২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এতিম নেই তবুও বরাদ্দ!

এতিম নেই তবুও বরাদ্দ! - সংগৃহীত

এতিমখানায় এতিম নেই। তবুও বরাদ্দ পাচ্ছে কিছু এতিমখানা। নড়াইল জেলায় বছরের পর বছর এতিমের নামে সরকারি টাকা এভাবে লুটে নেয়ার অনেক অভিযোগ রয়েছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দিনের পর দিন এতিমের টাকা লুট হলেও যেন দেখার কেউ নেই।

সদরের চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের ‘সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং’। ১৯৮১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৫ সালে বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের সহায়তাপ্রাপ্ত এতিমখানায় জেলা পরিষদ থেকেও অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে এতিমখানাটি সমাজসেবার মাধ্যমে সরকারি অনুদান প্রাপ্ত হয়।

কয়েক দফা সরেজমিন পরিদর্শন করে এতিমখানার নানা অব্যবস্থা চোখে পড়ে। বেশিরভাগ সময়ে এতিমখানাটি বন্ধ থাকে। এখানে দুটি বড় টিনশেড ভবন থাকলেও সেখানে এতিমদের থাকার কোনো পরিবেশ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ‘সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং’ এ ১১৪ জন এতিমের নামে মাসে ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা আর বাৎসরিক ১৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। অথচ এতিমখানায় প্রকৃত এতিমের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৪-৫ জন থাকলেও তারা নিজেদের অর্থে থাকে-খায়।

স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বলেন, এখানে লিল্লাহ বোডিংয়ে পাশের মাদরাসার কিছু ছাত্র রোজার সময় এখানে অবস্থান করে নামাজ পড়ে, নিজেদের টাকায় খায় আবার বাড়িতে চলে যায়।

ইউপি চেয়ারম্যানের নিজের নামে গঠিত জেলার সবচেয়ে বড় বালিকা এতিমখানা ‘আজিজুর রহমান ভূঁইয়া বালিকা সমাজসেবা এতিমখানা’। এতিমখানাটির সুপার কাজী আব্দুল কাদের। ১২৭ জন বালিকা এতিমের জন্য এখানকার বার্ষিক বরাদ্দ ১৫ লাখ ২৪ হাজার। এ এতিমখানার অবস্থাও প্রায় একই রকম।

সরেজমিনে গিয়ে সেখানে ১৪ জন শিশু দেখা গেছে। শিশুদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আশেপাশের মেয়েরা এখানে থাকে আর মাদরাসায় পড়ে। বড় জোর ৪০ জন এতিমের তথ্য দিতে পেরেছে এসব শিশু। তবে ৪০ জন এতিম মেয়ে থাকলেও তার মধ্যে শুধুমাত্র ২ জন প্রকৃত এতিমের সন্ধান পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘আজিজুর রহমান ভূঁইয়া বালিকা সমাজসেবা এতিমখানা’র সভাপতি এবং ‘সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং’ এর সহ-সভাপতি চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ভূঁইয়া। চেয়ারম্যানের প্রভাব খাটিয়ে ওই দুই এতিমখানার সুপারসহ অন্যরা বছরের পর বছর এতিমের টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, এতিমখানার টাকায় গড়ে ওঠা ছাগলের খামারের দেখাশুনা করে এতিম মেয়েরা। সুপার কাজী আব্দুল কাদের এবং তার স্বজনদের বাড়িতে এতিমদের কাজ করানো হয়, তাদের নিজেদের কাজে পাঁচ এতিম শিশুকে ব্যবহার করা হয়।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সমাজসেবার তত্ত¡াবধানে ৩ উপজেলার মোট এতিমখানার সংখ্যা ৪৩টি। ছোট-বড় এসব এতিমখানায় মোট ১ হাজার ২৬৪ জন এতিমের জন্য মাসে মোট বরাদ্দ দেয়া হয় ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। আর বাৎসরিক দেড় কোটি টাকা। ক্যাপিটেশন গ্রান্ড পাবার শর্ত অনুযায়ী, প্রত্যেকটি এতিমখানা নিজস্ব অর্থে যে কয়েকজন এতিম পালন করেন তার দ্বিগুণ এতিম থাকলেই কেবল অর্ধেকের জন্য অনুদান পাবেন।

সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানার সুপার কাজী রাকিবুল ইসলাম বলেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে যে সব অনিয়ম আছে সব ঠিক করা হবে। এরপরে আসলে সব ঠিকঠাক দেখতে পাবেন।

ভূঁইয়া আজিজুর রহমান বালিকা এতিমখানার সুপার কাজী আব্দুল কাদের বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমাদের এতিমখানা চলছে, শিশুদের বাড়িতে কাজ করানো বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। এতিমখানা প্রসঙ্গে চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, এগুলো সব ঠিক হয়ে যাবে।

এতিমখানা দুটি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না স্বীকার করে নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, আমার আগের কথা বলতে পারবো না, তবে আমি নির্দেশনা দিয়েছি ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ড পেতে গেলে প্রকৃতপক্ষে যে কয়জন এতিম আছে তাদের হিসাব করেই দিতে হবে।

সূত্র : ইউএনবি


আরো সংবাদ