১১ ডিসেম্বর ২০১৯

দিনে ২ বার করে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম

বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজারে চলছে ভয়াবহ অস্থিরতা। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। এমনকি দিনেই কয়েক দফা বেড়ে যাচ্ছে। খুচরা দোকানদারদের অনেকে তাই পণ্যটি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। ঠিক এক বছর আগে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের মূল্য ছিল ৩৫-৪০ টাকা। আর আমদানিকৃতটি বিক্রি হয়েছে ২৫-৩৫ টাকায়। সেখানে শনিবার ঢাকায় বিদেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০-২২০ টাকা কেজিতে, দেশি ২২০-২৩০ টাকায়। এই পরিসংখ্যান সরকারের ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, টিসিবির। তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে এর চেয়েও বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে রাজধানীতে।

পেঁয়াজের দাম বাড়ছে প্রতিদিন, যার সঙ্গে শুধু ক্রেতারাই নন, হিসাব করে উঠতে পারছেন না এমনকি খুচরা বিক্রেতারাও। তাই দিনের চাহিদা মিটাতে সকালে ও বিকালে অল্প পেঁয়াজ আনছেন তারা। তাতেও দামের পার্থক্য হওয়ায় পড়ছেন বিপাকে। শুক্রাবাদ বাজারের আসলাম হোসেন দেশি-বিদেশি সব ধরনের পেঁয়াজ শনিবার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তার দোকানে তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে আমাদনি করা এবং দেশি সব ধরনের পেঁয়াজই আছে। তবে সেগুলোর দামের কোন তফাৎ নেই।

আসলামের দাবি, তিনি এই পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে আছেন। কারণ একদিনেই পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম দুই দফা করে বাড়ছে। তিনি জানান,‘শুক্রবার সকালে কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি ২০০ টাকা কোজি দরে পেঁয়াজ কিনে আনি। বিক্রি করি ২২০ টাকা দরে। কিন্তু বিকেলে আবার সেই পেঁয়াজ আনতে হয়েছে ২৩০ টাকা কেজিতে। বিকেলে যখন তা ২৫০ টাকা দরে খুচরা বিক্রি করতে যাই তখন ক্রেতারা তা মানতে চান না। আমাদের হয়েছে বিপদ।’

এই কারণে তার পাশের দোকানদার আব্দুল আলিম পেঁয়াজ বিক্রিই বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন,‘পেঁয়াজের বাজার দ্রুত আপডাউন করছে। তাই ভরসা পাচ্ছি না। মানুষের সাথে কথা রাখতে পারছি না। আবার আজ বেশি দামে কিনে আনব, কাল যদি কমে যায় তাহলে তো আমাদের লোকসান হবে।’

তিনি আরো বলেন,‘পেঁয়াজ যে আনবো কতটুকু আনবো তাওতো বুঝতে পারছি না। কারণ মানুষ পেঁয়াজ খাওয়া অনেক কমিয়ে দিয়েছে। আগে যারা এক কেজি কিনতেন তারা এখন ২৫০ গ্রামের বেশি কিনছেন না। এখন ১০-২০ টাকার বেশি পেঁয়াজ খুব কম মানুষই কিনেন।’

ঢাকার মোহাম্মদপুর ও কাঠালবাগান বাজারে খোঁজ নিয়েও একই চিত্র পাওয়া গেছে। কাঠালবাগানের আকাশ হাওলাদার মিন্টু পেঁয়াজ বিক্রি করছেন না তিনদিন ধরে। তার কথা,‘পেঁয়াজ বিক্রি এখন ঝামেলা। মানুষ এখন ১০টাকার বেশি পেঁয়াজ কিনে না। আর বাজার অস্থির। দামের কোনো ঠিকঠিকানা নাই। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। আবার হঠাৎ করে কমে গেলেতো আরেক বিপদ। তাই এখন আর পেঁয়াজ বেঁচি না। বাজার স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমি আর পেঁয়াজ বিক্রি করব না। আমাদের ব্যবসা হয় সামান্যই। যা ব্যবসা করার পাইকারি বিক্রেতারা করেন। আমরা কেন ফাও ঝামেলার মধ্যে যাবো।’

মোহাম্মদপুরের নবিউল ইসলামের পেঁয়াজের দাম নিয়ে রীতিমত ঝগড়া করতে হয়েছে ক্রেতাদের সঙ্গে। তিনি বলেন,‘এই পেঁয়াজের কারণে আমার বাধা কাস্টমার কয়েকজন ছুটে গেছেন। মনোমালিন্য হয়েছে। তাই পেঁয়াজ বিক্রিই বন্ধ করে দিয়েছি।’

এদিকে ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ঢাকায় খুচরা পেঁয়াজের দাম একেক দোকানে একেক রকম। শনিবার খুচরা ২৫০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হলেও কোনো দোকানে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। কোথাও একই পেঁয়াজ ২১০ বা ২৩০ টাকায়ও পাওয়া গেছে। এর কারণ হিসেবে দোকানদার বলেন,‘যে দোকানদার এক দিন আগে পেঁয়াজ কিনেছেন তিনি একটু কমে দিতে পারবেন। কিন্তু আজ যিনি কিনেছেন তাকে বেশি দামেই বেঁচতে হবে। কারণ সকাল বিকাল পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।’

বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজের মধ্যে মিয়ানমার ও তুরস্কের পেঁয়াজের প্রাধান্যই এখন বেশি। সেই সঙ্গে মিশর থেকে পেঁয়াজ আসবে বলে সবাই অপেক্ষায় আছে। এই পেঁয়াজ আসছে বিমানযোগে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার নিজেই এক অনুষ্ঠানে ‘সুখবর' দিয়ে বলেন,‘এখন পেঁয়াজ নিয়ে একটা সমস্যা চলছে। এই সমস্যা যাতে না থাকে সেজন্য কার্গো ভাড়া করে আমরা এখন পেঁয়াজ আনা শুরু করেছি। কাল-পরশুর মধ্যে বিমানে পেঁয়াজ আসা শুরু হবে। এখন পেঁয়াজ বিমানেও উঠে গেছে, কাজেই আর চিন্তা নাই।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই পেঁয়াজ মঙ্গলবার এসে পৌঁছাবে।

দায়ী আমদানিকারকরা?

জানা গেছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিদেশি পেঁয়াজের প্রতি কেজির আমদানি মূল্য ৪২ থেকে ৬৮ টাকা। তারপরও খুচরা বাজারে কেন এই পাগলা ঘোড়া? এর জবাবে চট্টগ্রামের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন,‘আমদানিকারকরাই এর জন্য দায়ী। তারা সিন্ডিকেট করছে। আমরা চট্টগ্রামের আমদানিকারকদের চিহ্নিত করেছি। সারাদেশে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আর আমদানিকারক ও আড়তদাররা পুরো ব্যবসাটাকে পেপারলেস করে ফেলেছেন। তারা কোনো ডকুমেন্ট রাখছেন না। ফলে তাদের ধরাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এদিকে আমদানিকারক ও আড়তদাররা সবধরণের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাচ্ছেন দাম বাড়িয়ে। তারা স্টক করার কারণে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ পচে গেছে। সেটিও পুষিয়ে নিচ্ছেন দাম বাড়িয়ে। তৌহিদুল ইসলাম বলেন,‘আইন অনুযায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে সরকার।’ সূত্র : ডয়চে ভেলে।


আরো সংবাদ