২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

‘শান্তি’র আহবান নিয়ে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পদযাত্রায় শান্তি

সাইফুল ইসলাম শান্তি। - ছবি : সংগৃহীত

গলায় ও মাথায় পেঁচানো একটি লাল সবুজ পতাকা। পিঠে ঝুলানো একটি ব্যাগ। এক হাতে উঁচিয়ে ধরে রাখা একটি প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা রয়েছে- ‘ব্যক্তি স্বার্থকে ভুলে যান, ...গুজবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, পরীক্ষার আগে যে বলবে প্রশ্নপত্র আছে... তাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিন।’ আর অন্য হাতে রয়েছে একটি ছোট হ্যান্ড মাইক। এভাবেই শান্তির আহবান নিয়ে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে হেঁটে চলেছে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সাইফুল ইসলাম শান্তি।

এমন অদ্ভুত পোশাক ও হ্যান্ড মাইকের ডাকে সাড়া দিয়ে যারা হাজির হন তার পাশে, তাদের উদ্দেশ্য করে সচেতনতামূলক নানা রকমের বক্তব্য প্রদান করেন শান্তি। তার মূল বক্তব্য হচ্ছে কল্লাকাটা ও ছেলেধরাসহ সব ধরনের গুজব থেকে মানুষকে সচেতন করা। এছাড়াও প্রকাশ্যে কুপিয়ে বরগুনার রিফাতকে হত্যার মতো ঘটনা আর যেন কোথাও না ঘটে। সেসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করেন শান্তি। শুধু তাই নয় বর্তমানে সময়ের আতঙ্ক ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধেরও নানা প্রকার পরামর্শ প্রদান করছেন তিনি।

পথিমধ্যে ছোট ছোট হাট, বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে দাঁড়িয়ে হ্যান্ড মাইকে চিৎকার করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের সদর উপজেলার আমলাহার। বাবা আবদুল মজিদ কৃষক। তার আরো দুই ভাই বোন পড়ালেখা করছে।

নিজের টিউশনির টাকায় শান্তি লেখাপড়া করে। জমানো কিছু টাকা নিয়ে সে গুজব, ডেঙ্গু ও প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়ে সচেতনতায় নেমে পড়েছে পথে। পায়ে পায়ে পেরিয়ে এসেছে অনেক নগর আর গ্রাম। পথে বিভিন্ন নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। পঞ্চগড়ে শান্তি হামলারও শিকার হয়। কিছু ভালো অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। অনেকে খাওয়াতে চায়, রাত্রি যাপনের সুযোগ দিতে চায়। কেউ পকেটে কিছু টাকাও দিতে চায়। সে কারো সাহায্য নেয়নি। নিজের টিউশনির টাকায় খাবার ও থাকার খরচ মিটিয়েছে। কোথাও বেশি মানুষের উপস্থিতি দেখলে শান্তি হ্যান্ড মাইকে সচেতনতামূলক কথা বলতে শুরু করে।

সেপঞ্চগড়ের তেতুলিয়া থেকে ২১ জুলাই যাত্রা করে ৯ আগস্ট শুক্রবার রাতে ঈদের দুইদিন আগে ফেনী শহরে এসেছে। সার্কিট হাউজে রাত্রি যাপন করে পরদিন শনিবার দুপুরে দৈনিক ফেনীর সময় অফিসে পৌছেন। এখানে কথা হয় তার সাথে। রোববার যোগাযোগ করে জানা গেছে, শান্তি ইতোমধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার কাছাকাছি রয়েছে। সেখানে রাত্রিযাপন করে সকালে টেকনাফের উদ্দেশে রওয়ানা দেবে।

শান্তি বলেন, ‘আমি কল্লাকাটা ও ছেলেধরা গুজব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ডেঙ্গুজ্বরসম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই এই একক পদযাত্রা শুরু করেছি।আমি দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিংবিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তেঁতুলিয়া থেকে ২১ জুলাই পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেছি। পথিমধ্যে যেখানেই মানুষের সমাগম পাচ্ছি, সেখানেই ছেলেধরার গুজব, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে জনমত সৃষ্টির জন্য বক্তব্য দিচ্ছি।’

শান্তি বলেন, ‘পদ্মাসেতু তৈরিতে রড, বালু, সিমেন্ট ও পাথরের প্রয়োজন। কিন্তু শিশুর মাথা ও রক্তের প্রয়োজন হয় না। তাই এসব গুজবের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজটি করে যাচ্ছি। তবে এসব কাজ করতে অনেক জায়গায় নানা রকমের হয়রানির শিকারও হয়েছি আমি। কিছু দিন আগে এক বাজারে প্রচারনা চালানোর সময় স্থানীয় দুই একজন আমাকেই ছেলে ধরা বলে সন্দেহ করেছিল। পরে তারা আমার ব্যাগসহ সব কিছু চেক করে এরপর বিশ্বাস করেছে। এছাড়াও এক বাজারে বক্তব্য দেবার সময় দুই ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে মারধোর করেছিল। তখন স্থানীয় কয়েক জন এসে আমাকে বাঁচিয়েছেন।’

শান্তি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ অনেক স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। কেউ কারো বিপদে এগিয়ে আসে না। একে অন্যের বিপদে যদি এগিয়ে আসত, তাহলে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করতে পারত না হত্যাকারীরা। এসব বিষয়েই আমি মানুষকে নানাভাবে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

চলার পথে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সম্পর্কে জনাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সারা দিন পায়ে হেঁটেই তো চলাচল করছি। আমার লক্ষ্য টেকনাফ পর্যন্ত যাওয়া। আর রাত যাপনের জন্য আমি বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সার্কিট হাউজে থাকার একটা উপায় বের করি। যদি সেটা সম্ভব না হয়, তবে আমি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে রাতে থাকার জন্য আশ্রয় চাই। আর আমি নিজেই দিনাজপুর শহরে টিঊশনি করিরে কিছু টাকা জমিয়েছি। সেই টাকা দিয়েই এই একক পদযাত্রা শুরু করেছি। খাওয়া এবং অনন্যা খরচ আমি নিজের টাকাতেই চালাচ্ছি।’


আরো সংবাদ