২৩ অক্টোবর ২০১৯

আতঙ্কের নাম ব্যাটারিচালিত রিকশা

-

ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট গাড়ির সাথে তো পাল্লা দেয়ই, কখনো কখনো বাস-ট্রাকের সাথেও পাল্লা দেয়। গাড়িগুলোকে সাইড না দিয়ে রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে সাঁই সাঁই করে চলে ওই গাড়িগুলো। মাঝেমধ্যে তাল সামলাতে না পেরে উল্টে পড়ে যায়। ব্যাটারিচালিত এ রিকশা-ভ্যানগুলো এখন রাজধানীবাসীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকলেও পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করে ভয়ানক এ যানগুলো রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রাজধানীর অলিগলি তো রয়েছেই, অনেক সময় সদর রাস্তায়ও এগুলোকে দাপটের সাথে চলতে দেখা যায়।

সরকারিভাবে কোনো হিসাব না থাকলেও একাধিক রিকশা গ্যারেজ মালিকের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কোনো অনুমোদন ছাড়াই রাজধানীতে চলছে অর্ধ লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা। কিছু শ্রমিক সংগঠনের স্টিকার লাগিয়ে ওই রিকশাগুলো চালানো হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে এগুলোকে পুঁজি করে কিছু পুলিশ এবং অসাধু লোক মাসে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা উপার্জন করছে।

ব্যাটারিচালিত এ রিকশা ও ভ্যানগুলো সাধারণ রিকশার চেয়ে দ্রুতগতিতে চলে। সাধারণ রিকশা-ভ্যান পায়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে চালাতে হয়। আর ব্যাটারিচালিতগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে। দ্রুতগতিতে চলে বলে সাধারণ রিকশার চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ রিকশায় ভাড়াও বেশি। এগুলোর কাঠামো সাধারণ রিকশা বা ভ্যানের মতোই। পেছনে কয়েকটি ব্যাটারি লাগানো থাকে, যার সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ যানগুলো চলাচল করে। রাজধানীর একাধিক পথচারী বলেন, গতি বেশি হওয়ার কারণে এগুলো প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়।

মানিকনগরের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান জানান, গত বুধবার মানিকনগর পুকুর পাড় দিয়ে ওই রিকশায় করে তিনি বিশ^রোড যাচ্ছিলেন। রিকশাটির গতি এতই বেশি ছিল যে, ভাঙা রাস্তায় তিনি ছিটকে রিকশা থেকে পড়ে যান। এই এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, অটোরিকশা যারা চালাচ্ছে তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৪-১৫ বছর। সাইফুল নামের এক ব্যক্তি জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মতিঝিল শাপলা চত্বরের সোনালী ব্যাংকের সামনে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে যাচ্ছিলেন। সে সময় ব্যাটারিচালিত একটি রিকশাভ্যান তার ওপর এসে পড়লে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।

সূত্র জানায়, রাজধানীতে রিকশা ভ্যানচালক ও মালিকদের ২৮টি সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের স্টিকার নিয়েই চলছে রিকশা, অটোরিকশা। রিকশা-ভ্যান মালিক ফেডারেশন এবং রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগ নামের দু’টি সংগঠন বেশির ভাগই রিকশা ও অটোরিকশার স্টিকার সরবরাহ করছে বলে জানা যায়।

সূত্র জানায়, অটোরিকশাগুলোর ব্যাটারি চার্জ দিতেও অনেক বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি রিকশায় ১২ ভোল্টের দুই থেকে তিনটি ব্যাটারি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গড়ে লক্ষাধিক ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে প্রতিদিন। এগুলো হচ্ছে চোরাই লাইন দিয়ে। রিকশার গ্যারেজগুলোতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে এসব ব্যাটারিতে চার্জ দেয়া হয় বলে জানান গোপীবাগের এক গ্যারেজ কর্মচারী।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর গতি সাধারণ রিকশার চেয়ে বেশি হওয়ায় এসব রিকশা ভিআইপি রোডেও চলছে। অথচ ওই সব রোডে রিকশা চলাচল নিষেধ। এ কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া ভিআইপি রোডে এসব রিকশার কারণে জটের সৃষ্টি হচ্ছে। এর চালকরা অনেকটা বেপরোয়া। আবার ব্যাটারিগুলো থাকে পেছনে আটকানো, যা চরম বিপজ্জনক। যেকোনো সময় এ ব্যাটারি ছিটকে পড়ে ঘটতে পারে বড় রকমের দুর্ঘটনা।

সূত্র জানায়, মাঝে মধ্যে অবৈধ রিকশার বিরুদ্ধে আটকাভিযান চালানো হলেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে অবাধেই। জানা গেছে, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এসব রিকশা মালিকরা মাসিক ভিত্তিতে উৎকোচ দিয়ে থাকে। মাসে রিকশাপ্রতি দিতে হয় কমপক্ষে এক হাজার টাকা। অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও বেশিও দিতে হয়। মাসে এই অটোরিকশা থেকে কর্তৃপক্ষের আয় আছে পাঁচ কোটি টাকার ওপরে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক জানায়, মাসে প্রতিটি গাড়ি থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার কিছু পুলিশসদস্য এক হাজার টাকা করে নেন। ওই চালকরা বলে, যেসব মালিক টাকা দেয় না তাদের রিকশা পেলেই পুলিশ আটকে দেয়।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কিছু প্রতিবন্ধী মানুষের নামে এ রিকশাগুলো চলাচলের মৌখিক বা কাগজে অনুমতি নেয়া হয়। মানবিক কারণে প্রতিবন্ধীদের এ অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু দেখা যায় যার নামে অনুমতি নেয়া হয় সে গাড়িটি চালাচ্ছে না। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অনেক এলাকায় এক ব্যক্তির নামে একাধিক গাড়ির অনুমতি নেয়া রয়েছে। আসলে প্রতিবন্ধীদের নাম দিয়ে সুস্থ সবলরাই এ অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছে।


আরো সংবাদ