২৩ জানুয়ারি ২০২০
সেমিনারে সুশীলসমাজ

দারিদ্র্য কমলেও অসমতা আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে

-

দেশের সুশীলসমাজ মনে করছে, সরকারের দারিদ্র্যবিমোচন ও খাদ্যনিরাপত্তা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাজেট ও উপকারভোগীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়লেও প্রয়োজনীয় সাফল্য অর্জিত হচ্ছে না। বিদ্যমান জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশল-এনএসএসএস গাইডলাইন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জন যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি অতিদরিদ্র ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য এবং পুষ্টির বিষয়টিও নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে দারিদ্র্য কমলেও অসমতা ও আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ আয়োজিত গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভূমিকা এবং ইভিপিআরএ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও ‘পিকেএসএফ’-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বক্তব্য রাখেনÑ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মাদ খালেদ হাসান, সমাজ সেবা অধিদফতরের পরিচালক মোহাম্মাদ সাব্বির ইমাম এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সামাজিক সুরক্ষা ম্যানেজার ম্যারিয়ান এন ছারুচি। আলোচনায় অংশ নেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের পরিচালক চন্দন জেড গোমেজ।
সেমিনারে তিনটি পেপার উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার আলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সমতলের নৃগোষ্ঠীর জন্য করণীয় বিষয়ে উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ শাহান, খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির ভূমিকা শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহসিন আলী, সাধারণ সম্পাদক, খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও নির্বাহী পরিচালক, ওয়েভ ফাউন্ডেশন এবং প্রকল্পের পক্ষ থেকে উপস্থাপনা করেন মো: ইউসুফ আলী, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। সঞ্চালনা ও আলোচনার সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন মহসিন আলী।
সেমিনারে বলা হয়, দেশের লক্ষ্য অনুযায়ী উপকারভোগীদের দারিদ্র্যাবস্থা থেকে উত্তরণের যথাযথ পরিকল্পনা প্রয়োজন। সে জন্য অর্থ সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিগুলোর বিক্ষিপ্ততা, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেবা প্রদানে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে একটি মুখ্য সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ নজর দিতে হবে সমতলের আদিবাসীদের দিকে।
ড. আসিফ শাহান গবেষণাপত্রে বলেন, দারিদ্র্য কমলেও অসমতার পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পৃথক নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করার বিষয়ে তিনি সুপারিশ তুলে ধরেন।
এম এ মান্নান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বেসরকারি সংস্থার প্রশংসা করে বলেন, সবাইকে সাথে নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু আমাদের আরো কাজ করতে হবে। কারণ দারিদ্র্য কমছে; কিন্তু বৈষম্য এখনো চোখে পড়ার মতো। এ ক্ষেত্রে চরম দারিদ্র্য নির্মূলে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের পাশাপাশি প্রয়োজন সামগ্রিকতার আলোকে কাজ করা।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সরকারের একার পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত প্রকৃত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় দরিদ্র মানুষকেই তাদের উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্ব দিতে হবে, তাহলেই প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কর্মসূচির সুফল পৌঁছবে। চন্দন জেড গোমেজ বলেন, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী ও এনজিওÑ এ তিন পক্ষের সমন্বয় ঘটলে সব কর্মসূচিই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ম্যারিয়ান এন হারুচি বলেন কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন, পরিবীক্ষণ ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মোহাম্মাদ সাব্বির ইমাম বলেন, সরকার সব সময়ই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধিতে তৎপর রয়েছে। এ জন্য দরকার বাস্তবায়নকারীদের সততা ও আন্তরিকতা।
মোহাম্মাদ খালেদ হাসান বলেন, সরকার এনএসএসএসের কার্যক্রমের সার্বিক সাফল্য দেখতে হলে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তবে এ জন্য সরকার ও এনজিওদের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি।


আরো সংবাদ