১৯ অক্টোবর ২০১৯

জীবনের পড়ন্ত বেলা : ‘আমার বুকটা চিরিয়া দেখো ভেতরে কত কষ্ট’

‘আমার বুকটা চিরিয়া দেখো ভেতরে কত কষ্ট’ - সংগৃহীত

‘আমার বুকটা চিরিয়া দেখো ভেতরে কত কষ্ট! ২০ বছর এখানে আছি। সন্তান-স্বজনদের দেখি না। যন্ত্রণার আগুনে দগ্ধ হতে হতে এখন ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কে আমার, আমি কার- এসব এখন আর ভাবি না। এত বছরে সবই ভুলে গেছি। এখন সবই কল্পনা। যখন পরিবার নিয়ে কল্পনা করি তখন নিজের মধ্যেই প্রশ্ন জাগে, এ রকম কিছু কি ছিল? কেমন জানি বোধ করি। মনে হয় আমি যেন অন্য জগতের বাসিন্দা। কখনো এমন মনে হয়, এক জীবন শেষে নতুন করে জন্ম নিয়েছি। দ্বিতীয় জীবনে এখন আর অতীত বলে কিছু নেই। স্বজন-সন্তানবিহীন দ্বিতীয় জীবনে আমি একা। আমি কারো নই, কেউ আমার নয়। এ রকম করেই নিজের কথাগুলো বলছিলেন প্রায় ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ। নিজের নাম-পরিচয় দিয়ে ছবিও তুলতে বললেন। বললেন, ১৯৪০ সালে জন্ম। বাড়ি উত্তরবঙ্গে। তবে ঢাকায় নিজের বাড়ি আছে। দুই সন্তানের জনক। সন্তানরা বিয়ে করে সংসার ও ভালো চাকরি করছে। 

নিজের জীবনের ফেলে আসা গল্প বলতে গিয়ে আটকে গেলেন। বললেন, ‘কী বলব আর কী বাদ দেবো। ২০ বছরের কথা, এ সামান্য সময়ে তোমাকে কতটুকু বলব। তারপরও তুমি সাংবাদিক। আরো কয়েকজনের সাথে এ রকম কথা বলেছি। কিন্তু বলি এক লেখে আরেক। তুমিও কি সে রকম করবা কি না?’ এরপর চোখ ছলছল। 

নিজের জীবনের অতীত বলতে গিয়ে একটু বিরক্তবোধ করলেন। বললেন ‘বাবারে কী বলব। ২০টি বছর স্বজন-সন্তানদের দেখি না। অপমান, অভিমান, ক্ষোভ আর শূন্যতায় এখন পাথর হয়ে গেছি। ভেতরটা পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে।’ 

এরপর একটি ছবি তোলার অনুরোধ করলেন। আবার বলতে শুরু করলেন। ‘জীবনে আমার তৈরী ঘরে আজ আমি পরবাসী। সব থেকেও আজ আমার কিছু নেই। এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে? ছেলে আর ছেলেবউয়ের কাছ থেকে নিজের সম্মান বাঁচাতে যেদিন ঘর থেকে বের হয়েছি সেদিনই ধরে নিয়েছি আমার আর কেউ নেই। হয়েছেও তাই। প্রথম যখন বৃদ্ধাশ্রমে উঠলাম তখন একবার সন্তানরা দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু অভিমানে আমি দেখা করিনি। এরপরই শেষ। আজ ২০টি বছর আমার খোঁজ কেউ নেয় না। এখন বৃদ্ধাশ্রমের রুম ভাড়া ও খাওয়ার টাকা বাকি পড়ে গেছে। তা দিতে পারছি না। কেমনে কী করব বুঝতে পারছি না।’ আমার লাশটিও কেউ নেবে কি না’- এমন প্রশ্নও রেখে দিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। অনুরোধ করে বসতে বললাম। বসলেন।

কেন ঘর ছাড়লেন- পেছনের কারণটা জানতে চাইলাম। এবার একটু রেগে গেলেন। বললেন ‘কেন? এসব জেনে কী করবে?’ আমারতো কিছু মনে নেই। সবই ভুলে গেছি। পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন আর চিন্তা করি না। যা ঘটেছে তা মনে রাখলে নিজেকে জীবন্ত লাশ মনে হয়। জীবনের শেষ বয়সে এখন আর এত কিছু মনে থাকে না। তবে সন্তানের অপমানের কথা ভোলার নয়। জীবনের শেষ বয়সে যে সন্তানের জন্য ঘর ছাড়তে হয়, এ রকম সন্তান যেন কারো ঘরে জন্ম না নেয়।’ চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ‘তোমরাও ভালো থেকো। বাবা-মায়ের সাথে আমাদের সন্তানদের মতো ব্যবহার করো না। আর তোমাদের সন্তানদের এমনভাবে মানুষ করো যেন জীবনের শেষ বয়সে তোমাদের বৃদ্ধাশ্রমে না যেতে হয়।’


আরো সংবাদ