Naya Diganta

হাওর থেকে হারিয়ে গেছে পরিবেশবান্ধব শকুন

সুনামগঞ্জের হাওর থেকে হারিয়ে গেছে পরিবেশবান্ধব শকুন

সুনামগঞ্জে পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বিপন্নের তালিকায় রয়েছে শকুন। অতীতে হাজার-হাজার শকুন সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় দেখা মিললেও এখন একটিরও দেখা মিলছে না পুরো জেলার কোথাও। এক সময় শকুন ছিল গ্রামবাংলার অতি সাধারণ চিরচেনা পাখি। সেই সময়ে গরু-ছাগল মারা গেলেই দল বেঁধে হাজির হতো হাজার-হাজার শকুন। নিমিশেই মৃত পশু খেয়ে সাবাড় করে দিত। তাড়াতে চাইলে কিছু দূরে গিয়ে বসে থাকত।

হাওরের খোলা আকাশে বহু উপড়ে উড়ে বেড়াত ঝাঁকে-ঝাঁকে শকুন। একটি শকুনকে নিচে নামতে দেখলেই বাকিগুলো তাকে অনুসরণ করে মরা পশুকে ভাগ করে খেয়ে নিত। আকাশে উড়া শকুন দেখে মানুষ বুঝতে পারত ওই আকাশের ঠিক নিচে কোনো প্রাণী মরা পড়েছে। এসব শকুন খাবার খেয়ে বড় বড় উঁচু গাছ ও শিমুল গাছে ডানা মেলে বসে থাকত। শকুনই একমাত্র পাখি যারা গবাদিপশুর মৃতদেহ সতেজ থাকা অবস্থাতেই খেতে পারে। মৃত গবাদিপশু খেয়ে শকুন পরিবেশ পরিছন্ন করে রাখত। অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণু হজম করার ক্ষমতা শকুনের আছে বলে জানা গেছে। এখন হাওরে বা নদী পাড়ে শিমুল, তাল, বট, রেইনট্রি, কড়ই কিংবা উঁচু কোনো গাছ অথবা ঝোপ-ঝাড় নেই আগের মতো। তার সাথে হারিয়ে গেছে শুকুন পাখিও।

পরিবেশবিদরা বলেছেন, বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে অধিক ফলনের আশায় কৃষক জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় শকুনসহ অন্যান্য পাখির স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি কল-কারখানার দূষিত বর্জ্যরে কারণে পরিবেশসহ মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে শকুনসহ নানা প্রজাতির পাখি। এ ছাড়াও গ্রামাঞ্চলে আর আগেরমতো গণহারে পশু পালন করা হয় না। যান্ত্রিক মেশিনারি যন্ত্রপাতি বের হওয়াতে গরু-মহিষ ছাড়াই মানুষ কৃষি ক্ষেত করতে পারছে। যে ক’টি গবাদি পশু আছে এগুলোর দু-একটি মারা গেলে খোলা আকাশের নিচে ফেলে না দিয়ে মাটির নিচে পুুঁতে রাখে, এ কারণে শকুন চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে।

শস্যক্ষেতে বিষটোপ, খাদ্য সঙ্কট ও গবাদিপশুর চিকিৎসার প্রদাহ রোধক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ব্যবহারে এবং প্রাচীন ও উঁচু গাছ নিধন হওয়ায় শকুন কমতে কমতে এখন শকুনের অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের কোটায়। জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, খাদ্য সঙ্কটসহ খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট ও উঁচু গাছপালা হারিয়ে যাওয়ায় শকুনের শঙ্কট দেখা দিয়েছে। চিরাচরিত গ্রাম বাংলার প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের প্রতীক পাখি। শুধু সৌন্দর্যই নয়, প্রকৃতির অলঙ্কার বলেও আখ্যায়িত করা হয় এদের। এসব পাখি শুধু সৌন্দর্য হিসেবে দেখা হয় না, প্রকৃতির ফুল ও ফসলের ভাণ্ডার বৃদ্ধিতে অংশ নিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে এমন একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে পাখি ভালোবাসে না, পাখির গান শুনতে পছন্দ করে না, পাখির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় না। কয়েক দশক আগেও গ্রাম বাংলা সবুজ গাছ-গাছালিতে ভরা ছিল। ঝোপ-ঝাড় ছিল। চারপাশ মুখরিত ছিল পাখির কলকাকলিতে। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে সুনামগঞ্জে উজাড় হচ্ছে বিভিন্ন গাছ ও বনাঞ্চল। মানুষের প্রয়োজনে জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তাঘাট, স্থাপনা, বাজারসহ লোকবসতি। আর এতে করেই ক্রমে বিপন্ন হয়ে উঠছে প্রকৃতি। আর প্রকৃতি বিপন্ন হওয়ার কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য।