২১ নভেম্বর ২০১৯
বণ্টনবৈষম্য বৃদ্ধিতে আয় বাড়ার পরও কমছে খাদ্য গ্রহণ

ক্যালোরি ও প্রোটিন গ্রহণ কমছে

ক্যালোরি ও প্রোটিন গ্রহণ কমছে - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের মানুষের ক্যালোরি গ্রহণের (ক্যালোরি ইনটেক) পরিমাণ অব্যাহতভাবে কমে যাচ্ছে। একই সাথে কমছে ভাত ও গম খাবারের পরিমাণ। কমছে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণও। একই সাথে সামগ্রিক খাবার গ্রহণেরও পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। ২০১৬ সালের ‘খানা আয় ও ব্যয়’ জরিপে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে এই জরিপের প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। আর গত ২৪ সেপ্টেম্বরে ওই প্রতিবেদনের বিস্তারিত ও চূড়ান্ত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্যালোরি ও প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমলেও একই সময়ে কিন্তু মানুষের ও পরিবারপিছু গড় মাসিক আয় বেড়েছে। একই সাথে বেড়েছে আয়বৈষম্যও। বণ্টনবৈষম্য বৃদ্ধির কারণে আয় বৃদ্ধির পরও গড় খাদ্য গ্রহণ কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ক্যালোরি ইনটেকের বিষয়ে পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘২০১০ সালে মানুষের মাথাপিছু দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ যেখানে ছিল ২,৩১৮ দশমিক ৩ কিলো ক্যালোরি; সেখানে ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,২১০ দশমিক ৪ কিলো ক্যালোরি। ২০০৫ সালে যা ছিল ২,২৩৮ দশমিক ৫ কিলো ক্যালোরি। এই হিসাবে দেখায় ১৫ বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে দেশের মানুষের ক্যালোরি ইনটেকের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে কম। শুধু তাই নয়, একই সময়ে কমেছে ভাত ও গম বা আটা খাবারের পরিমাণও। ২০১০ সালে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৪১৬ দশমিক ০১ গ্রাম ভাত খেত। সেখানে ২০১৬ সালে ভাত খাবারের পরিমাণ কমে হয় ৩৬৭ দশমিক ১৯ গ্রাম। অন্য দিকে, ২০০৫ সালে ভাত খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৪৩৯ দশমিক ৬৪ গ্রাম। বিবিএসের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে। একই সময়ে আটা গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১০ সালে আটা গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ২০১৬ সালে তা আবার হ্রাস পায়। ২০০৫ সালে দৈনিক মাথাপিছু আটা গ্রহণ ছিল ১২ দশমিক ০৮ গ্রাম ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ০৯ গ্রাম আর ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৮৩ গ্রামে।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে, একই সময়ে ডাল, সবজি, মাছ ও গোশত খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে বলে বিবিএসের জরিপে উঠে এসেছে। যেমন ২০১০ সালে মাথাপিছু দৈনিক ডাল, সবজি, মাছ ও গোশত গ্রহণের পরিমাণ যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৩০, ১৬৬ দশমিক ০৯ এবং ৪৯ দশমিক ৫০ এবং ১৯ দশমিক ০৭ গ্রাম ছিল। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৬০, ১৬৭ দশমিক ৩০, ৬২ দশমিক ৫৮ এবং ২৫ দশমিক ৪২ গ্রামে। ২০১০ সালে মানুষের মাথাপিছু দৈনিক প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৬৬ দশমিক ২৬ গ্রাম। আর ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৮০ গ্রাম। এটি শহর ও গ্রামীণ- দুই এলাকার জন্যই প্রযোজ্য বলে বিবিএস উল্লেখ করেছে। একই সময়ে খাবার খাতে ব্যয়ের হিস্যাও কমে গেছে, বেড়েছে নন-ফুড ব্যয়। ২০১০ সালে যেখানে খাবার বা ফুড খাতে ব্যয় ছিল ৫৪ দশমিক ৮ ভাগ; ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ৪৭ দশমিক ৭ ভাগ। অন্য দিকে, নন-ফুডে ব্যয় ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ (২০১০) বেড়ে হয়েছে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ (২০১৬)।

জরিপে বেরিয়ে এসেছে, সামগ্রিকভাবে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মানুষের খাবার গ্রহণের পরিমাণও কমেছে। ২০১০ সালে জাতীয়ভাবে গড়ে একজন মানুষ এক কেজি (১০০০ গ্রাম) করে প্রতিদিন খাবার খেত। এর মধ্যে গ্রামের মানুষ একটু বেশি খেত (১০০৫.২ গ্রাম) এবং শহরের একটু কম খেত ( ৯৮৫.৫ গ্রাম); কিন্তু ২০১৬ সালে খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। এ সময়ে মানুষের গড় এক দিনে খাবার গ্রহণ নেমে আসে ৯৭৫ দশমিক ৫ গ্রামে। এর মধ্যে গ্রামে ছিল ৯৭৪.৩ গ্রাম এবং শহরে ৯৭৮ দশমিক ৭ গ্রাম।

ক্যালোরি ও প্রোটিন ইনটেকের পরিমাণ কমলেও মানুষের ও পরিবারপিছু গড় মাসিক আয় কিন্তু একই সময়ে বেশ বেড়েছে বলে বিবিএস জরিপে ওঠে এসেছে। ২০১৫ সালে পরিবারপিছু মাসিক আয় ছিল সাত হাজার ২০৩ টাকা। সেখানে ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪৭৯ টাকা। আবার ২০১৬ সালে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। একইভাবে ২০১৫ সালে একজন মানুষের মাসিক মাথাপিছৃ আয় ছিল যেখানে এক হাজার ৪৮৫ টাকা, সেখানে ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় দুই হাজার ৫৫৩ টাকা এবং ২০১৬ সালে দাঁড়ায় তিন হাজার ৯৪০ টাকা। এখানে কিন্তু আছে, ২০১০ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে সবচেয়ে গরিবের তুলনায় সবচেয়ে ধনীদের আয় ১১৯ গুণ বেড়েছে। ধারণা করা হয় এই আয়বৈষম্যের সাথে গড় খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দারিদ্র্যের সাথে খাদ্য গ্রহণের রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। ১৯৮০-এর দশকে দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য বাংলাদেশে একটি সহজ ও একমাত্রিক সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়। এ সংজ্ঞানুযায়ী দারিদ্র্য হচ্ছে খাদ্য গ্রহণের এমন একটি স্তর, যা থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কিলো ক্যালরি পাওয়া যায় না। দারিদ্র্যপীড়িত জনসংখ্যার প্রাক্কলন কয়েকটি পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হয়। প্রথমত, ভোগ অভ্যাস এবং ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করে একটি খাদ্যতালিকা চিহ্নিত করা হয়, যা নির্দিষ্ট পরিমাণ পুষ্টি তথা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রতিদিন ২,১১২ কিলো ক্যালরি এবং ৫৮ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহ করতে পারে।

পরবর্তীকালে উল্লিখিত খাদ্যতালিকার ব্যয় অপেক্ষা ১.২৫ গুণ কম মাথাপিছু আয়সম্পন্ন পরিবারগুলোকে মধ্যম শ্রেণীর দরিদ্র এবং নির্ধারিত প্রারম্ভিক আয়ের চেয়ে ৮৫ শতাংশ কম মাথাপিছু আয়সম্পন্ন পরিবারগুলোকে চরম দরিদ্র পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সাধারণত পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র্যের আপতন এবং স্তর পরিমাপের জন্য উপরিউক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। পৌর এলাকার দারিদ্র্য পরিমাপের ক্ষেত্রে ক্যালরি গ্রহণের প্রারম্ভিক মাত্রা ছিল পল্লী এলাকার জন্য নির্ধারিত মাত্রা অপেক্ষা কিছুটা বেশি। অবশ্য, বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং নীতিমালার কারণে জনপ্রতি কিলো ক্যালোরির প্রারম্ভিক মাত্রা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে দারিদ্র্যাবস্থা প্রাক্কলনের জন্য ব্যবহৃত তথ্য ও উপাত্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা-ব্যয় নির্ধারণ জরিপ থেকে নেয়া হয়।


আরো সংবাদ