Naya Diganta

টাকার সঙ্কটে ব্যাংক

টাকা

ঋণখেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে নিরাপদে থাকতে আগে তিন মাসের মাথায় এক ধরনের ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতেন। কিন্তু এখন খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সময় পাচ্ছেন ৯ মাস। অর্থাৎ এখন ৯ মাস পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপি মুক্ত থাকতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে যারা আগে তিন মাসের শেষ সময়ে ঋণ পরিশোধ করতেন এখন তারা ৯ মাসের মাথায় এসে ঋণ পরিশোধ করছেন। এতে ব্যাংকে নগদ টাকার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ দেয়ার ঘোষণায় ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন কিছু উদ্যোক্তা। যারা এত দিন নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তাদের অনেকেই হঠাৎ করে ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দিয়েছেন। সবমিলে ব্যাংকে নগদ আদায়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকের নগদ আদায় কমে যাওয়ায় মহাবিপাকে পড়েছে কিছু ব্যাংক। যারা অবশোর ব্যাংকিং ইউনিটে (ওবিইউ) বৈদেশিক মুদ্রায় বেশি বিনিয়োগ করেছেন ওই সব ব্যাংক মেয়াদ শেষে বৈদেশিক মুদ্রায় দায় পরিশোধ করতে বেকায়দায় পড়ে গেছে।

চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তঃব্যাংক থেকে নগদ টাকায় ডলার কিনে বৈদেশিক মুদ্রার দায় পরিশোধ করছে। এক দিকে নগদ আদায় কমে গেছে, অপর দিকে বৈদেশিক মুদ্রায় দায় সরবরাহ করতে ব্যাংকগুলোর এখন ত্রাহি অবস্থা। দৈনন্দিন লেনদেন করতে পারছে না ওই সব ব্যাংক। নগদ টাকার সঙ্কট মেটাতে কলমানি মার্কেটসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে তারা। এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান তারল্য ব্যবস্থাপনায় কিছু ব্যাংকের আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান না করেই এলসি খুলেছিল। একই সাথে ওবিইউর মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণ তহবিল সংস্থান করে বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছিল। প্রসঙ্গত, ওবিইউ হলো বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় ধার নিয়ে ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়া হয়। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ ফেরত দিতে হয়। এভাবে একটি বড় অঙ্কের বৈদেশিক দায়ের মধ্যে পড়ে গেছে কিছু ব্যাংক। এ সব দায় পরিশোধ করতে গিয়ে পড়েছে মহাসঙ্কটে। কারণ ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের একমাত্র পথ হলো রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়। কিন্তু রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় তারা চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে পারছে না। 
সূত্র জানায়, এর ওপর ব্যাংকের নগদ আদায় কমে গেছে। সবমিলেই তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। যদিও এ ঘোষণা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন প্রথমে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, খেলাপি ঋণের এক শতাংশ অথবা এক কোটি টাকার মধ্যে যেটি কম তা পরিশোধ করেই ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবেন খেলাপিরা। আর ঋণের সুদ হবে সরল সুদ অর্থাৎ ৭ শতাংশ। পরে তিনি বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়নের সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা। এ সুযোগ দেয়া হবে ১২ বছরের জন্য। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এ সুযোগ দেয়া হবে বলে তিনি জানান। পরে তিনি আবার বললেন, সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। 

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের এ ঘোষণায় যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়ার ঘোষণার পাশাপাশি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করায় ব্যাংকের নগদ আদায় হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে। এমনিতেই ব্যবসায়ীরা নানা অযুহাতে ঋণ নিয়ে তা আর পরিশোধ করতে চান না, এর ওপর কিছু দিন ধরে ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ দেয়ার ঘোষণায় যারা এত দিন নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন বলা চলে গত কিছু দিন ধরে তারা ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে ব্যাংক বহুমুখী সমস্যায় পড়ে যাচ্ছে। প্রথমেই ব্যাংকের ঋণ আমানতের অনুপাতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। কারণ ব্যাংকের আমানত প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতদিন ঋণ বিতরণের সতর্কতা অবলম্বন করায় ঋণ আমানতের অনুপাত বাংলাদেশ ব্যাংক বেধে দেয়া সীমার মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু হঠাৎ ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী আমানত বাড়ছে না। ফলে আমানত প্রবাহ না বাড়লেও ঋণ আদায় কমে যাওয়ার কারণে আমানতের চেয়ে ব্যাংকের ঋণের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণ আমানতের অনুপাত সাড়ে ৮৩ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। যদিও সম্প্রতি এটা সমন্বয়ের সময়সীমা ছয় মাস বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

এমনি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, রমজানের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাবে। একই সাথে আর্থিক বছরের শেষ মাসে অর্থাৎ জুনে এডিপি বাস্তবায়ন বেড়ে যাবে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। ফলে অস্থিরতা কিছুটা কমে যাবে। কিন্তু এর পরেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর সহযোগিতা করতে তারল্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোকে রেপো ও বিশেষ তারল্য সহযোগিতার আওতায় যে পরিমাণ নগদ টাকা সরবরাহ করা হয় সামনে তা বাড়ানো হতে পারে। একই সাথে মেয়াদপূর্তির সময় বাড়ানো হতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে নীতিনির্ধারকদের ওপর। তারা যেটা অনুমোদন দেয় সেটাই করা হবে।