Naya Diganta

দেশজুড়ে ইয়াবার ভয়ঙ্কর বিস্তার

সাম্প্রতিক সময়ে গোটা দেশে ইয়াবার থাবা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রশাসন, সীমান্তপ্রহরী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান সত্ত্বেও ইয়াবার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরুণী ও উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা ইয়াবার আগ্রাসনের শিকার। রাত জেগে অভিসার, সাময়িক যৌনফুর্তি ও আনন্দের রঙিন স্বপ্নের মোহ তাদের হাতছানি দেয়। অনেক তরুণী সিøম হওয়ার আগ্রহে ইয়াবা সেবন করে। কারণ, ইয়াবা ক্ষুধা কমিয়ে দেয়। অনেকেই জানে না এর প্রতিক্রিয়া কত মারাত্মক ও ভয়াবহ।
বাংলাদেশে ইয়াবাসেবীদের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। মাদকসেবীদের ৮০ শতাংশই ইয়াবা আসক্ত। আর এদের মধ্যে ৩০ শতাংশই তরুণী ও যুবতী। নাফ নদীর ওই পাড়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ৩৭টি ইয়াবা তৈরির কারখানা রয়েছে। মংডু ও সিতওয়ে (আকিয়াব) থেকে সমুদ্রপথে ইয়াবার চালান নাফ নদী অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢোকে। কক্সবাজারের টেকনাফ হচ্ছে ইয়াবার প্রবেশদ্বার। ওখান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে এই পাগলা ওষুধ সারা দেশের জেলা-উপজেলা ও শহর-গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে গড়ে উঠেছে বছরে ৪০ কোটি টাকার মাদকের বিশাল মার্কেট। এর পেছনে আছে শক্তিশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। চাহিদার সাথে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় ইয়াবার বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে ক্রমেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর টেকনাফের ৭৩ জন ইয়াবা গডফাদার এবং পুলিশ ১১৫১ ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করে। এতে দেখা যায় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, পৌর কাউন্সিলর, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ছাত্রনেতাদের নাম রয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফ, হ্নীলা, শাহপরি দ্বীপ ও উখিয়ার এক শ্রেণীর লোক ইয়াবা সংগ্রহ, বিক্রি ও বাজারজাতের সাথে জড়িত। স্বল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার চিন্তা থেকে মাদক ব্যবসায়ে অনেকে সম্পৃক্ত হচ্ছে। কক্সবাজার ও টেকনাফে ইয়াবা ডনদের কোটি কোটি টাকার রাজবাড়ি গড়ে উঠেছে। পরিবহনের জন্য নারী ও শিশুদের ব্যবহার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলো দেয়ার জন্য পাচারকারীরা অনেক সময় আইনজীবী, বিদ্যুৎ মিস্ত্রি, হুজুর, পর্দানসীন মহিলা ও সাংবাদিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে। মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া অনেক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ইয়াবা ব্যবসায়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, সারাদেশে ৭৬৮ জন ইয়াবা পাচারকারী রয়েছে। তালিকাভুক্ত বেশির ভাগই কক্সবাজারের উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফের লোক।
আশির দশকে মাদক হিসেবে বাজারে চাহিদা ছিল ফেনসিডিলের, নব্বইয়ের দশকে আসে হেরোইন আর ১৯৯৯ সালে বাজার ধরেছে ইয়াবা। মূলত সহজলভ্য ও বহনে সুবিধা থাকার কারণে ইয়াবার প্রতি মাদকসেবীদের ঝোঁক বাড়ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) চার বছরে (২০১৩-১৬) এক কোটি ৭৫ লাখ ৭৪৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে কক্সবাজারের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা থেকে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি ৫২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। উত্তেজক এই ট্যাবলেট রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধরা পড়ে, তা বিক্রি হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ। আর ৯০ শতাংশ মাদকই ধরা পড়ে না। জাতিসঙ্ঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) মতে, বাংলাদেশে বছরে শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটই বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো।
এই দেশে প্রথম ইয়াবা আসা শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। সাইফুল করিম নামে টেকনাফের এক ব্যবসায়ী বাংলাদেশে ইয়াবা নিয়ে আসেন। সম্প্রতি পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে এক লাখ ইয়াবা বড়ি, ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র (এলজি) উদ্ধার করা হয়। র্যাব-পুলিশ-বিজিবির সাথে বন্দুকযুদ্ধ এবং এলাকায় মাদকের প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় কক্সবাজার জেলায় ১০৬ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারীসহ ২১ রোহিঙ্গা নাগরিক। টেকনাফে ৬৫ ও উখিয়ায় দুজন নিহত হয় (প্রথম আলো, ৩১ মে ২০১৯)।
বিগত আট বছরে ইয়াবা সেবনের মাত্রা বেড়েছে ছয়গুণ। অন্যান্য মাদকের তুলনায় ইয়াবার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। এই নেশা ইয়াবাসেবীকে শারীরিক-মানসিক পঙ্গুত্ব এমনকি একপর্যায়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কের ছোট ছোট রক্তনালী সঙ্কুচিত হয়ে ব্রেনস্ট্রোক করতে পারে। রক্তচাপ, হেপাটাইটিস বি, সি ও এইডসের মতো জীবাণু সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ফুসফুস, লিভার, ব্রেন ও কিডনি আক্রান্ত হয়। সিজোফ্রেনিয়া ও হ্যালুসিনেশন, বিষণœতা, হাইপারথার্মিয়া, লিভারসিরোসিস, সাইকোসিস সিনড্রমের মতো রোগ দেখা দিতে পারে। তীব্র যৌন উত্তেজক ইয়াবার আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, এটি ছেড়ে দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় ইয়াবা গ্রহণে সাময়িক যৌন উন্মাদনা বাড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে যৌনক্ষমতা কমতে থাকে। দীর্ঘ দিন ব্যবহারের ফলে শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যৌন দক্ষতা কমে যাওয়ায় সন্তান জন্ম দেয়ার সক্ষমতাও বিনষ্ট হয়।
ইয়াবা ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের মতো বিশুদ্ধ ও উপযুক্ত নয় বরং প্রচণ্ড যৌন উত্তেজনার ভয়ঙ্কর নেশা। এর পেছনে আছে ইতিহাস। ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর সৈন্যদের সজাগ রাখতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ করতে অ্যামফেটামিনের ব্যবহার শুরু করেন হিটলার। হিটলারের নির্দেশে তখন কেমিস্টরা যে ড্রাগ তৈরি করেন, তার নাম ছিল ‘পারভিটিন’। তবে রূপ বদলে (মেথঅ্যাম্ফিটামিন, ক্যাফেইন ও হেরোইনের মিশ্রণ) এশিয়ায় ইয়াবা চালু করে জার্মানি। পাহাড়ে কোনো গাড়ি সহজে টানতে চাইত না বলে ঘোড়াকে পাগল করে দিতে মিয়ানমারের শান প্রদেশে বার্মিজরা এই ড্রাগ তৈরি করে ঘোড়াকে খাওয়াত। পরে প্রচণ্ড কায়িক শ্রমে জড়িত মানুষও এই ঘোড়ার ট্যাবলেট নেয়া শুরু করে। পর্যায়ক্রমে এটি থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের যৌনকর্মীরা সেবন করতে শুরু করে। এখন এই মরণ নেশা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে’ (অধ্যাপক ডা: মো: আহসানুল হাবিব, বিভাগীয় প্রধান, সাইকিয়াট্রি ও ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, কালের কণ্ঠ, ৮ জুলাই, ২০১৮)।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের হাতে সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা ও ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের তিন ভাইসহ টেকনাফের শীর্ষ ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় থাকা টেকনাফের আলোচিত ইয়াবা ডন নুরুল হক ভুট্টো ও সাইফুল করিমসহ অনেকে বাইরে থেকে গেছে। আদালত ইয়াবা ব্যবসায়ী নুরুল হক ভুট্টো ও তার স্বজনদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। ইয়াবা ব্যবসায়ী ভুট্টোর দুটি দোতলা বাড়িসহ প্রায় ৩১ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করেছে পুলিশ। সাইফুল করিম সম্প্রতি পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি টেকনাফের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদের আলিশান রাজবাড়ি কে বা কারা রাতের আঁধারে ভাঙচুর করে এবং বাড়ির দরোজা-জানালাসহ মূল গেট ভেঙে ফেলে। সচেতন মহলের মতে, রাজনীতির ক্ষমতার চাদরে ইয়াবা কারবারে কোটিপতিদের প্রতি ক্ষুব্ধ লোকজন ‘ইয়াবা বাড়ি’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
ইয়াবার প্রভাবে চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, খুন, ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে। চট্টগ্রাম কারাগারে ১ জুন বন্দীর সংখ্যা ছিল চার হাজার ১৮৫। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ইয়াবা মামলার আসামি (প্রথম আলো, ২ জুন ২০১৯)। আইনের কঠিন ও কঠোর প্রয়োগ এবং আদালতে দ্রুত বিচার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ১৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সীমান্তে বিজেবি ও কোস্টগার্ডের নজরদারি বাড়াতে হবে। বিজেবি ও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের যৌথ পেট্রোলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ইয়াবা পাচার কমে যাবে।
ইয়াবা সেবনের ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতা এখনো তৈরি হয়নি। এটা আগুন নিয়ে খেলা। যেকোনো সময় নেশার আগুন আমাদের পরিবার ও সমাজকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতে পারে। পরিবার ও সমাজ থেকে এই সচেতনতা শুরু করতে হবে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিশেষ করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সংবাদকর্মী, আইনজীবী, চিকিৎসক, ওলামা-মাশায়েখ, শিক্ষক, অভিভাবক, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও চরিত্রবান যুবশক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপও ইতিবাচক ফল নিয়ে আসতে পারে। স্কুল, কলেজের সিলেবাসে মাদকের কুফলবিষয়ক নিবন্ধ সংযোজন জরুরি। ইয়াবা ডিলারদের সাথে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার নেটওয়ার্ক যেকোনো মূল্যে ভেঙে দিতে হবে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ভারতের সাথে চুক্তি করার ফলে সীমান্তে ৭৪টি ফেনসিডিল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই রকম দ্বিপক্ষীয় চুক্তি যদি মিয়ানমারের সাথে করা যায় তাহলে ইয়াবার বিস্তার সহনীয়পর্যায়ে নেমে আসবে। ইয়াবাসেবীর চিকিৎসার চেয়ে ইয়াবা সেবন থেকে বিরত রাখার প্রয়াস বেশ ফলপ্রদ ও ঝুঁকিমুক্ত। বিষয়টি নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। অন্যথায় পুরো জাতি পঙ্গু হয়ে যাবে। হ
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ওমরগণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম