২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
রাজধানীতে রাইড শেয়ারিং সেবা-২

ঘাম ঝরান সড়কে মুখ লুকান আড়ালে 

ঘাম ঝরান সড়কে মুখ লুকান আড়ালে  - ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীতে অ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সেবায় জড়িত দেশের হাজারো যুবক। কার, মাইক্রোবাস কিংবা মোটরসাইকেলে যাত্রীদের সেবায় দিন-রাত নিয়োজিত থাকলেও এসব চালক নিজেদের রাইড শেয়ারের চালক হিসেবে পরিচয় দিতে নারাজ। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত যাত্রীসেবার কাজে কালো পিচের সড়কে নিজের শরীরের ঘাম ঝরলেও এ পেশায় আগত যুবকদের অনেকেই মুখ লুকান আড়ালে। 

চালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাইড শেয়ারিংয়ের সেবাটি বাংলাদেশে নতুন। তাই বেকারত্ব ঘোঁচাতে সদ্যপড়াশোনা শেষ করা অনেক যুবকই এ পেশায় এলেও লোকলজ্জার ভয়ে রাইড শেয়ারিংয়ের চালক হিসেবে তারা পরিচিতজনদের কাছে পরিচয় দিতে চান না কিংবা সঙ্কোচবোধ করেন। আবার অনেক চালকের মুখে শোনা যায় তাদের দুঃখগাথা অনেক গল্পও। 

কিউরেক্স ফার্মাসিটিক্যালস নামের একটি ওষুধ কোম্পানিতে দীর্র্ঘ দিন চাকরি করেছেন বরিশালের নুরুজ্জামান। বেতনও বেশ ভালোই ছিল তার। নিজ জেলা বরিশালেই যাতায়াত ভাতাসহ সব মিলিয়ে বেতন ছিল ২২ হাজার ৭০০ টাকা। মা-বাবা আর স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল নুরুজ্জামানের। কিন্তু এক বছর আগে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে লোক ছাঁটাইয়ের কৌশল নেয় ওই ওষুধ কোম্পানি। চাকরি হারান নুরুজ্জামান। ছয় মাস বেকার থাকার পর বিকল্প কোনো আয়ের পথ না পেয়ে নিজের জমানো কিছু টাকা আর বন্ধুর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা ধার করে মোটরসাইকেল কিনে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। 
বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ির পাঠাওয়ের অফিসের গিয়ে তাদের মাধ্যমে নাম রেজিস্ট্রেশন করে শুরু করেন রাইড শেয়ারিং সেবা। এতে এখন তার দৈনিক আয় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। তবে এটাকে তিনি পেশা হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না। সাময়িকভাবে সংসারের খরচ মেটানো গেলেও ভালো কোনো চাকরির জন্য প্রতিনিয়তই খোঁজখবর নিচ্ছেন পরিচিতজনদের কাছে। নিজে ঢাকা শহরে মোটরসাইকেল চালিয়ে অন্যদের সেবা দিলেও নিজের এ পরিচয় নিকটজনের কারো কাছেই প্রকাশ করছেন না তিনি। 

শুধু নুরুজ্জামান নয়, ঢাকায় যেসব যুবক রাইড শেয়ারিং সেবার সাথে জড়িত তাদের বেশির ভাগই বিকল্প কোনো কাজের সুযোগ না পেয়ে মূলত তারা সাময়িকভাবে পরিবারে আর্থিকভাবে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনার জন্য এ সেবা দিচ্ছেন। অনেকের পরিবারও জানে তাদের সন্তান ঢাকায় ভালো কোনো চাকরি করে। গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রাইড শেয়ারিং সেবার সাথে জড়িত যুবকদের সাথে কথা বলে জানা গেল তারা অনেকেই পরিচয় গোপন করে ঢাকা শহরে এ রাইড শেয়ারিং সেবার সাথে যুক্ত হয়েছেন। 

বিমানবন্দর ওভার ব্রিজের দক্ষিণ পাশে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন শরীয়তপুরের আলম শিকদার। স্থানীয় কলেজ থেকে বিএ পাস করেছেন তিন বছর আগে। অনেক অফিসে ঘুরেছেন। কিন্তু চাকরি হয়নি কোথাও। এক বছর আগে ঢাকায় এসে শুরু করেন রাইড শেয়ারিং সেবা। নিজের কোনো গন্তব্য না থাকলেও প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রীদের পৌঁছে দেন তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে। আলমের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা সবাই জানে সে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে, বেতনও ভালোই পায়। 

মগবাজারের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে কথা হয় খুলনার রিপনের সাথে। তিনিও পড়াশোনা শেষ করে সোনার হরিণ নামের চাকরির পেছনে দৌড়েছেন কয়েক বছর। নিজেরই মামাতো বোনের সাথে বিয়ের কথাও পাকাপাকি। কথা ছিল চাকরি হওয়ার পরেই ঘটা করে পারিবারিকভাবে ঠিক করা মামাতো বোনকে লাল শাড়ি পরিয়ে ঘরে আনবেন। কিন্তু চাকরি হয়নি, বিয়েও হয়নি। এখন রাইড শেয়ারিং করলেও পরিবারসহ সবাই জানে সে ঢাকায় চাকরি করে। কিন্তু মিথ্যা পরিচয়ে বিয়ের আসরে বসতেও তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। 

পরিচয় গোপনের এই চিত্র শুধু আলম, নুরুজ্জামান আর রিপনের ক্ষেত্রেই নয়, এ রকম শত শত যুবক আছেন যারা ঢাকায় চাকরির নাম করে বিভিন্ন কোম্পানির অ্যাপসের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিংয়ের সেবার সাথে জড়িত। নিজের শরীরে ঘাম ঝরিয়ে সৎভাবে টাকা উপার্জন করলেও শুধুমাত্র পেশা হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় এমন শত শত যুবক নিজেদের এ পেশাকে গোপন করছেন পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুমহলে। 

অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের বড় প্রতিষ্ঠান পাঠাও-এর বনানীস্থ অপারেশন অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টারের ইনচার্জ আবদুল মুহিত নয়া দিগন্তকে জানান, রাইড শেয়ারিং সেবা দিতে যারা নাম রেজিস্ট্রেশন করেন অফিসিয়ালি তাদের নাম ঠিকানা গোপন করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের কপি ও মোটরসাইকেলের কাগজপত্র অফিসে জমা নিয়েই তাদেরকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। তবে আমরা চালকদের এই পরিচয় সরকারি কাজের বাইরে কোথাও প্রকাশ করি না। তিনি আরো জানান, অনেক চালক হয়তো নিজেকে রাইড শেয়ারিংয়ের চালক হিসেবে পরিচয় দিতে চাইবেন না। কারণ এটা এখনো পেশা হিসেবে ওইভাবে স্বীকৃত নয়।


আরো সংবাদ