১২ নভেম্বর ২০১৯

রেডিও সংগ্রহ যার নেশা (ভিডিও)

নিজের সংগ্রহের সামনে মোফাজ্জল হোসেন - ছবি : নয়া দিগন্ত

মোফাজ্জল হোসেন। পেশায় একজন ঘড়ির মেকানিক। পুরনো ও নষ্ট ঘড়ি মেরামত করে বিক্রির পর সেই অর্থ দিয়ে কেনেন রেডিও। তার সংগ্রহের রেডিওগুলো রাখার জন্য প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা রুম ভাড়া গুনেন মোফাজ্জল। সংগ্রহ করা নষ্ট রেডিও ভালো করতে একজন মেকানিকও রেখেছেন তিনি।

ফিলিপস, গ্রুন্ডিক, পাই, মারফি, জ্যামিথ, টেলিফোন ক্যান ও বুশ কোম্পানির রেডিওসহ নামি-দামি সব ব্রান্ডের ছয় শ’রও অধিক রেডিও সংগ্রহে রয়েছে তার। সেই সাথে রয়েছে এক শ’ পঁচাত্তর বছর আগেকার রেডিওসহ সবচেয়ে ক্ষুদ্র রেডিও।

মোফাজ্জলের দাবি, তার সংগ্রহে রয়েছে বিশ্বের সব নামি-দামি ব্রান্ডের রেডিও। এসবের আকারে কোনোটা অর্ধগোলাকৃতির, কোনোটা আবার স্যুটকেসের মতো দেখতে। কোনোটা দেখতে অনেকটা কাঠের টুকরোর মতো।

আজ মঙ্গলবার থেকে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘রেডিও সং ফেস্টিভ্যাল’। সেখানে হরেক রকমের কয়েক শ’ রেডিও নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন রেডিও সংগ্রাহক মোফাজ্জল হোসেন। তার সেসব রেডিও ঘুরে দেখছেন বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অতিথি ও দর্শকরা। অনেকে কলের গান বাজিয়েও শুনছেন। মোফাজ্জলের কাছে সংগৃহীত প্রতিটি রেডিওর রয়েছে এক একটি গল্প। সেসব গল্প ও ঘটনাবহুল রেডিও সংগ্রহের ইতিবৃত্তও জেনে নিচ্ছেন আগতরা।

যেভাবে শুরু :
বাবা আব্দুল ফারুক ছিলেন পেশায় রেডিও মেকানিক। তার আরো একটি পরিচয় আছে, মুক্তিযোদ্ধা। তার দোকানে মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন মানুষ আসতেন রেডিও মেরামত করতে। রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও গল্পের আলোচনার পাশাপাশি দোকানটি হয়ে উঠতো স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে দিতে রেডিওর ভূমিকাসহ অন্যান্য আলোচনার একটি সার্থক আড্ডাখানা।

ওসব শোনা গল্প মোফাজ্জল মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, যা পরবর্তীতে তার রেডিও সংগ্রহে প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ১৯৮৫ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে মোফাজ্জল রেডিও সংগ্রহ করা শুরু করেন। একসময় জীবিকার তাগিদে ময়মনসিংহ ছেড়ে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়।

ঘটনাবহুল রেডিও সংগ্রহ :
মোফাজ্জল জানান, ১৯৯৪ সালে একবার ঢাকার জিনজিরায় এক মুক্তিযোদ্ধার কাছে রেডিও কিনতে গিয়েছিলেন। সেই মালিক তখন রেডিওর দাম চেয়ে বসেন ১৫ শ’ টাকা। কিন্তু তার কাছে ছিল মাত্র ৮ শ’ টাকা। দরদাম করে ৮ শ’ টাকায় যখন রেডিও নিবেন রেডিওর মালিক ঠিক ওই সময় তার পায়ে থাকা চকচকে জুতো জোড়াটি চেয়ে বসেন। অগত্যা টাকা আর জুতা দিয়েই রেডিওটি নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে মিরপুরের মনিপুরের বাসায় চলে আসেন।

আরেকবার বরিশালের পয়সারহাটে রেডিও কিনে বাড়ি ফেরার পথে তার নৌকায় ডাকাত হানা দেয়। সাথে থাকা রেডিও রক্ষার জন্য নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরিয়ে তীরে ওঠেন। পরে সেই রেডিও মেকানিকের কাছ থেকে সচল করে নেন।

তার কাছে একটি রেডিও আছে, যা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার। রেডিওর মালিক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। মায়ের কাছে ছেলের স্মৃতি বলতে ওই রেডিওটিই, যা এখন তার সংগ্রহে রয়েছে।

মোফাজ্জল বলেন, ‘রেডিও সংগ্রহ আমার নেশা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পকেটে টাকা ছিল না। মানুষের বাড়িতে কামলা দিয়া সেই টাকায়ও রেডিও কিনেছি।’

তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম আমার রেডিও নিয়ে গবেষণা করবে। রেডিওর ইতিহাস, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে রেডিওর ভূমিকার বিষয়টি জানবে।’

রেডিও সংগ্রাহক হিসেবে এরই মধ্যে স্বীকৃতিও পেয়েছেন মোফাজ্জল হোসেন। বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে তার রেডিও সংগ্রহের বিষয়টি প্রচার হয়েছে বিশেষ গুরুত্বের সাথে। প্রদর্শনীও হয়েছে বাংলাদেশ বেতারের উদ্যোগে।

মোফাজ্জল তার সংগ্রহশালা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে চান। স্বপ্ন দেখেন একটি রেডিও যাদুঘর গড়ে তোলার। যার নাম হবে প্রথম রেডিও আবিষ্কারক বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে। যার আকৃতি হবে অনেকটা রেডিওর মতো। জাদুঘরে রাখা রেডিওগুলো উৎসাহী দর্শকরা বাজিয়েও শুনতে পারবে।

তিন দিনব্যাপী শুরু হওয়া সম্মেলনে রেডিওর অর্জনগুলোকে তুলে ধরে আগামীর সম্ভাবনা দিক আলোকপাত করা হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

সম্মেলনে স্বাগতিক বাংলাদেশসহ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, মিসর, রোমানিয়া, তুর্কমেনিস্তান, জাপান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, নেপালসহ ২২টি দেশের ২১৩ জন রেডিও এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অংশ নিয়েছেন, যাদের মধ্যে বিদেশি প্রতিনিধি থাকছেন ৬২ জন।

বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দ এই সম্মেলনে তাদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা-ভাবনা এবং তথ্য পরস্পরের সাথে বিনিময় করবেন।

সমাপনী দিন ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ টেলিভিশনের আয়োজনে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলংকা ও তুর্কেমেনিস্তানের তরুণ শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে।

পৃথিবীতে শান্তি ও কল্যাণমুখী শক্তিশালী সম্প্রচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার কথা বলেছেন আলোচকরা।

দেখুন:

আরো সংবাদ