Naya Diganta

ইথিওপিয়ায় ব্যর্থ অভ্যুত্থান

সামরিক অভ্যুত্থান রুখতে গিয়ে নিজের বাসভবনে দেহরক্ষীরই গুলিতে খুন হলেন ইথিওপিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল সিয়ার মেকোনেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানী আদ্দিস আবাবায় তার সাথেই খুন হন সেনাবাহিনীর আরো এক জেনারেল জেজাই আবেরাওসহ মোট ছয়জন। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ পরের দিন জানিয়েছেন, হামলাকারীকে ধরা হয়েছে। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে। সেনাপ্রধানের হত্যার কয়েক ঘণ্টা আগেই খুন হন ইথিওপিয়ার উত্তরের ‘আমহারা’ প্রদেশের গভর্নর। প্রশাসনের অনুমান, সেখানে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চলছিল, যা থামাতে চেয়েছিলেন সেনাপ্রধান। সে কারণেই খুন হতে হয় তাকে।
বছরখানেক আগে প্রধানমন্ত্রী আবি সেনাপ্রধানের পদে বসিয়েছিলেন সিয়ারকে। একই সাথে সেনাবাহিনীর নানা পদে বহু পরিবর্তনও এনেছিলেন তিনি। সম্ভবত সে কারণেই সামরিক বাহিনীর একাংশের মধ্যে আবির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। গত অক্টোবরে আবি আবার অভিযোগ করেন, পারিশ্রমিক বাড়ানোর দাবি জানানোর অজুহাতে আসলে তাকে খুন করতে এসেছিল সেনাবাহিনীর একাংশ। বছরখানেক আগে আবির ওপর একটি গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। এবারের ঘটনায় নাম উঠে এসেছে, আসামিনিউ সিগে নামে এক উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার তথা আমহারার নিরাপত্তা প্রধানের।
সামরিক অভ্যুত্থানের অভিযোগেই ৯ বছর কারাবন্দী থাকতে হয়েছিল সিগেকে। কিন্তু আগের সরকার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় গত বছরের গোড়ার দিকে মুক্তি পান তিনি। সম্প্রতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার জন্য আমহারার জনগণকে প্রকাশ্যে আহ্বান জানাতে দেখা গেছে সিগেকে। তেমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। সেই বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্যই শনিবার সন্ধ্যায় বৈঠকে বসেছিলেন আমহারার গভর্নরসহ সর্বোচ্চ কর্তারা। সেখান থেকেই শুরু খুনের পর্ব। শনিবার গভর্নরের সাথেই খুন হন বর্ষীয়ান উপদেষ্টা এজেজ ওয়াসি। আহত হন অ্যাটর্নি জেনারেল।
নিহতদের স্মরণে দেশটিতে পতাকা অর্ধনমিত রেখে এক দিনের শোক পালন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আরো বলেন, সব শয়তানি শক্তি যারা ইথিওপিয়াকে পৃথক করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে ইথিওপিয়াকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবে এ ঘটনা নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি। তিনি জানান, আমহারায় বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠকে হামলা চালায় তাদের সহকর্মীরা। এতে নিহত হয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। এ ঘটনার পর যাতে দেশে কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে না পড়ে, সে কারণে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। মার্কিন দূতাবাসে হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়।
আফ্রিকার সবচেয়ে প্রাচীন স্বাধীন দেশ ইথিওপিয়া। ওই মহাদেশে নাইজেরিয়ার পর দ্বিতীয় জনপ্রিয় দেশ এটি। দেশটি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম ইথিওপীয় সরকারি গণপ্রজাতন্ত্র। উঁচু পর্বত আর ঊষর মরুভূমির এই রুক্ষ দেশটিতে ৮০টিরও বেশি জাতিগত ও ভাষাগত গোষ্ঠীর মানুষের বাস।
বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত দেশটি আবিসিনিয়া নামে পরিচিত ছিল। ইথিওপিয়া আফ্রিকার প্রাচীনতম স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রথম শতাব্দীতে এখানে আকসুম নামের একটি শক্তিশালী খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। ষোড়শ শতকের পর ইথিওপিয়া অনেকগুলো ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৮৮০-এর দশকে রাজা দ্বিতীয় মেনেলিকের অধীনে এগুলো পুনরায় একত্রিত হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার একটি অংশ ছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে।
ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বে ইরিত্রিয়া এবং জিবুতি, পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে সোমালিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে কেনিয়া এবং পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে সুদান। দেশটি ৯টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে প্রধান জাতিগত গোষ্ঠী বাস করে। আদ্দিস আবাবা ইথিওপিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
গত বছর ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আবি আহমেদ। সে সময় ইথিওপিয়ায় রাজনৈতিক নিপীড়নের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্ত করে দেয়া, রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল তার। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর আসন গ্রহণ করার পর থেকে সেখানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে জাতিগত দাঙ্গা। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ২৪ লাখ মানুষ।
সর্বশেষ ঘটনার পর থেকে নতুন করে দেশটিতে জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিবিসি জানিয়েছে, প্রথম দিকে সেনাপ্রধানের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়, পরে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মৃত্যু হয়েছে সেনাপ্রধানের। এই ঘটনায় ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো অস্থির হয়ে উঠল।