Naya Diganta

ফাঁদ


কি হলো শাহিন, ওর মুখ থেকে কিছু বের করতে পারছ? না স্যার, এত মাইর খাওয়ার পরেও তো ওর মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করতে পারছি না।
বারবার একই কথা বলছে, আমি খুন করি নাই, এসব কিছু আমি জানি না স্যার।
শাহিনের কথা শুনে পুলিশ অফিসার রহিম বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। শাহিনকে সাথে নিয়ে, রাশেদের সাথে দেখা করল রহিম সাহেব।
তিন দিন ধরে অনেক রকমভাবে চেষ্টা করেও দিহানের খুনের বিষয়ে কোনোরকম তথ্য পাওয়া গেল না রাশেদের কাছ থেকে।
পুলিশ অফিসার রহিম ভাবনায় পড়ে গেলেন!
দিহানকে খুন করার পেছনে এক মাত্র সন্দেহভাজন আসামি হলো রাশেদ। অথচ এই ছেলে এত মাইর খাওয়ার পরে, কঠিন জেরার মুখেও বলছে কি না, এই খুনের বিষয়ে সে কিছু জানে না। তবে এই খুনের পেছনে জড়িত কে? রহিম সাহেব মনে মনে চিন্তা করেন, এই ছেলেকে দেখে মনেও হচ্ছে না যে, সে একজন খুনি। কিন্তু দিহান খুন হওয়ার এক ঘণ্টা আগের শেষ কল ছিল এই রাশেদের নামে ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে রেজিস্ট্রি করা নাম্বার থেকে।
প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তো এ তথ্য পাওয়া গেল। অথচ দিহানের ছবি দেখে রাশেদ বলছে, এই ছেলেকে সে চেনে না। এমনকি আগে কখনো দেখাও হয়নি কোথাও। সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো, যে নাম্বার থেকে ফোন কলে কথা বলছে খুনের এক ঘণ্টা আগে। সেই নাম্বারও নাকি রাশেদের না, এমনকি এই নাম্বার তার পরিচিতও না। পুলিশ অফিসার রহিম দিহান খুনের পেছনে তেমন কোনো কারণও খুঁজে পাচ্ছেন না। কারণ দিহান একজন টোকাই, গরিব বাবা-মায়ের ছেলে। সারা দিন পথে ঘাটে কাগজ কুড়িয়ে সন্ধ্যায় বিক্রি করে যা আয় হয়, তাই দিয়ে চাল ডাল কিনে কোনো রকমে ওদের সংসার চলে। থানার পাশের ওই তাঁবুগুলোয় ওরা থাকে। ছেলেটা টোকাই হলেও খুব ভদ্র ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলত। রহিম সাহেবের সাথে প্রায় সময় দেখা হতো। দেখা হলেই লম্বা একটা সালাম দিত। আহা! কি মায়া ভরা মুখ ছিল, চোখের সামনে এখনো যেন ভাসছে ছেলেটার ছবি।
দিহান, খুনের রহস্য খুঁজে বের করার দায়িত্ব রহিম সাহেব নিজে ইচ্ছে করে কাঁধে নিয়েছেন।
কী এমন শত্রুতার জেরে খুন হলো দিহান? শত চেষ্টা করেও রাশেদের মুখ থেকে খুনের বিষয়ে কোনো কথা বের করা যাচ্ছে না। রহিম সাহেব শান্ত গলায় রাশেদের কাছে জানতে চাইল, অন্য কাউকে তার আইডি কার্ড দিয়ে সিম রেজিস্ট্রি করিয়ে দিয়েছে কিনা? রাশেদ উত্তরে বলল, না স্যার, আমার আইডি কার্ড দিয়ে শুধু আমার একটা সিম উঠাইছি। স্যার আমি মূর্খ মানুষ, আমি তেমন কিছু জানি না। পড়তেও জানি না স্যার। রাশেদের কথা শুনে একটু খটকা লাগল রহিম সাবের মনে। রাশেদকে জেল থেকে বের করে আনা হলো। পুলিশের ভ্যানে করে শাহিনকে সাথে নিয়ে চলল দুর্গাপুর বাজারে। রাশেদ সিমটা কিনছে দুর্গাপুর বাজারের কোনো এক দোকান থেকে।
দূর থেকে দোকান দেখে, পুলির অফিসার রহিমকে বলল রাশেদ। সরাসরি দোকানে গিয়ে উপস্থিত হলেন রহিম সাহেব। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই দোকানিকে পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে থানায় নিয়ে আসা হলো। পুলিশি জেরার মুখে একে একে বেরিয়ে এলো ভয়ঙ্কর কিছু সত্য তথ্য।
দোকানি বলল, যাদের ভোটার আইডি কার্ড নেই। ওদের কাছে একটু বেশি মূল্যে বিক্রি করা যায় একেকটা সিম। রাশেদের মতো সহজ সরল মানুষদের ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে একসাথে তিন-চারটা, কিংবা তারও বেশি সিম রেজিস্ট্রি করে রাখে। লেখাপড়া না জানার কারণে দোকানিরা যা বলে, রাশেদদের মতো সহজ সরল মানুষ তাই বিশ্বাস করে। পরে ওই সিমগুলো অন্য মানুষের কাছে একটু বেশি মূল্যে বিক্রি করে।
দোকানির কথা শুনে, গভীর চিন্তায় পড়লেন রহিম সাহেব। দিহান খুনের ঘটনা মোড় নেয় অন্য দিকে।
তবে এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন পুলিশ অফিসার রহিম।
যে করেই হোক খুঁজে বের করবে আসল রহস্য।
কে ছিল রাশেদের খুনি? এই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায়।
সফিপুর, গাজীপুর