চাদের দেখতে জোভান যেন আর কখনো গ্রামে ফিরে না যায়। ‘এখানে তো অ্যাডামের কোন দোষ ছিল না। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় তার জন্ম হয়েছে। তাকে দোষী মনে করলে তো আমি তাকে সিরিয়াতেই রেখে আসতাম। আমি খারাপ মানুষ হলে তাকে মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু আমি সেটা করিনি। কিন্তু যে আইএস, গ্রামে এসে পুরো পরিবারকে হত্যা করে, স্ত্রী লোকজনকে ধরে নিয়ে যায় আর এরকম একজনের সাথেই কারো বাচ্চা হয় সেটা তো আর মেনে নেয়া যায় না,’ বলেন খেদর। এবিষয়ে বাচ্চাদের কথাও একেক রকমের।

বড় ছেলে হাইথাম তার মায়ের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি। ছোট ছেলে আজাদ প্রথম কয়েক মাস মায়ের ব্যাপারে জানতে চাইতো। কিন্তু এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। কিন্তু মেয়ে হাওয়া এখনও কষ্ট পাচ্ছে।

‘মা যখন বাড়িতে ছিল সবকিছু সুন্দর মতো চলছিল। আমি চাই মা ফিরে আসুক। আবার অ্যাডামের কাছে থাকারও অধিকার আছে,’ হাওয়ার কথা।

একই চিত্র

জোভানের মতো আরো অনেক ইয়াজিদি নারীকেই এ ধরনের পরিণতি মেনে নিতে হয়েছে। এ রকম আরো প্রায় ২০ জন নারীর সাথে কথা বলেছে বিবিসি, যাদের গর্ভেও আইএস সদস্যের সন্তানের জন্ম হয়েছে। তাদের কেউ-ই ওই সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেননি। অনেককে ইরাকে ফিরে আসার আগে ওই সন্তান সিরিয়াতে ফেলে আসতে হয়েছে। ইয়াজিদি সমাজের অনেকেই মনে করেন এসব বাচ্চা আসলে ‘শয়তানের বাচ্চা।’ জোভান এখন মনে করেন, আইএসের অধীনেই তার জীবন ভাল ছিল। ‘আমরা অবরুদ্ধ ছিলাম। জীবন কঠিন ছিল। কিন্তু বাচ্চারা তো আমার সাথে ছিল।’ 

‘চার বছরের যুদ্ধে আমি আহত হইনি। কিন্তু যখন ইরাকে ফিরে এলাম মনে হলো আমি আহত হয়েছি। কারণ আমার পরিবার, আমার সমাজ, এবং সমাজের আইন আমার সন্তানকে মেনে নিতে পারেনি।’  জোভান তার ইয়াজিদি সমাজ ও স্বামীর ওপর এতোটাই ক্রুদ্ধ হলেন যে তিনি মুসলিম হিসেবেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এতিমখানার ম্যানেজার সাকিনে বলছেন, জোভান তার বাচ্চাকে দত্তক থেকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন যদি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি দেখাতে পারেন যে তিনিই অ্যাডামের মা। তবে এই প্রক্রিয়া এতোটা সহজ নাও হতে পারে। কারণ জোভান একজন ইয়াজিদি নারী, অ্যাডাম একজন মুসলিম। এ রকম পরিস্থিতিতে জোভান নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন যে অ্যাডাম এখন যেখানে আছে সেখানে সে ভালই আছে। ‘আমি প্রতিদিনই তাকে ভাবি। আশা করি হয়তো একদিন, যদি সৃষ্টিকর্তা সেটা চান, আমরা আবার একত্রিত হতে পারবো।’ 

কিছু কিছু নাম বদলে দেয়া হয়েছে তাদের পরিচয় গোপন রাখার জন্যে।


আরো সংবাদ