১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপত্তা প্রকল্প

প্রকল্প গ্রহণের আগেই পরামর্শক সেবা চুক্তি

-

অনুমোদন তো দূরের কথা, প্রকল্প গ্রহণই হয়নি, তার আগেই তিন বছর পার করে ফেলেছে পরামর্শক সেবা চুক্তি। ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত হয় এই চুক্তি। অথচ সাধারণ নিয়ম হলো প্রকল্প অনুমোদনের পর পরামর্শকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। যেহেতু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান সম্পাদন করছে, তাই রাশিয়ার রেগুলেটরি বডি থেকে পরামর্শক নেয়া হচ্ছে। তবে মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নেয়া হচ্ছে বলে সম্প্রতি মূল্যায়ন কমিটিকে জানানো হয়। আর এই প্রকল্পের জন্য বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন ১৫০ জন কর্মকর্তা। এই বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, পরামর্শক সেবার জন্য চুক্তিটি সরকার টু সরকারের মধ্যে স্বাক্ষর হয়েছে। তবে এটা বিএইআরএ থেকেই বহন করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পারমাণবিক নিরাপত্তা তদারকীকরণের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়নে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৫১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। চলতি বছর প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়ন কাজ সমাপ্ত হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে পিইসি সভায়। এই প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো হলো, স্থানীয় ও বিদেশী পরামর্শক সেবা, ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, পূর্তকাজ, বৈদেশিক যন্ত্রপাতি, স্থানীয় যন্ত্রপাতি, স্থানীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণ, যানবাহন সংগ্রহ, বিভিন্ন পর্যায়ের জনবল নিয়োগ।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট উইং বলছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদানের জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তা অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলোর নিরাপত্তাবিষয়ক অবকাঠামো, সিস্টেম ও উপকরণগুলোর সমন্বয় মূল্যায়ন, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বাপশনিক) অবকাঠামো উন্নয়নে নেয়া এই প্রকল্প।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বাপশনিক) বলছে, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির জন্য সদস্য হিসেবে নিউক্লিয়ার টেকনোলজিতে দক্ষ একটি রেগুলেটরি বডি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ছাড়াও বাপশনিককে শক্তিশালী করার বিষয়ে রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে আন্তঃ সংস্থা সম্মতি আছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বাপশনিক) দক্ষ জনবল ও কারিগরি সামর্থ্য না থাকায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসন্সেসহ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও তদারকির জন্য বাপশনিক ও রাশিয়ান রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ বা রোসটেকনাডজরের মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক স্বাক্ষরিত হয়। ওই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির আওতায় রোসটেকনাডজর থেকে পরামর্শক সেবা গ্রহণ করছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই সেবা নিতে ২০১৬ সালে চুক্তি করে দুই সরকার। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় কেন এই প্রকল্প গ্রহণের আগে চুক্তি করা হলো সেই ব্যাখ্যা প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রশ্ন তুলে জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি এও জানতে চাওয়া হয়, রাশিয়া ও ভারত দু’টি দেশ থেকে পরামর্শক সেবা সংগ্রহের যৌক্তিকতা কী?

পিইসি সভায় জানানো হয় প্রকল্পে ১৫০ জনকে স্থানীয় প্রশিক্ষণ এবং ১৫০ জনকে বিদেশে প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো ধরনের বিভাজন করা হয়নি। এখানে ৪৮ মাস, ২৪ মাস, ৩ মাস, ৪ সপ্তাহ ও ২ সপ্তাহ মেয়াদি বিদেশে প্রশিক্ষণের উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এতে কারা কারা কোন কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন তা উল্লেখ করা হয়নি। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত জনবলকে এই প্রশিক্ষণ দেয়া হবে বলে বাপশনিক থেকে জানানো হয়। এখানে বৈদেশিক ভ্রমণ ব্যয় ১২ কোটি টাকা। জনপ্রতি ব্যয় হবে ৮ লাখ টাকা। এই প্রশিক্ষণ নিয়েও আপত্তি ও প্রশ্ন তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়াতে কোনো একক মূল্য দেয়া হয়নি।
বাপশনিক থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু রাশিয়া এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ সম্পাদন করছে তাই রাশিয়ান রেগুলেটরি বডি থেকে পরামর্শক সেবা গ্রহণ করা হচ্ছে। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য গঠিত মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতীয় বিশেষজ্ঞ সংযোজন করা হয়েছে। ৩৬০ জন জনবল নিয়োগের জন্য প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে একটি কাঠামো প্রেরণ করা হয়েছে। রূপপুরে তিনটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ৬তলা অফিস ভবনের তিনটি ফ্লোর কারিগরি কর্মকাণ্ডের জন্য বাকি তিনটি ফ্লোর অফিস স্পেস হিসেবে ব্যবহার করা হবে। আর ১০তলা আবাসিক ভবনে মোট ১৮টি ফ্ল্যাট থাকবে, যার মধ্যে পাঁচটি ফ্ল্যাট বিদেশী বিশেষজ্ঞদের জন্য। বাকি ফ্ল্যাটগুলো বাপশনিকের কর্মকর্তাদের জন্য, থাকবে তিনটি রেস্ট হাউজ। এখানে আইএইএসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অতিথিরা বিভিন্ন সময় এটি ব্যবহার করবেন।

কার্যক্রম বিভাগ বলছে, প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনার সাথে প্রাক্কলিত ব্যয় বিভাজন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রকল্পের ব্যাপারে বাপশনিকের নিউক্লিয়ার সেফটি ও সিকিউরিটি বিভাগের পরিচালক ড. সত্যজিত ঘোষের সাথে গতকাল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন হয়নি, পিইসি হয়েছে। কিন্তু এখন সেটা মন্ত্রণালয়ে আছে। তবে সর্বশেষ কী অবস্থায় আছে তা এখন বলতে পারছি না।

বাপশনিকের সদস্য প্রকৌশলী মো: মোজাম্মেল হকের কাছে ফোনে এই প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, প্রকল্পটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রকল্প গ্রহণের এত আগে পরামর্শক সেবার চুক্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সরকার টু সরকার চুক্তি হয়েছে। এদের সেবা স্টেপ বাই স্টেপ নেয়া হবে। ব্যয়ের ব্যাপারে তিনি জানান, সংস্থা থেকেই এটা খরচ বহন করা হচ্ছে। প্রকল্প অনুমোদনের আগেও অনেক সেবা তাদের কাছ থেকে নেয়ার বিষয় আছে। জনবল দক্ষ করতে তাদের সেবা এখন নেয়া হচ্ছে।


আরো সংবাদ