২১ অক্টোবর ২০১৯

রেলভবনে এখনো জামাই ‘সিন্ডিকেট’!

বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক একজন মহাপরিচালকের আমলে গড়ে উঠা ‘জামাই সিন্ডিকেটের’ ভূত এখনো রেলভবনে ওঁৎ পেতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রেলভবন থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, যান্ত্রিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা কিভাবে পরিচালক (সংস্থাপন) পদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ওই কর্মকর্তা ১৫ বছর ধরে ঘুরেফিরেই রেলভবনে অবস্থান করছেন। শুধু একজন নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বদলি থেকে শুরু করে, রেলে অনিয়ম দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির যেসব ঘটনা ঘটছে তার বেশির ভাগ ‘জামাই সিন্ডিকেটের’ সদস্যদের দ্বারা কমবেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লোভনীয় পদগুলোও ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে করা হচ্ছে বলে মনে করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান অবস্থা থেকে বের হতে কী করণীয়’ তার সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে গোপনে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। গোপনীয়ভাবে তৈরি করা একটি খসড়া প্রতিবেদনের সুপারিশের একাধিক জায়গায় সাবেক একজন মহাপরিচালকের ‘জামাই সিন্ডিকেট’-এর সদস্যদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন স্টেশন, অফিস, ওয়ার্কশপগুলোতে ঝটিকা পরিদর্শন করতে গেলেই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতদের সব তথ্য বেরিয়ে আসবে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিচালক সংস্থাপনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা তৎকালীন আলোচিত ডিজির পিএস ছিলেন। যান্ত্রিক কর্মকর্তা হিসেবে ১৫ বছর ধরে তিনি রেলভবনেই বহাল তবিয়তেই আছেন। যান্ত্রিক কর্মকর্তার কাজের ক্ষেত্র হচ্ছে কারখানা এবং রেলের বগি, ইঞ্জিন দেখভাল করা। সেখানেই তার উপস্থিতি থাকার কথা সবসময়। কিন্তু তিনি কিভাবে সংস্থাপনবিষয়ক একটি পদে রেলভবনে বসে কাজ করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তা ছাড়া জুনিয়র কর্মকর্তা হয়ে এডিজি বা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার পদের পাজেরো গাড়ি হাঁকান তিনি। রেলওয়ের বর্তমান সংস্থাপন পরিচালক সদরুল হক এর আগে ডিজির পিএস ছিলেন। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ রয়েছে, রেলভবনে ঘাপটি মেরে থাকা ‘জামাই সিন্ডিকেট’-এর সদস্যদের শনাক্ত করে দ্রুত অন্যত্র বদলি করার পাশাপাশি পূর্ব বা পশ্চিম হেডকোয়ার্টার্স জোন, বিভাগ ও জেলায় শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে তাদের শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

গতকাল রোববার রাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক ডিজির পিএস ও পরিচালক (সংস্থাপন) সদরুল হকের সাথে যোগাযোগ করে ‘জামাই সিন্ডিকেট’ ও তার সম্পর্কিত অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, রেলওয়েতে ‘জামাই সিন্ডিকেট’ নামের কোনো সিন্ডিকেটের কথা আমার জানা নেই। পিএস থেকে পরিচালক সংস্থাপন পদ পাওয়া এবং জুনিয়র কর্মকর্তা হয়েও পাজেরো গাড়ি হাঁকানো প্রসঙ্গে তিনি হেসেই বললেন, আমরা যে গাড়িগুলো ব্যবহার করছি সেগুলো শিডিউলের গাড়ি। আর এটি পাজেরো গাড়ি না, জিপ গাড়ির মতো। আবার কখনো মাইক্রোতেও যাওয়া-আসা করি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার সংস্থাপন পদে মূলত ইঞ্জিনিয়াররাই চাকরি করছেন। যেমন রাকীব, আফজাল সাহেবরা ৪ বছর চাকরি করে গেছেন। এটা তো কমন পোস্ট। আমার চাকরির বয়স এক বছর মাত্র হয়েছে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমিই প্রথম এই পদে দায়িত্ব পালন করছি। এরপর তিনি বলেন, ‘জামাই সিন্ডিকেট’-এর নামে কোথায় কী অভিযোগ গেছে সে প্রসঙ্গে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে প্রশাসন যদি মনে করে আমাকে রাখবে না, রাখবে না। সে ক্ষেত্রে আমি রেডি আছি।

গত রাতে এসব বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোফাজ্জেল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের বাসাবাড়ি, জায়গাজমি, টেন্ডার থেকে শুরু করে পদোন্নতি সব ক্ষেত্রেই চলছে বাণিজ্য। এতে সিন্ডিকেট, বিভিন্ন কন্ট্রাক্টর ও সিবিএ নেতারা কী ধরনের কাজ করছে সে দিকে লক্ষ্য রাখার জন্য জোর দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল সিভিল স্টোর, ডিপার্টমেন্ট অফিসারদের প্রশাসন বা জেনারেল পদে পদায়িত না করে রেলওয়েতে জেনারেল লাইনে কর্মরত অনেক সাহসী ও কম্পিউটারে দক্ষ কর্মকর্তা আছেন যারা এই লাইনে ভালো আউটপুট দিতে পারবে তাদেরকে ওই পদগুলোতে পদায়িত করা যেতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে।

গতকাল রেলওয়েতে ‘জামাই সিন্ডিকেট’-এর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যতটুকু জানি সাবেক ডিজির জামাই বর্তমানে একটি মেগা প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে তিনি পদ্মার প্রকল্পে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে তার ইশারায় পূর্ব এবং পশ্চিম জোনের প্রধান প্রকৌশলী পদে পছন্দের কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়েছেন। বিষয়টি রেলভবনে এখন ওপেন সিক্রেট।

গতকাল রাত সাড়ে ৭টার দিকে রেলভবনে জামাই সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব থাকার সত্যতা জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক এস এম সামছুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন রিসিভ করেও কথা না বলে কেটে দেন। পরবর্তীতে আবারো টেলিফোন করা হলে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগে সাবেক ডিজি আমজাদ হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তারও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।


আরো সংবাদ