২১ নভেম্বর ২০১৯

ব্যাকটেরিয়া ঝুঁকি কমাতে সতর্ক দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা

ব্যাকটেরিয়া ঝুঁকি কমাতে সতর্ক দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা - ছবি : সংগৃহীত

শিশুর মুখে পাস্তুরিত নিরাপদ দুধ তুলে দিতে চার ধাপের সতর্কতা অবলম্বন করেছে দুগ্ধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আগামী মাসেই এ বিষয়ে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি সতর্কতার নির্দেশনা জারি করবে বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি দেশব্যাপী গরুর পাস্তুরিত দুধে উচ্চ মাত্রায় ব্যাকটেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসার উপস্থিতি পাওয়ার খবরে অভিভাবকদের মনে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে সেটি কমাতে ইতোমধ্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত কয়েক দিনে নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং প্রান্তিকপর্যায়ে দুধ উৎপাদনের সাথে জড়িত খামারি ও কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকার ইস্কাটনের বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানায়, পাস্তুরিত দুধের ওপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের গবেষণাকে কেন্দ্র করেই মূলত সারা দেশে দুধের অণুজীবীয় ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেক মা-বাবা ভয়ে দুধ কেনাও বন্ধ করে দেন। কিন্তু পাস্তুরিত দুধের বিকল্প না পেয়ে তারা শহরের গোয়ালা বা গ্রাম থেকে প্রক্রিয়া করে দুধ সংগ্রহেরও চেষ্টা করেন। কিন্তু এভাবে তারা শিশুদের প্রতিদিনের দুধের চাহিদা মেটাতে পারছেন না। ২০১৩ সালে আমদানিকৃত গুঁড়াদুধে মেলামিন ও তেজষ্ক্রিয়ার উপাদান পাওয়ার খবর প্রচারিত হওয়ার পর প্যাকেট বা গুঁড়াদুধেও আস্থা হারান অনেকে। সেই ঘটনার পর নতুন করে এখন পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও সিসা পাওয়ার খবরেও আতঙ্কিত অনেক পরিবার। ইতোমধ্যে শিশু খাদ্য নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে শহরে থাকা অভিভাবকরা।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক এ এস এম জুবেরী নয়া দিগন্তকে জানান, মূলত চারটি বিষয়ে সতর্ক থাকলে পাস্তুরিত দুধে কোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া কিংবা ক্ষতিকর কোনো উপাদানের সংমিশ্রিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। বিষয়গুলো হলো, প্রথমত প্রান্তিকপর্যায়ে দুধ দোহনের সময়ে গাভীকে ভালোভাবে পরিষ্কার করাতে হবে। কেননা গাভীর ওলানে গোবর কিংবা মূত্র লেগে থাকলে দোহনের সময়ে ওই দুধে ই-কোলাই নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংমিশ্রণ হতে পারে। তাই প্রান্তিকপর্যায়ে কৃষক বা খামারিকে সতর্ক করতে হবে। দ্বিতীয়ত শীতলীকরণ কেন্দ্রে দুধ সংগ্রহ করার আগে পরীক্ষা করে পরিদর্শকের উপস্থিতিতে দুধ সংগ্রহ করতে হবে। তৃতীয়ত দুধ শীতলীকরণের পর পরিবহনের সময়েও দেখতে হবে পরিবহন ভ্যানের তাপমাত্রা চার ডিগ্রির নিচে রাখা হয়েছে কি না। চতুর্থত বিপণিবিতানে পাস্তুরিত দুধ সংরক্ষণের সময়ে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং এর ধারণক্ষমতার বেশি যাতে কোনো ক্রমেই দুধ না রাখা হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এই গবেষক আরো জানান, সব ধরনের পাস্তুরিত দুধ আমরা ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করার জন্য সবাইকে পরামর্শ দেই। পাস্তুরিত তরল দুধ বাজারজাত কোম্পানি ফার্ম ফ্রেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেজর (অব:) মোসলেম উদ্দিন এ প্রতিবেদককে জানান, খামারি পর্যায় থেকে শুরু করে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনেও আমরা একটি স্ট্যান্ডার্ড বা মান নিয়ন্ত্রণ করি। যে কারণে আমাদের দুধের গুণাগুণ রক্ষা হয়।

বাংলাদেশে পাস্তুরিত দুধের সবচেয়ে বড় বাজার দখল করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীঘাটে রয়েছে মিল্কভিটার বড় সংগ্রহশালা। এখান থেকে মিল্কভিটা প্রতিদিন দুই লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে। ঢাকার মিরপুরে মিল্কভিটার প্রধান কার্যালয়ে গত ২১ অক্টোবর সরেজমিন দেখা যায়, এখান থেকে নিজস্ব পরিবহনে পাস্তুরিত দুধ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রধান প্রধান বিপণিবিতান কেন্দ্রে চলে যাচ্ছে।
গবেষণায় পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার বিষয়ে মিল্কভিটার সহকারী মহাব্যবস্থাপক ড. খন্দকার মো: আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, মিল্কভিটা আমাদের নিজস্ব গবেষণায় শতভাগ নিরাপদ দুধ। কেননা আমরা নিজস্ব ভাবে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে এ দুধ পরীক্ষা করেছি। তিনি বলেন, দুধে ব্যাকটেরিয়া থাকবে এটা স্বাভাবিক। তবে এর পরিমিত মাত্রা হলো দশমিক শূন্য পাঁচ ভাগ (০.০৫)। কিন্তু আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি আমাদের দুধে এ মাত্রা হলো ০.০০০০৫ ভাগ।

আবদুল কাদের নামের একজন দুধ কালেক্টর (আড়ং কোম্পানির দুধ সংগ্রহকারী) জানান, আমরা খামারি কিংবা ঘোষদের কাছ থেকে যখন দুধ সংগ্রহ করি তখন তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেই। এক. এই দুধের সিএলআর বা লেকটো’র পরিমাণ কতটুকু, দুই. দুধের ফ্যাটের পরিমাণ এবং তিন. দুধের ক্ষার বা এসিড পরিমাপ করি। এতে দুধ কত সময় আগে দোহন করা হয়েছে বা দুধ টক হয়ে গেছে কি না সেটি সহজেই পরিমাপ করা যায়। আমাদের পরীক্ষায় কোনো একটি বিষয়ের মানের কোনো ঘাটতি থাকলে ওই দুধ আমরা গ্রহণ করি না। সাথে সাথেই তা ফেরত দেয়া হয়।

ছোট বড় খামারি বা কৃষকের পর্যায় থেকে কিভাবে দুধ সংগ্রহ করা হয় এবং সেই দুধ কিভাবে শীতলীকেন্দ্রে এনে পরীক্ষা করা হয় সে সম্পর্কে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম রন্টু নয়া দিগন্তকে জানান, উল্লাপাড়া উপজেলায় ব্যাপকভাবে প্রান্তিক পর্যায় থেকে দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রে রাখা হয়। খামারি ও ঘোষের কাছ থেকে সরাসরি দুধ সংগ্রহ করা হয়। অন্য দিকে মিল্কভিটা শুধু তাদের সমরায় সমিতির মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করে।

তিনি আরো জানান, উল্লাপড়া উপজেলায় চারটি কোম্পানির বেশ কিছু দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রাণের চারটি, ব্র্যাক কোম্পানির তথা আড়ং দুধের দুটি, আকিজ কোম্পানির ফার্ম ফ্রেশের একটি এবং নতুন কোম্পানি জিসানের একটি দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র চালু আছে। এ ছাড়া মোহনপুরে উল্লিখিত প্রত্যেকটি কোম্পানির একটি করে দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র চালু রয়েছে।


আরো সংবাদ